ক্রিকেট মাঠে ‘আম্পায়ারিং বিতর্ক’ নতুন কিছু নয়। আন্তর্জাতিক ম্যাচ, এমনকি বিশ্বকাপের ম্যাচও বিতর্কের বাইরে নয়। তবে অনিচ্ছাকৃত ভুলের ব্যাপারটি ‘ক্ষমাসুন্দর’ দৃষ্টিতে দেখাই অলিখিত রীতি। কিন্তু ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে আম্পায়ারিং ঘিরে যা ঘটছে, রীতিমত ভয়ঙ্কর। ‘বিশেষ’ মহলের নির্দেশ বাস্তবায়ন করার অভিপ্রায় নিয়ে ম্যাচ পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে বাংলাদেশের ঘরোয়া আম্পায়ারদের বিরুদ্ধে। ঘরোয়া ক্রিকেটের খবর যারা রাখেন তাদের কাছে বিষয়টি অবশ্য অজানা নয়। বুধবার বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্টস এসোসিয়েশন (বিএসজেএ) আয়োজিত সেমিনারে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর আরও অনেক তথ্যই।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) আম্পায়ারিং নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সব জায়গাতেই যে স্বচ্ছতার বিন্দুমাত্র লেশ নেই, সেসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে আমন্ত্রিত অতিথীদের কণ্ঠে। অনিয়মের বেড়াজাল ছিঁড়ে বিসিবিকে বের হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা। সাবেক অধিনায়ক, কোচ, সিনিয়র সাংবাদিক, সংগঠকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে অনিয়ম বন্ধে বেশ কয়েকটি প্রস্তাবনা দেন। দাবি তোলেন, জল এত ঘোলা হয়েছে যে, এখনই অনিয়ম বন্ধে ব্যবস্থা নেয়া না হলে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিবর্গকে ভবিষ্যতে জবাবদিহিতার কঠিন পথ দেখতে হতে পারে।

বিএসজেএ আয়োজিত ‘ঢাকার ক্রিকেটে পক্ষপাতদুষ্ট আম্পায়ারিং: বাস্তবতা ও সমাধান’ -শীর্ষক সেমিনার বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশনের ডাচ বাংলা অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের চিত্র তুলে ধরেন ইয়াং পেগাসাসের যুগ্ন-সম্পাদক সৈয়দ আলী আসাফ। বলেন, আগে ম্যাচের আগেরদিন খেলোয়াড়রা চিন্তা করত প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তা নিয়ে, কীভাবে তাদের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ম্যাচ জিততে হবে সে কৌশল হত। এখন ম্যাচের আগে খেলোয়াড়রা চিন্তা করে, পরদিন মাঠের আম্পায়ার কারা থাকবেন। তার মতে, পক্ষপাতমূলক আম্পায়ারিং হয় যখন ক্লাবগুলোর অবনবন কিংবা উন্নতির সময় আসে।

কলাবাগানের ক্রিকেট সেক্রেটারি ও বিসিবির কাউন্সিলর রিয়াজ আহমেদ বাবুর অভিযোগ, ম্যাচ শেষে অধিনায়ক কিংবা ম্যানেজারের যে রিপোর্ট থাকে তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সিসিডিএম পর্যন্ত পৌঁছায় না। আম্পায়ারদের দিকে আঙুল তুলে তার অভিযোগ, ‘আম্পায়াররা ‘‘পেইড’’ আম্পায়ারিং করে থাকেন। এসব ‘‘দুষ্ট’’ আম্পায়ারদের পেছনে বিসিবির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। একই আম্পায়ার বারবার একই দলের ম্যাচে আম্পায়ারিং করছে। ফলে মাঠের ফলেও পরিবর্তন হচ্ছে না। পায়ে লাগলেই আউট, ওয়াইড হওয়া বলে কট বিহাইন্ড দিচ্ছে। কোনো কোনো আম্পায়ার মাঠে নেমেই বলে দেন ১২টার ভেতর ম্যাচ শেষ করতে হবে।’ -এসব সমস্যা সমাধানের জন্য ক্লাব অফিসিয়ালদেরও মানসিকতা পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তার মতে অনেক খেলোয়াড় থাকলেও ভালোমানের খেলোয়াড় পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ভবিষ্যতে ক্ষতির মুখে পড়বে বাংলাদেশ জাতীয় দল।

