১৫ আগস্ট ইতিহাসের নিকৃষ্টতম হত্যাযজ্ঞ থেকে নারী-শিশু কেউ রক্ষা পায়নি। মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে শিশু রাসেলকে হত্যা করা হয়েছিলো। মায়ের সামনে হত্যা করা হয় আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর ছেলে সুকান্ত বাবুকে। গর্ভে সন্তান নিয়ে নিহত হন শেখ মনির স্ত্রী। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় তাদের দু’ শিশু। তাদের একজন ফজলে নূর তাপস।
বাংলাদেশের প্রায় সমান বয়সী তাপস ’৭৫-এর আগস্টে ছিলো চার বছরের চেয়ে একটু বড়।
ভয়াল সেই ভোরের বর্ণনা দিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন: আমরা দুই ভাই একসঙ্গে ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ গুলির শব্দে আমাদের ঘুম ভাঙে। ভয় পেয়ে দৌড়ে বাইরে যেতে গেলে চাচি আমাদের ঘরের এক কোণে লুকিয়ে রাখে। যার কারণে ওইদিন আমরা বেঁচে যাই।
‘ওরা আসলে চেয়েছিলো কেউ যেনো বেঁচে না থাকে। সেজন্য সবাইকে একটা ঘরে ঢুকিয়ে ব্রাশফায়ার করে সকলের মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা,’ ৪০ বছর আগের সেই রক্তাক্ত সকালের কথা বলতে বলতে অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠেন এই সংসদ সদস্য।
তাপসের কথা যে কতো সত্য তার প্রমাণ শিশু রাসেলের হত্যাকাণ্ড। শেখ মনির বাসায় রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে যে হত্যাযজ্ঞ, তা থেকে রেহাই পায়নি ১০ বছরের শিশু রাসেলও।
শিশু রাসেল চেয়েছিলো মায়ের কাছে যেতে। কিন্তু তাকেও স্তব্ধ করে দেয় ঘাতকের বুলেট। দোতলায় হত্যাযজ্ঞ শেষে রাসেলকে নিচে নিয়ে আসা হয়েছিলো। ওই সময় হাঁটুতে গুলিবিদ্ধ মুহিতুল ইসলামের কাছে বাঁচার আকুতি জানিয়ে রাসেল বলেছিলো, ‘ভাইয়া, ওরা আমাকে মারবে না তো?’
মেজর আজিজ পাশা তখন ল্যান্সারের একজন হাবিলদারকে বলে, শেখ রাসেলকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যাও।
মুহিতুল ইসলাম জানান: ওই হাবিলদার শেখ রাসেলকে তার হাত ধরে দোতলায় নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর দোতলায় গুলি এবং সেখান থেকে কান্নাকাটির আওয়াজ পাওয়া যায়। আর হাবিলদার নীচে গেটের কাছে এসে মেজর আজিজ পাশাকে বলে: স্যার, সব শেষ।
এর আগে দোতলার একটি ঘরে ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, সুলতানা কামাল এবং রোজি জামালকেও হত্যা করা হয়।
জাতির জনক, তার দু’ ছেলে এবং আরো কয়েকজন নিকটাত্মীয়কে হত্যার পাশাপাশি সেদিন নারী ও শিশু হত্যার যে কালো অধ্যায়, মিন্টো রোডে মন্ত্রী অাব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়িও তার অংশ হয়।
সেখানে নিহত হয় আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের নাতি এবং আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর বড় ছেলে সুকান্ত বাবু।
বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি এবং কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় ঘাতকেরা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে পরিবারের সকলকে বাড়ির দোতলা থেকে নিচতলায় নিয়ে আসে। ছয় বছর বয়সী বাবুকেও তখন হেঁটে আসতে হয় নিচে।
এরপর পরিবারের সবাইকে নিচতলার ড্রয়িং রুমে দাঁড় করানো হয়। সুকান্ত বাবু মায়ের কোলে যাবার জন্য কান্নাকাটি করছিলো। ঠিক তখনই গর্জে উঠে বেশ কয়েকটি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। মা শাহানারা আব্দুল্লাহ ছুটে যাচ্ছিলেন বাবুর কাছে। কিন্তু ব্রাশফায়ারে লুটিয়ে পড়েন সবাই।
ঘাতকরা চলে যাওয়ার পর শহীদ সেরনিয়াবাতের মৃতদেহের নিচে সুকান্ত বাবুর লাশ পাওয়া যায়। আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এবং শাহানার আব্দুল্লাহ সেদিন সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও বাবুকে আর ফিরে পাননি।
শিশু সুকান্ত বাবু ছাড়াও সেখানে নিহত হন আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, তার ভাইয়ের ছেলে সাংবাদিক শহীদ সেরনিয়াবাত, মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত, ছেলে আরিফ সেরনিয়াবাত এবং বরিশালের ক্রিডেন্স শিল্পগোষ্ঠীর সদস্য আব্দুর নঈম খান রিন্টু।
এছাড়াও আহত হন বেগম আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, শাহানারা আব্দুল্লাহ, বিউটি সেরনিয়াবাত, হেনা সেরনিয়াবাত, আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ, রফিকুল ইসলাম, খ.ম জিল্লুর রহমান, ললিত দাস ও সৈয়দ মাহমুদ।






