শুনেছি দুই বিদেশি’কে হত্যার পর ঢাকার গুলশান, বারিধারা অর্থাৎ পুরো কূটনীতিক পাড়া নাকি নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেয়া হয়েছে!
এই চাদরে এমন’ই ফাঁক! যে দিন গণমাধ্যম মারফত জানতে পারলাম তার পর দিন’ই দেখি পত্রিকায় খবর বেড়িয়েছে-গুলশানে প্রবল নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাঝেই দিনে দুপুরে চাঁদাবাজি-ছিনতাই চলছে!
এর দুই দিন পরে শুনি এক ১৪ বছরের ধনীর দুলাল নাকি মদ খেয়ে শুধু গাড়ি’ই চালাচ্ছিলো না, রীতিমত কার রেসিং করছিলো ওই গুলশান এলাকাতেই। একে তো বয়স ১৪, এর মাঝে আবার মদ খেয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলো। যা হবার তাই হয়েছে। এই ছেলে গাড়ি উঠিয়ে দিয়েছে আশপাশের লোকজনের উপর! এতে এক জন রিকশা আরোহী মারাও গেছে শুনলাম! ভাগ্যিস ওই রিকশায় কোন বিদেশি ছিলো না। নইলে সপ্তাহ না ঘুরতেই নিরাপত্তার চাদরের মাঝেই তৃতীয় বিদেশি হত্যার সংবাদ শুনতে হতো আমাদের।
এর চাইতেও অবাক হয়ে খেয়াল করলাম ১৪ বছরের এক বালক কোন হিসেবে গাড়ি চালচ্ছিলো এই নিয়ে সবাই লেখালেখি করছে! ভাবখানা এমন এই দেশে ১৪-১৫ বছরের কেউ আর গাড়ি চালায় না! ওই ছেলে তো তাও ছোট প্রাইভেট কার চালচ্ছিলো। দুই বছর আগে যে দিন আমি এখানে আসি, আমার ফ্লাইট ছিলো গভীর রাতে। কেনাকাটা করার জন্য সন্ধার দিকে রিকশা নিয়ে বের হয়েছি, যাবো ফার্মগেট। তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডের ভেতর দিয়ে রিকশা কিছুক্ষণ চলার পরই থেমে গেলো। হালকা জ্যাম বেঁধে আছে। ভাবলাম কিছুক্ষণ পরই ছেড়ে যাবে। ১০ মিনিট হয়ে গেলো, রিকশা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। রিকশার ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম
-ঘটনা কি? সামনে কি বিশাল জ্যাম নাকি?
-না ভাই, একটা ট্রাক রাস্তায় মাঝামাঝি দাড়ায়ে আছে, এই জন্য জ্যাম বেঁধেছে।
-সরাচ্ছে না কেন? কিছু জানেন?
-না জানি না। ভাই আপনি হেঁটেই চলে যান।
আমার আবার তাড়া আছে। তাই রিকশা থেকে নেমে হাঁটা দিলাম। একটু সামনে এগুতেই দেখি ট্রাক’টা একদম রাস্তার মাঝখানে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে, অন্য কোন যানবাহন আর যেতে আসতে পারছে না। আরেকটু সামনে এগুতেই দেখি একটা বাচ্চা ছেলে ট্রাকের ড্রাইভারের সিটে বসে আছে! ভাবখানা এমন আশপাশে কোন জ্যামই নেই! আমি ভাবলাম হয়তো হেল্পার টাইপ কিছু হবে হয়তো। একদম কাছে গিয়ে মনে হলো, না সত্যি সত্যি’ই তো মনে হচ্ছে ড্রাইভার!
আমি প্রচণ্ড কৌতূহলী হয়ে একদম সামনে গিয়ে সিটে বসে থাকা ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম
-আপনি কি এই ট্রাকের ড্রাইভার?
-হ
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। দ্রুত হেঁটে ওই এলাকা ছাড়লাম। আমার তাড়া ছিল। তাছাড়া কিছু বলারও ছিল, অন্ধকার হয়ে গিয়েছিলো এবং আপনারা যারা ওই এলাকা সম্পর্কে জানেন তাদের হয়তো ধারনা থাকার কথা, এটি কোন নিরাপদ স্থান নয়।
তবে সন্ধার আলোয় দূর থেকে ছেলেটির বয়স ১৫-১৬ মনে হলেও সামনে গিয়ে মনে হয়েছে এই ছেলের বয়স ১৩-১৪ বছরের বেশি হবে না। এই বয়সের একটা ছেলে যখন মহাসড়কে ট্রাক চালায়, তখন অবশ্য আমাদের কিছু মনে হয় না। ভাবখানা এমন- ট্রাক চালক কম বয়সী হলে সমস্যা নেই, কিন্তু প্রাইভেট কার কিভাবে একটা ১৪ বছরের শিশু চালায়! তা, ট্রাক তো রাস্তা’ই চলে নাকি উড়ে উড়ে চলে! যে সমাজে ১৩/১৪ বছরের একটা বাচ্চা ছেলে যখন সবার চোখের সামনে ট্রাকের মতো ভারি যানবাহন চালায়, সেই সমাজকে আসলে আপনি চাইলেও নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দিতে পারবেন না।
যেই ছেলে প্রাইভেট কার চালিয়ে হত্যা করেছে- সে হয়তো শখের বসেই হত্যা করে ফেলেছে; তবে যেই ছেলে অভাবে পড়ে কিংবা বাধ্য হয়েই ট্রাক চালায়-তার ট্রাকের নিচে পড়েও হয়তো কিছু মানুষের জীবন চলে যেতে পারে! তবে প্রশ্ন হচ্ছে এর দায় আসলে ওই ছেলের না আমাদের সমাজ ব্যবস্থার!
শীতকালে যখন অনেক ঠাণ্ডা হয় তখন আর সাধারণ চাদরে কাজ হয় না; ফাঁকফোকর দিয়ে ঠাণ্ডা ঠিকই ঢুকে পড়ে! লেপ-কম্বল লাগে তখন। সমাজের নানান সমস্যা গুলো যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তখন আর নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে লাভ হওয়ার নয়। নিরাপত্তার কম্বলের প্রয়োজন আছে বৈকি!







