পাকিস্তান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এক রাজনৈতিক চমকের দেশ। প্রতিনিয়ত এখানে চমক দেখা যায়। এই চমকে কখনও সামনে চলে আসে সেনাবাহিনী, কখনও মৌলবাদী গোষ্ঠী, কখনওবা কোনো রাজনৈতিক দল, আবার কখনও বা সুপ্রিমকোর্ট। আমেরিকার মিত্র এই দেশটিতে অনেক কিছু থাকলেও নেই শান্তি-স্থিতি গণতন্ত্র। সর্বশেষ চমক দেখা গেল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পদত্যাগের ঘটনায়। দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের পর সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার অযোগ্য ঘোষণা করা হয় এবং এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি পদত্যাগ করেন।
শুক্রবার জুম্মাবার, মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়ের দিন। এই দিনই দুপুরের প্রথম প্রহরে সুপ্রিমকোর্টের সিদ্ধান্তে ভাগ্যবিপর্যয় ঘটেছে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের। ২০১৬ সালের ৩ এপ্রিল বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং রাঘববোয়ালদের আর্থিক কেলেঙ্কারির তথ্য ফাঁস করে সাড়া ফেলে আলোচিত ‘পানামা পেপারস’। ফাঁস হওয়া ওই গোপন নথিতে অর্থ পাচারে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ছেলের নাম উঠে আসায় নিজ দেশে চাপের মুখে পড়েন তিনি। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আদালতে গড়ায়। বিরোধী দলগুলো থেকে তার পদত্যাগ দাবি করা হয়।
তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ১৯৯০ সালে বেআইনি ভাবে টাকা লেনদেনে জড়িয়ে পড়েন। সেই টাকায় লন্ডনে বিশাল সম্পত্তি কেনেন তিনি। যার মধ্যে রয়েছে লন্ডনে চারটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। গত বছর পানামা পেপারস ফাঁস হয়ে যাওয়ায় জানা যায় যে, কয়েকটি বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে টাকা বাইরে পাচার করেছেন তিনি। এই কোম্পানিগুলির মালিক আবার নওয়াজ শরিফের ছেলে-মেয়েরাই।
পাকিস্তানে কোনও বেসামরিক প্রধানমন্ত্রী কখনও পাঁচ বছরের মেয়াদ পুরো শেষ করতে পারেননি। তৃতীয়বারের মতো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া নওয়াজের মেয়াদ শেষ হতে আর এক বছরেরও কম সময় বাকি ছিল। এর আগে ১৯৯০ ও ১৯৯৯ সালে দুই বার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেও ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় কোনোবারই তিনি মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। দ্বিতীয়বার সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশান্তরিত হয়েছিলে নওয়াজ। তখন বেশিরভাগ সময় তিনি থাকতেন সৌদি আরবে। ২০১৩ সালের নির্বাচনে ফের ক্ষমতায় আসেন তিনি।
পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি সুপ্রিমকোর্টের ভূমিকার বিষয়টি গত কয়েক বছরে সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। এর আগে ২০০৭ সালে ইফতিকার মোহম্মদ চৌধুরী পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি থাকাকালে অনেক চমকপ্রদ ঘটনা ঘটেছিল। পদচ্যুত হওয়া, পুনর্বহাল হওয়া, রাষ্ট্রপতি পারভেজ মুশারফের পদত্যাগের বিষয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণ, পরবর্তী রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারির বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা শুরু করার প্রচেষ্টা ইত্যাদি অনেক কিছুই ঘটেছিল তাঁর আমলে। অনেকেই সেই সময়ে একথাও বলেছিলেন যে, সেনাবাহিনীর মতো উচ্চ আদালত পাকিস্তানের রাজনীতিতে অনেক বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
সুপ্রিমকোর্টের সিদ্ধান্তে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর সরে যাওয়াটাকে অনেকে আবারও রাজনীতিতে উচ্চ-আদালতের হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। যদিও এটাকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। সুপ্রিমকোর্টে যা করেছে, নিয়ম মেনেই করেছে, আইনের সীমার মধ্যেই করেছে। এখন রাজনৈতিক নেতারা যদি সীমা লঙ্ঘন করে তাহলে আদলতের আর কি-ই বা করা আছে?