দৈনিক কালের কন্ঠের ক্রীড়া সম্পাদক সাইদুজ্জামানের অভিযোগ কর্মকর্তাদের নিয়ে। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের আম্পায়াররা খারাপ না। এটার প্রমাণ সর্বশেষ টি-টুয়েন্টি লিগ। এখানে কোনো অভিযোগ উঠেনি। কারণ তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে আম্পায়ারিং করতে দেয়া হয়েছে।’
তিনি আম্পায়ারদের আর্থিক উন্নতি এবং পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি ঢাকা লিগের ম্যাচগুলোতে আম্পায়ার নিয়োগ আম্পায়ার্স কমিটিই দেয় কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
বরেণ্য ক্রিকেট কোচ ও বিএসজেএর সাবেক সাধারণ সম্পাদক জালাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘যদি ঢাকার ক্লাবগুলো বিসিবির কাউন্সিলরশিপ পায় তাহলে কেনো চট্টগ্রামের ক্লাবগুলো বিসিবির কাউন্সিলরশিপ পাবে না।’ তার আপত্তি, কেন বিসিবি শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক হবে? পক্ষপাতদুষ্ট আম্পায়ারিং রোধে কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপহীন দক্ষ, স্বচ্ছ আম্পায়ারিংয়ের ব্যবস্থা করার পরামর্শ তার।

বিসিবির সাবেক পরিচালক ও জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক গাজী আশারাফ হোসেন লিপু বক্তব্যে বলেন, ‘আম্পায়ারদের ভুল আমাদের সময়ে ছিল ‘হিউম্যান এরর’। কিন্তু এখন সেটা হয়ে গেছে ইচ্ছাকৃত। আমাদের খেলার সময়ও এমন আম্পায়ারিং হয়েছে। কিন্তু কোন মাত্রায় হয়েছে, সেটা দেখার প্রয়োজন।’
লিপুর প্রশ্ন, ‘কার এত বড় সাহস হয় যে আম্পায়ারকে দিক নির্দেশনা দেয়? সেই শক্তিটা কোথায়? আমাদের বোর্ড সভাপতি অনেক ভালো কাজ করেছেন। আমার বিশ্বাস তিনি এদিকেও নজর দেবেন।’ তিনি মনে করেন, ঢাকার ক্রিকেট লিগের সব ধরণের ম্যাচে আকসুর (অ্যান্টি করাপশন ইউনিট) উপস্থিতি প্রয়োজন। আম্পায়ারদের ওপর নজরদারি এবং ম্যাচে ক্যামেরা রাখার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন তিনি।

বিসিবির পরিচালক ও সিসিডিএম চেয়ারম্যান কাজী ইনাম আহমেদ বলেছেন, ‘যে অভিযোগগুলো উঠেছে সেগুলো অনেক আগে থেকে উঠছে। আসলে সিসিডিএম হচ্ছে একটা জাদুঘর। আমি এখানে একমাত্র কিউরেটর। একজন কিউরেটরের পক্ষে অনেককিছু পরিবর্তন করা সম্ভব না। তবে আমরা অনেক কিছুই চেষ্টা করছি। কোনো বিতর্ক ছাড়া প্রিমিয়ার লিগ টি-টুয়েন্টি শেষ করেছি। প্রিমিয়ার লিগের সূচি করা হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট ক্লাব (আবাহনী) নিয়ে অনেক অভিযোগ। এবারের সূচি দেখেন তাদের প্রথম তিনটি খেলার একটিও বিকেএসপিতে নেই। আমরা খেলোয়াড়দের টাকা-পয়সা নিশ্চিত করেছি। টাকা-পয়সা বাড়িয়েছি।’
আম্পায়ারিং নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ক্রিকেট বোর্ডের আম্পায়ার্স কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচে আম্পায়ার বরাদ্দ দেয়ার চেষ্টা করেছিলাম। আমি চেয়েছিলাম আম্পায়ার বরাদ্দের কমিটিতে সিসিডিএমের একজন প্রতিনিধি থাকুক। কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি। আশা করছি ভবিষ্যতে আম্পায়ার্স কমিটির চেয়ারম্যান এবং সেক্রেটারির সঙ্গে সমন্বয় করে সিসিডিএম কাজ করতে পারবে।’

