একজন সফল নারী ব্যবসায়ী, পেশাদারিত্ব আর সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখে প্রায় ৪৫ বছর ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে তার খ্যাতি অনন্য। প্রান্তিক নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য তিন বছর আগে গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশ হেরিটেজ ফাউন্ডেশন, বর্তমানে তিনি সংগঠনের সভাপতি। দেশীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য নিয়ে তার ভূমিকা অভূতপূর্ণ। বলছিলাম নেহরিন রহমান টুটলির কথা। তবে সবার কাছে টুটলি রহমান নামেই তিনি বেশি পরিচিত।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন প্রান্তিক নারীদের কর্মসংস্থান নিয়ে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ নানান বিষয়।
দীর্ঘদিন ব্যবসা করেছেন, হয়েছেন নারী সংগঠক; বিষয়গুলো কিভাবে দেখেন জানতে চাইলে টুটলি রহমান বলেন, বর্তমানে মেয়েরা সব জায়গায়ই আছে, তাদের কর্মক্ষেত্র এখন আর সীমাবদ্ধ নয়। চাকরি, ব্যবসা সব কিছুতেই তারা দক্ষতা অর্জন করেছে।
‘আমি কাজকে শুধুই কাজ না ভেবে নিজের ইচ্ছাপূরণ বা শখ হিসেবে নিয়েছি। আমার কাজ সহজ হয়ে গেছে, তাতে আমি আনন্দ পেয়েছি। ব্যবসায় কখনো ঠকেছি, কেউ কথা দিয়ে রাখেনি, কিন্তু আমি দমে যাওয়ার পক্ষে ছিলাম না। আমি চ্যালেঞ্জ নিতে শিখেছি।’
বর্তমানে কর্মক্ষেত্রে নারীদের সম্পর্কে তিনি বলেন, এখন ডিজিটাল যুগ, অনেক চিন্তা ভাবনা ও মেধা খাটিয়ে নারীরা নিজেকে বিকশিত করছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পীকার ড. শিরীন শারমীন চৌধুরী নারী। আমরা অনেক এগিয়ে গেছি। শুধু আমাদের কাজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকতে হবে। আমি কিন্তু যা করতে চেয়েছি তাই করতে পেরেছি।
টুটলি রহমানের অনুপ্রেরণার মূলে কে ছিল জানতে চাইলে বললেন, আমার মা নিলুফার হুসেন চৌধুরী আমার মেন্টর ছিলেন। মায়ের কাছ থেকেই সেলাই, পেইন্টিং, কুশি সব কিছু আমার শেখা। বাবা মোয়াজ্জেম হুসেন চৌধুরী ছিলেন সরকারী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। মায়ের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি, সেগুলো এখন আমার কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করছি।
বাংলাদেশের ফ্যাশন খাতে টুটলি প্রথম ফিউশন যুক্ত করে ফ্যাশনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন। বাংলাদেশে প্রথম প্ল্যান্ট ল্যান্ডস্কেপিং, ইন্টেরিয়র, ইভেন্ট প্লানিং, ওয়েডিং প্লানিং করেছেন তিনি। ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প নিয়ে দেশে প্রথমবারের মত আন্তর্জাতিক বুনন উৎসব আয়োজন করেন তিনি। বর্তমানে তিনি অনেকের অনুকরণীয় আদর্শ।
দায়িত্ব পালন করছেন উইংস’র সভাপতি পদেও। ফ্যাশন ব্র্যান্ড বাই দেশী’র স্বত্বাধিকারী তিনি। ইন্টারন্যাশনাল উইভার্স ফেস্টিভ্যাল’র উদ্যোক্তা ও স্বত্ত্বাধিকারী। বাংলাদেশ হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’র প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি।
হেরিটেজ ফাউন্ডেশন নিয়ে জানতে চাইলে টুটলি রহমান বলেন, এ ফাউন্ডেশন ২০১৭ সাল থেকে বুনন শিল্প, হস্তশিল্পসহ দেশের বিভিন্ন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করছে। তাঁত শিল্প আমাদের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির সঙ্গে একসূতোয় গাঁথা।তাই আমরা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বেশ কিছু তাঁত শিল্পের কারিগরদের সম্মাননা দিয়েছি, আমরাই প্রথম তাদের কাজের স্বীকৃতি দেই।

