বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন একজন নারী এবং যখন এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন মোট ২২ জন নারী, ঠিক তখনই নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা হিসেবে ক্ষমতাসীনদের দ্বারা একজন নারী আক্রান্ত হওয়া আমাদের শঙ্কিত করে। রাজনীতিতে এবং নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে নারীর এই নেতৃত্ব এবং সাফল্যের সুফল কিভাবে এবং কতটা ভোগ করতে পারবে এদেশের সাধারণ নারী? কতটুকু প্রভাব পড়বে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে? আদৌ পড়বে কি? আমরা খুব একটা আশাবাদী হতে পারিনা। সুবর্ণচরের গণধর্ষণের ঘটনা আমাদে শঙ্কিত করে।
২০০১ সালে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলো সিরাজগঞ্জের ১৩ বছরের পূর্ণিমা শীল। অপরাধ ধানের শীষে ভোট না দেয়া। ২০১৮ এর নির্বাচনী প্রচারণায় জামায়াত-বিএনপির বিরুদ্ধে এই গণধর্ষণের ঘটনাই হয়ে উঠলো অন্যতম নিয়ামকগুলির একটি। আমরা মিডিয়ায় পূর্ণিমার বক্তব্য প্রচার হতে দেখলাম। তার শঙ্কার কথা জানলাম। নিজেরাও শঙ্কিত হলাম।
তারপর এলো ২০১৮ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আমরা আতঙ্কিত হয়ে দেখলাম নির্বাচন শেষ হতে না হতেই ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতে গণধর্ষণের শিকার হলো আরেক নারী। নৌকায় ভোট না দেয়ার অপরাধে স্বামী ও চার সন্তানকে বেঁধে ১০/১২ জন আওয়ামী লীগ কর্মী মিলে গণধর্ষণ করলো নোয়াখালীর সুবর্ণচরের পারুলকে। তবে কি যেই যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ? আমরা আবার আতঙ্কিত হলাম।
মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান আমাদের আশ্বস্ত করলেন। দ্রুত গ্রেফতার করতে দেখলাম দু’জন ধর্ষণকারীকে। কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হওয়ার সুযোগ পেলো না। মরার উপর খাড়ার ঘায়ের মতো জানতে পারলাম ধর্ষণ ঘটনার মূল নেতৃত্বদানকারী, চর জুবলী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য এবং সুবর্ণচর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে মামলা নিচ্ছে না পুলিশ। সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়লো। আমরা আবার হতাশায় ডুবে গেলাম। বুঝলাম, কিছুই বদলাবে না আসলে। 

পরদিন আবার আমাদের শঙ্কা কিছুটা কমে এলো যখন জানতে পারলাম, গ্রেফতার করা হয়েছে কুখ্যাত রুহুল আমীনকেও। কিন্তু আমরা আর পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছি না। অনেকেই বলছেন, এই সবই আই ওয়াশ। কিছুই হবে না শেষ পর্যন্ত। কয়েকদিন পর প্রতিবাদের জোর কমে এলে ছাড়া পেয়ে যাবে রুহুল আমীনসহ ধর্ষণকারীরা। দেশের সরকারের উপর, বিচার ব্যবস্থার উপর আমাদের বিশ্বাস ও আস্থা তলানীতে গিয়ে ঠেকেছে নারী প্রতি সহিংসতা ইস্যুতে। বিশেষ করে অপরাধী যদি ক্ষমতাসীন দলের কেউ হয়, তখন আমরা কিছুতেই ভরসা পাই না। আমাদের সামনে নজিরের বড়ই অভাব।
এই ধর্ষণ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমরা আর দেখতে চাই না। আমরা জানতে চাই না একজন ধর্ষণকারী, একজন অপরাধী কোন দলের, কোন মতের? কতটা ক্ষমতাধর সে? বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিক এবং নারী হিসেবে আমরা এই ধর্ষণের রাজনীতির অবসান চাই। উন্নয়নের পক্ষে ভোটদানকারী হিসেবে এটা আমার, আমাদের অন্যতম দাবী।
আপনারা দল মতের উর্ধ্বে উঠে সকল ধর্ষণকারীর, সকল নির্যাতনকারীর, সকল অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করুন। আমাদের আস্থা ফিরিয়ে দিন। দেশের সকল নারী যেনো নির্বিঘ্নে, নির্ভয়ে এই দেশে বাঁচতে পারে। একজন অপরাধীও যেনো নারীর প্রতি যৌন সন্ত্রাস করে, নারীর প্রতি সহিংসতা করে পার না পায়। আমরা আপনাদের উপর আস্থা রেখেছি। আপনারাও তার মর্যাদা রাখবেন আশা করি। রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে তো বটেই, যেকোন বিচারেই ধর্ষণের সংস্কৃতি মুক্ত হোক বাংলাদেশ।
(The preceding is an expression of my own views and do not represent the views of my employer.)
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