এবারের প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচগুলো লাইভ স্ট্রিমিং করার চিন্তাও আছে বলে জানান ইনাম আহমেদ। বলেন, ‘বিএসজেএ’র আজকের সেমিনারে যতগুলো প্রস্তাব এসেছে, আমি এগুলো বোর্ডের সঙ্গে আলাপ করে যতগুলো সম্ভব বাস্তবায়নের চেষ্টা করবো।’
সেমিনারের সমাপনী বক্তব্যে বিএসজেএর সহ-সভাপতি আরিফুর রহমান বাবু বলেন, ‘ঢাকার ক্রিকেটের কালো দাগ লেগে গেছে। এটাকে অবশ্যই উজ্জ্বল করতে হবে। কারণ দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় পাইপলাইনই হচ্ছে ঢাকা লিগ। যদি এটা বিপর্যয়ে পড়ে যায়, ক্ষতিটা বাংলাদেশের ক্রিকেটেরই বেশি হবে।’
সেমিনারে আলোচনার প্রেক্ষিতে পক্ষপাতদুষ্ট আম্পায়ারিং বন্ধে বেশ কয়েকটি প্রস্তাব উঠে এসেছে। যেমন, দক্ষ আম্পায়ার নিয়োগ দেয়া। সব ক্লাবকে বিসিবির কাউন্সিলরশিপ প্রদান। সব ক্লাবের সমানসংখ্যক কাউন্সিলর রাখা। আম্পায়ার বন্টনে সিসিডিএম এবং আম্পায়ার্স কমিটি সমন্বয় করে কাজ করবে।

প্রকৃত পেশাদার লোক দিয়ে টুর্নামেন্ট পরিচালনা করার কথাও আলোচনায় এসেছে। টিভিতে খেলা সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা, ক্লাবগুলো স্ব-উদ্যোগে খেলা ক্যামেরায় ধারণ করতে চাইলে সেটির অনুমতি দেয়া, বোর্ডের পরিচালক-কর্মকর্তাদের কাছের লোকেরা যেন বাড়তি সুবিধা না নিতে পারে সেই মানসিকতা তৈরি করা, এছাড়া খেলোয়াড়দের দলবদলের নিয়মকানুন বারবার না বদলানোর প্রস্তাবও এসেছে সেমিনারে।
বিএসজেএর সহ-সভাপতি তারেক মাহমুদের সঞ্চালনায় প্রাণবন্ত অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনটির সভাপতি মোতাহের হোসেন মাসুম ও সাধারণ সম্পাদক রায়হান আল মুঘনি। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন পৃষ্ঠপোষক ওয়ালটনের নির্বাহী পরিচালক উদয় হাকিম।

শুরুতে ঢাকার ক্রিকেটে পক্ষপাতমূলক আম্পায়ারিং নিয়ে বিএসজেএ’র পর্যবেক্ষণ পড়ে শোনান বিএসজেএ’র সদস্য আরিফুল ইসলাম রনি। সেমিনারের মূল রচনায় উঠে আসে ঢাকার ক্রিকেটের আম্পায়ারিংয়ের বর্তমান করুণচিত্র। বিএসজেএ মনে করে, ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট একসময় ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রাণ। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সেই প্রাণের এখন ‘যায় যায়’ অবস্থা! কিছু আত্মঘাতী পদক্ষেপ, বিসিবির ভোট ও কাউন্সিলরশিপের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে প্রভাব বিস্তারের থাবায় ঢাকায় ক্রিকেটের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ লিগ এখন সংকটাপন্ন।

মূল রচনায় আরও বলা হয়, ঘরোয়া ক্রিকেটের পাতানো ম্যাচ ও পক্ষপাতমূলক আম্পায়ারিং এই মুহুর্তে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ক্ষত। ব্যাট-বলের কীর্তি নয়, গুটিকয়েক ক্লাব কর্মকর্তার পেশী শক্তিই এখানে আসল। অনিয়মই হয়ে উঠেছে নিয়ম, আর অনিয়মগুলো হয়ে উঠেছে অবিচ্ছেদ্দ অংশ। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ শুরুর ঠিক একদিন আগে সেমিনারটি করায় বিএসজেএ’কে ধন্যবাদ জানান অতিথীরা।








