টানা দুই বছর কোন নারী ব্যক্তিত্ব নোবেল পুরস্কার পাননি। পদার্থবিজ্ঞানে এ খরা চলছে ৫৪ বছর ধরে। এ পর্যন্ত মোট ৮৮১ জন (একাধিকবার পাওয়া ব্যক্তিদের নাম প্রতিবার যোগ করলে সংখ্যাটা হবে ৯২৩) নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এদের মধ্যে নোবেলজয়ী নারীর সংখ্যা মাত্র ৪৮ (মেরি কুরি দুটো নোবেল গুণলে ৪৯ জন)। মানে, প্রায় প্রতি ১৮ জন পুরুষের বিপরীতে মাত্র একজন নারী নোবেল সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
‘কেন খুব কম সংখ্যক নারী নোবেল জেতেন?’ এই প্রশ্নটাই করে বসলেন এক সাংবাদিক। ৯ অক্টোবর অর্থনীতিতে নোবেল ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পরপরই।
নোবেল ফাউন্ডেশনের পরিচালনা পর্ষদের সহ-সভাপ্রধান সবিস্তার উত্তর করলেন। গোরান হ্যানসন প্রথমেই বললেন, ‘এ বছরে নোবেলজয়ী যারা (ছয় বিভাগে মোট ১২ জন), তাদের জন্য আমরা খুব গর্বিত।’
‘কিন্তু,’ হ্যানসন বলেন, ‘একইসঙ্গে বৃহৎ অর্থে আমরা হতাশ হয়েছি, কারণ এবারও কোন নারী নোবেল পাননি।’ সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা হাজির করেন হ্যানসন। তার ভাষায়, ‘এর একটা কারণ হলো, আবিষ্কারসমূহকে চিহ্নিত করতে আমাদের পেছন ফিরে তাকাতে হয়। পুরস্কার দেওয়ার আগে সেসব আবিষ্কার যাচাই করা ও নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। একটা সময় ছিল নারীদের প্রতি বৈষম্যটা আরও বেশি ছিল। এমনকি ২০ বা ৩০ বছর আগে খুব কমসংখ্যক নারী বিজ্ঞানী ছিলেন।’

এটাই কি আসল কারণ? না, স্বয়ং হ্যানসনই বলেছেন, ‘কিন্তু আমি নিশ্চিত নই যে, এই ব্যাখ্যাই সব। আমরা এবং পুরস্কার প্রদানকারী অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। আপনারা যদি নোবেল পুরস্কার কমিটিগুলোর দিকে লক্ষ করেন, দেখবেন যে, ছয়টি কমিটির মধ্যে তিনটিতেই সভানেতৃত্ব দিচ্ছেন নারীরা। সব কমিটিতেই নারী বিজ্ঞানীরা রয়েছেন। সুতরাং আমি মনে করি না যে, কমিটিগুলোয় শক্তিশালী পুরুষকেন্দ্রিক পক্ষপাত রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নোবেল কমিটিগুলো নারীদের নমিনেশনের জন্য আহ্বান জানিয়েছে। নারী বিজ্ঞানীদের অবদানকে সামনে আনার জন্য বিশেষ প্রয়াস নিয়েছে। কিন্তু এটা এ বছরই শুরু হয়েছে। কারণ আমরা মনে করি, নারী বিজ্ঞানীদের জন্য অনেক বেশি নমিনেশন আমরা হয়ত পাব না।’
গোরান হ্যানসন বলেন, ‘আমার ধারণা, আরও অনেক নারী রয়েছেন যারা নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। সে কারণে আমরা নেতৃত্বস্থানীয় নারী বিজ্ঞানীদের খুঁজে বের করতে শুরু করেছি। এবং তাদের জন্য যেন নমিনেশন দেওয়া হয়, সেই আহ্বানও করছি। শুধু নারী বিজ্ঞানীই নন, আগামী বছর থেকে যেন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ও ভৌগলিকভাবে বৈচিত্র্যময় নমিনেশন জমা পড়ে সে ব্যাপারে আমরা আহ্বান জানাব। আমরা এই শীতে কমিটিগুলোর সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে আলোচনায় বসছি।’
‘সুতরাং,’ হ্যানসন সারমর্ম টানেন, ‘[বুঝতেই পারছেন], আমরা খেয়াল রাখছি। নানান পদক্ষেপ নিচ্ছি।’
গোরান হ্যানসনের বিশ্বাস, ‘আগামী পাঁচ কি বড় জোর দশ বছরের মধ্যেই আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা বাস্তবতা দেখব।’