তিনি বলেন, আমি এখানে বেশ কয়েকজন প্রান্তিক নারীদের নিয়ে হস্ত শিল্প, কুশি ইত্যাদির কাজ করাই।আমি মধ্যস্বত্বভোগীদের দূরে রেখে তাদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছি। আমি তাদের নিয়ে গর্ববোধ করি। আমাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে যতো মেয়েরা আছে তারা সবাই হাতের কাজ জানে। তাদের কাজ শেখাতে হবে। গ্রামে আমাদের অনেক মহিলা আছে যারা বসে থাকে, আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে কখন আমরা সহযোগিতা করব।
হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি একটি হেরিটেজ ভিলেজ করতে চাই। যেখানে আমাদের যা কিছু ঐতিহ্য আছে সব কিছু থাকবে। গ্রামের পিঠাপুলি থেকে শুরু করে মসলিন শাড়ি, নকশী কাঁথা সবকিছু থাকবে। সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি কর্ণার থাকবে, সেখানে তার রাজনৈতিক ও কর্মময় জীবনের সব অধ্যায়ের কথা থাকবে। আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে।
এছাড়াও আমাদের দেশে অনেক সুবিধা বঞ্চিত পরিবার আছে যাদের মেয়েদের টাকার অভাবে বিয়ে দিতে পারে না, আমি চাই এরকম পরিবারের কাছে যেতে, বেশ কিছু পরিবারে মেয়েদের জোগাড় করে তাদের বিয়ে দেওয়া।
টুটলি রহমানের জন্ম ১৯৫৫ সালের ২৫ মে, কুষ্টিয়া জেলা শহরে। তবে বেড়ে ওঠা রাজধানীর গুলশান ও ধানমন্ডিতে। বাবার চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকার সুযোগ হয়েছে টুটলির। ১৯৭০ সালে ভিকারুননিসা নুন স্কুল থেকে টুটলি মাধ্যমিক পাশ করেন। ১৯৭২ সালে হলিক্রস কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে স্নাতক তৃতীয় বর্ষে পড়াকালীন তার বিয়ে হয়, ১৯৭৫ সালে। টুটলির স্বামী রিয়াজুর রহমান চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট।
নারী দিবসে প্রান্তিক নারীদের গণমাধ্যমের সামনে আনতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা নারী দিবসে কোনো একটা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে কর্মরত নারীকে এনে তার কথা জানতে চাচ্ছি, কিন্তু কেউ শ্রমিক নারীর কথা বলতে চায় না। তাদের শ্রমটাকে আমরা তুলে ধরছি না। গণমাধ্যমের উচিত গার্মেন্টস কর্মীদের কথাও তুলে ধরা।

গার্মেন্টসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, সেখানে বিপুল সংখ্যক নারীরা কর্মরত রয়েছে। আসলে সত্যি কথা বলতে গেলে আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের যেসব শ্রমিক শ্রেণীর নারীরা রয়েছে তাদের প্রতি উৎসর্গ করা উচিত। তাদের কর্মগুণে, তাদের ঘামে কলকারখানার চাকা ঘুরছে।
টুটলি ২০১৫ সালে বিভিন্ন পেশাজীবী ও উদ্যোক্তা নারীদের নিয়ে গড়ে তোলেন পারস্পরিক সহযোগিতার একটি সংগঠন- উইংস (উইমেন ইন সাপোর্ট গ্রুপ)। এই সংগঠনের উদ্দেশ্য মূলত- সংগঠনের সব সদস্যদের পারস্পরিক প্রয়োজনে নানা পরামর্শ, সহযোগিতা করা। নানা পেশার নারীরা যুক্ত আছেন উইংস’র সদস্য হিসেবে। সরকারি কর্মকর্তা, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, নারী উদ্যোক্তাসহ বিভিন্ন পেশাজীবী নারী। উইংসের সহযোগিতায় বেশ কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা সেই করেছেন। তিনজন হয়েছেন হাইকোর্টের আইনজীবী।
প্রতিটা দিনই হোক নারী দিবস এমনটা জানিয়ে টুটলি বলেন: নারী দিবস একটা নিদিষ্ট দিনে পালন করা হলেও আসলে প্রত্যেকটা দিনই নারী দিবস। যেকোন দিবসেই আমরা নিদিষ্ট দিনে কথা বলে চুপ হয়ে যাই। সেটা না করে নারী দিবসের মতো যেসব গুরুত্বপূর্ণ দিবস আছে সেগুলো পুরো বছর জুড়েই গণমাধ্যমে থাকা দরকার।