তবে একথাও ঠিক যে উচ্চ-আদালতের সিদ্ধান্তে যদি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বার বার হোচট খেতে হয়, ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হয়, সেটাও গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। এ জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই যোগ্য ও দক্ষ হয়ে উঠতে হবে। আকণ্ঠ দুর্নীতি নিমজ্জিত হয়ে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে সংকীর্ণ দলীয় ও গোষ্ঠীস্বার্থ নিয়ে মেতে থাকলে তার ফল ভোগ করতে হবেই। অনৈতিকতার ফাঁক দিয়ে কখনও সেনাবাহিনী, কখনও বা আদালত সেই ক্ষমতার ভিত ধরে টান দেবে, ক্ষমতাকে প্রভাবিত ও হস্তক্ষেপ করবে-এটাই স্বাভাবিক। নৈতিক শক্তি ছাড়া রাজনৈতিক নেতৃত্ব দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারে না। এটা শুধু পাকিস্তান নয়, যে কোনো দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্যেই তা প্রযোজ্য।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এখন আত্মপোলব্ধিতে পৌঁছাতে হবে। নিজেদের শুধরাতে হবে। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর এই দেশটির নেতারা নিজেদের দেশকে বলতেন ‘এশীয় বাঘ’। কিন্তু স্বাধীনতার পর সাতটা দশক কাটিয়ে এসে গোটা বিশ্বের কাছে পাকিস্তানের পরিচিতিটা কিন্তু অন্য রকম। বিশ্ব অর্থনীতির বিশ্লেষক যাঁরা, তাঁদের অনেকেই বলেন, পাকিস্তান ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’। কেউ কেউ বলেন, পাকিস্তান একটি ‘দুর্বৃত্ত পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র’। আর পাকিস্তান যে সন্ত্রাসবাদের কারখানা হয়ে উঠেছে, তা তাদের বহু পুরনো মিত্র আমেরিকাও এখন বার বার বলছে।
পাকিস্তানের অবস্থা আফগানিস্তানের চেয়ে অনেক ভয়াবহ। কারণ পাকিস্তানকে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে তালেবান, বেলুচ, নানা উপজাতি, অপরাধী ও ইসলামী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে। পাকিস্তান সরকারের ব্যর্থতা দিন দিন, এমনকি ঘণ্টায় ঘণ্টায় বেড়ে চলেছে। গত কয়েক বছর ধরে শিশুরা বাইরে গেলে ঘরে ফিরবে কি না এ নিয়ে ভাবনায় থাকতে হচ্ছে অভিভাবকদের। মৌলবাদীদের ভয়ে নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বসবাস করছেন আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শিক্ষক ও নারী কর্মীরা। অনেক জায়গায় প্রয়োজন না থাকলে সাধারণ মানুষ বাজার, পার্ক কিংবা রেস্তোরাঁয় যান না।
যার সামর্থ্য আছে তিনি বন্দুক, বুলেটপ্রুফ গাড়ি, প্রশিক্ষিত কুকুর কিনছেন, রাখছেন বডিগার্ড। করাচিতে প্রায় দেড় কোটি মানুষের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আছে মাত্র ২ হাজার ৭০০ পুলিশ। সেনাবাহিনী বা নির্বাচিত সরকার উভয়ে অভিযুক্ত হচ্ছে দেশ পরিচালনায় ব্যর্থতার জন্য।
প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ কখনই ভালোভাবে দেশ চালাতে পারেননি। সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরিফের মধ্যে প্রায়ই নানা ইস্যুতে মতানৈক্য হতো। এতে করে সামনে যে কোনো সময় আর্মি-সিভিলিয়ানদের মধ্যে বড় ধরনের বিবাদ দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে দুটি নির্বাচিত সরকার ও সেনাশাসন ব্যর্থ হয়েছে ভালোভাবে সরকার পরিচালনায়। এ ছাড়া তারা ব্যর্থ হয়েছে অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো উন্নতি করতে। কোনো সরকারই পারেনি মৌলবাদ দমনে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে। দূর করতে পারেনি মিলিটারি-সিভিল বিরোধ। আর এভাবে যদি চলতে থাকে তবে নিশ্চিতভাবেই অস্তিত্ব সংকটে পড়বে পাকিস্তান নামের দেশটি।
মানুষ নাকি দুর্যোগ ও অভিজ্ঞতা থেকে থেকে শিক্ষা নেয়। পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই পরিস্থিতি থেকে কী শিক্ষা নেন এখন সেটাই দেখার বিষয়। ২০১৮ সালে পাকিস্তানে সংসদীয় নির্বাচন। কিন্তু ততদিন অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নওয়াজের চেয়ারে কে বসবেন? এই অচলাবস্থার সুযোগে ফের কি একবার সেনা শাসন জারি হবে? কী ঘটতে চাচ্ছে আমাদের প্রতিবেশী দেশটিতে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে আমাদের আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