এরপর কথা বলেন পার স্ট্রমবার্গ। তিনি অর্থনীতিতে নোবেল প্রদানকারী কমিটির সভাপ্রধা। তিনি হ্যানসনকে বলেন, ‘আপনি যা বললেন, আমি এর মধ্য থেকে দুটো বিষয়কে গুরুত্ব দিতে পারি। প্রথমত, আমরা সেই সব গবেষণাকে সম্মাননা জানাচ্ছি যেসব আবিষ্কারের ঘটনা ঘটেছিল সত্তর, আশি এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে। ওই সময়টা এমন যখন অনেক বেশি লিঙ্গবৈষম্য ছিল; এটা অর্থনীতির বেলাতেও এবং বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখাতেও। এর মানে এই যে, যত সময় যাচ্ছে নোবেলজয়ী নারীদের অনুপাতটা বাড়তে থাকবে। খেয়াল করে দেখবেন, খুব সামান্য সংখ্যকবার তরুণ অর্থনীতিবিদদের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। লিঙ্গের কথা না-ই বা বললাম (মাত্র একজন নারী অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছেন)।’
স্ট্রমবার্গ বলতে থাকেন, ‘দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, আমরা খুব সচেতন। আপনাদের অবশ্য এটা বুঝতে হবে, কোন কমিটিই কিন্তু পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে স্বাধীন নয়। বিশ্বের সব প্রান্তের নমিনেটরদের মতামতকে এক জায়গায় করে বিবেচনা করতে হয়। আমরা তাদের নমিনেশনের ওপর নির্ভর করি। সুতরাং আমরা যদি কিছু করতে পারি সেটা হলো, নমিনেটিং কর্তৃপক্ষগুলোকে আমরা আহ্বান জানাতে পারি তারা যেন ইস্যুটিকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখে।’
এরপর গোরান হ্যানসন বলেন, ‘আমরা অনুরোধ রাখছি সবগুলো পুরস্কারের প্রত্যেক নমিনেটরদের কাছে যেসব নারী বিজ্ঞানী গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, আপনারা তাদের নাম বিবেচনায় রাখুন। প্লিজ।’
১৯৬৩ সালে দ্বিতীয় ও সর্বশেষ নারী হিসেবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান মারিয়া গোপার্ট মেয়ার। এর আগে ১৯০৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান মেরি কুরি। রসায়নে চার নারী নোবেল পেয়েছেন; এদের মধ্যে মেরি কুরি এবং তার মেয়ে আইরিন জুলিয়েট কুরি রয়েছেন। অর্থনীতিতে একমাত্র নোবেলজয়ী নারী হলেন এলিনর অস্ট্রম, তিনি ২০০৯ সালে এ সম্মান অর্জন করেন। মেডিসিনে ১২ জন নারী নোবেল পেয়েছেন, সাহিত্যে পেয়েছেন ১৪ জন। শান্তিতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক, ১৬ জন নারী নোবেল সম্মাননা পেয়েছেন।

শান্তিতে সর্বশেষ ২০১৪ সালে, মেডিসিনে ও সাহিত্যে সর্বশেষ ২০১৫ সালে এবং রসায়নে সর্বশেষ ২০০৯ সালে কোন নারী নোবেল পেয়েছেন।
সুইডিশ রসায়নবিদ আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছানুসারে ১৯০১ সাল থেকে পদার্থবিজ্ঞান, রসয়ান, মেডিসিন, শান্তি ও সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। অর্থনীতিতে নোবেল দেওয়া হয় ১৯৬৯ সাল থেকে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








