পৃথিবী যত এগিয়ে যাচ্ছে আমরা যেন তত পিছিয়ে পড়ছি। প্রতিদিন আমাদের পিছিয়ে পড়া সংবাদের ভীড়ে একটি শুভ সংবাদ আমাদের আশান্বিত করেছে। সমাজের কুসংস্কার, কুপ্রথা, চোখ রাঙানির কারণে আমরা প্রত্যহ পিছিয়ে পড়ছি বিশ্ব সভ্যতার অগ্রযাত্রার তালে। হাজার বছরের কুসংস্কার লালন করে এ দেশের নারী সমাজকে দমিয়ে রাখা হয়েছে। নানা ট্যাবু দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে নারীদের অগ্রযাত্রাকে। বিশেষ করে আমাদের মত অনুন্নত দেশে নারীর অবস্থান চরম অপমানকর। সেখানে মাঝে মাঝে কিছু সংবাদ আমাদের আশার আলো দেখায়। জাগো নারী বহ্নিশিখা।
একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়: ঋতুমতী হয়েছে মেয়ে, শুরু হয়েছে নারী জীবনের নতুন এক অধ্যায়। লাল রঙের একটি কেক কেটে সেই উপলক্ষ্যকে উদযাপন করেছে ফেনী শহরের এক পরিবার। ফেসবুকে ‘প্রজেক্ট কন্যা’ নামের একটি পাতায় গত ১৬ সেপ্টেম্বর সেই কেকের ছবি প্রকাশ হওয়ার পর অনেকেই প্রথম মাসিক উদযাপনের এই ভাবনাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।
প্রোজেক্ট কন্যার পরিচালক জানান: পরিবারের ‘ছোট্ট মেয়েটি’ ভয় না পেয়ে পিরিয়ড বিষয়টি যেন সহজভাবে নিতে পারে, তাই এ উদযাপন। মাসিক নিয়ে কথা না বলার একটা চর্চা রয়েছে। তবে এতে পরিবর্তন আনছেন অনেকেই; এমনকি মফস্বলের পরিবারগুলোও। এই পরিবারটিও তেমন একটি উদাহরণ। কেকটা অনেকটা সিঁড়ির অবয়বে বানানো এবং এতে একটা ছোট মেয়ের প্রতি ধাপে বড় হয়ে উঠার গল্প ফোটানোর চেষ্টা করা হয়েছে। লাল রঙের ওই কেক বানানো হয়েছে চার ধাপের সিঁড়ির আকারে। প্রতিটি ধাপে ছোট থেকে বয়ঃসন্ধি বেলার কন্যা শিশুর একটি করে আদল বসানো। কেকটির নিচে লেখা: ‘নিউ লাইফ…’।
ঐ উদযাপনের সংবাদটি পোস্ট করার পর সেখানে কেক নির্মাতা বলেন: খুব সুন্দর আইডিয়া। প্রথম পিরিয়ডের সময় কতরকম চিন্তা আর ভয় এসে যে ভর করে। আমার সময় আমার জন্য আব্বু নতুন জামা কাপড় কিনে দিয়েছিলেন। তখন ব্যাপারটা নরমালি নিই।
কেক নির্মাতা তুলে ধরেছেন ‘পুরনো রেওয়াজের’ কথা। আমার দিদার কাছে শুনেছিলাম, আগেকার সময় গ্রামে প্রথমবারের পর ঋতুমতি মেয়েদের নিয়ে খুব সুন্দর কিছু মেয়েলি আচার পালন করা হত। কাঁচা হলুদ বাটা দিয়ে স্নান করানো হত। পিঠা বানিয়ে প্রতিবেশীদের পাঠানো হত। মাতৃস্থানীয়ারাই আয়োজনে থাকতেন। ঐ সময় কুসংস্কারের প্রভাবের কথা তো বলাই বাহুল্য। না হলে এরকম একটা সুন্দর রীতি কী করে চাপা পড়ে গেল! আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই উদযাপন সত্যি বেশ সুন্দর। প্রজেক্ট কন্যার ফেসবুক পাতায় দেওয়া ওই পোস্ট এরেই মধ্যে সাড়ে তিন হাজারের বেশি শেয়ার হয়েছে। অধিকাংশ মন্তব্যকারী সাধুবাদ জানালেও কিছু নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। একজন লিখেছেন, নারীর প্রথম পিরিয়রড সেলিব্রেট হোক, সকল ট্যাবু দূর হোক।
আমরাও মনে করি এই উদযাপন নারীর প্রতি সামাজিক অবিচার ও কুসংস্কারজাত অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি প্রবল চপোটেঘাত। এভাবেই এগিয়ে যেতে হবে দেশের নারী সমাজকে। সামাজিক মিথ্যা সংস্কার লাজলজ্জার ভয় থেকে এখন বের হয়ে আসার সময় হয়েছে। ধীরে ধীরে একটি প্রাচীন সুন্দর রীতিকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ খুব সূক্ষ্মভাবে কবর দিয়েছে। মেয়েরা তাদের জীবনে গুরুত্ব পূর্ণ ধাপে পা রাখতে হীনমন্যতায় ভোগে। সেখান থেকে বের হয়ে আসার ক্ষেত্রে ফেনীর এই ঘটনাটি একটি মাইলফলক বলে মনে করি। আমরা চাই সমস্ত ট্যাবু ভেঙ্গে এগিয়ে যাক নারীর দুর্বার গতি।





