রাজনীতি নিয়ে লিখতে বা বলতে কখনোই রুচি হয় না। প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে খুবই বিরক্ত হলেও তাই প্রকাশ করা হয় না। ক্ষোভ জাগে সমাজ ও রাষ্ট্র সর্বোপরি চারপাশের সবকিছুর উপর। বিরক্তও হই খুব। তবুও সাম্প্রতিক সময়ে দেশে যা ঘটে গেছে এবং আরো ঘটার শঙ্কায় শঙ্কিত, তখন চুপ থাকা যায় না।
সাম্প্রতিক সময়ে শুধু দেশে নয়, বরং বিশ্বব্যাপী আলোচনার একমাত্র ইস্যু ইসলাম ও জঙ্গিবাদ। আজকের জঙ্গিবাদ নিয়ে বলার আগে একটু পেছনে ফিরে যাবো। আমি গ্রামের মেয়ে। তাই কিভাবে কোন ফসলের চাষাবাদ হয় তা দেখেই বেড়ে ওঠা। দেখতে দেখতে এটুকু বুঝি যে, ফসলের আবাদ আর সামাজিক সভ্যতা ভব্যতার আবাদ শাব্দিক অর্থে শুনতে ভিন্ন মনে হলেও মনস্তাত্বিকভাবে যথেষ্ট মিল রয়েছে। এই মিলটা আর কেউ পাক বা না পাক, আমি পাই এটা বুঝি।
বলছিলাম একটু পেছনে ফিরে যাবো। এই যে আজ আমাদের জঙ্গিবাদের মতো একটা ভয়াবহ সঙ্কট সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এর জন্যে দায়ী আসলে কারা? একটু ফিরে দেখি। শুরু করি বৃটিশ শাসন দিয়ে। ১৭৫৭ সালে এই উপমহাদেশের নিজস্ব শাসন ব্যবস্থা পরাস্ত হয়ে শুরু হলো ইংরেজদের শাসন। সেই থেকে এই অঞ্চলের মানুষের কিছু আন্দোলন আমরা ইতিহাসে পেয়েছি। ওইসব আন্দোলনের মধ্যে দু’টো আন্দোলন ছিল সরব ও উল্লেখযোগ্য। আরেকটি আন্দোলন শুরু হয়েছিল আরও অনেক আগে, আনুমানিক এক হাজার বছর আগে থেকে, সেটি ছিল নীরব আন্দোলন এবং বৃটিশ আমলেও তা চলমান ছিল।
আর সরব দু’ আন্দোলনের একটি ছিল বৃটিশশাসন বিরোধী, যা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও স্বাধিকার আন্দোলন। অন্যটি ইংরেজি শিক্ষা, প্রথমটা থেকে দ্বিতীয়টা বিপরীত এবং সম্পূর্ণ স্ববিরোধী। একদিকে ইংরেজ খেদাও মনোভাব, অন্যদিকে ইংরেজিতে কথা বলতে পারাকে জাতে উঠার মতো অহঙ্কার ভাবা। এই যে দু শ’ বছর ধরে এই বিপরীতমুখী দু’টি আন্দোলন চলেছে এর ভেতর দিয়ে কিন্তু তৃতীয় আন্দোলনও অব্যাহত ছিল। সেটি হিন্দু অধ্যুষিত এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার। ইংরেজ খেদাও ও ইংরেজি শিখ আন্দোলনটা দৃশ্যমান থাকলেও তৃতীয় আন্দোলনটা ছিল একেবারেই নীরব এবং ধীর গতির। কিন্তু অব্যাহত ছিল, বলতে পারেন কচ্ছপ গতিতে; যা আজকের দিনে ওই দু’টি আন্দোলনকে পেছনে ফেলে রীতিমত চ্যাম্পিয়ন। এ চ্যাম্পিয়নশিপটা এখন অবশ্য সব দেশেই যার যার ল্যাবে ডোপ টেস্টে নেয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এজন্য দায়ী হলো ধর্ম ব্যবসায়ীরা। তারা কোরআন ও ইসলামকে তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করে রাখায় আজকের এই ভয়াবহ সংকটের সৃষ্টি। এই বিষয়ে সমস্ত জ্ঞান তারা নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে, কাউকে জানতে বা শিখতে দেয়নি। বিষয়টা ছিল এরকম যে এ বিষয়ে শুধু তারাই বলবে, আর অনুসারীরা শুধু শুনবে এবং পালন করবে। কিন্তু, জানতে পারবে না, জানা বারণ।
তারও অবশ্য একটা কারণ আছে। সেটা হলো, প্রায় এক হাজার বা তারও বেশী সময় আগে এই উপমহাদেশ ছিল শুধুমাত্র হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল। হিন্দু মানে জাত বেজাতের একটা ফারাক থেকেই যায়। ব্রাহ্মণ দ্বারা নিম্ন জাতের হিন্দুদের অত্যাচারিত হওয়ার মাত্রাটা কারো অজানা নয়। ঠিক সেই সময় ইরাকী ও ইরানীরা এখানে আসে ইসলাম প্রচার করতে। তখন তাদের প্রচার করা ইসলাম যারা গ্রহণ করেছে তারা সবাই ছিল ব্রাহ্মণ দ্বারা নির্যাতিত নিম্ন বর্ণের হিন্দু। ইসলাম গ্রহণ করে জাত বেজাত আর অচ্ছুত এর বেড়াজাল থেকে বের হলেও তাদের রক্তের ভেতর বিষাক্ত ধ্যান ধারণা রয়েই যায়। মুসলমান হয়ে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান নিয়ে তারা নিজেরাও ধারণ করলো ব্রাহ্মণ্যবাদী রূপ। ধর্মীয় জ্ঞান নিজেদের হাতেই রাখতে হবে। কাউকে জানতে দেয়া যাবে না। সবাই জানলে তাদের গুরুত্ব কমে যাবে।
ইংরেজি শিক্ষা নিয়ে যারা আন্দোলন করেছে তারা একটা যুক্তি দিত যে, ইংরেজ খেদাতে হলে ইংরেজি জানাটা খুবই জরুরি। ঠিক একইভাবে তখন ধর্মীয় নেতারা যদি বলতো ইসলাম পালনের জন্যে আরবী শিখাটাও খুবই জরুরি তাহলে অন্ততঃ এ ভূ-খণ্ডে এখন বিষয়টা আজকের মতো এরকম আতংকের হতো না। লাখো ঈমামের সই করা ফতোয়ার দরকার হতো না।
আমাদের দেশে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আরবী শিক্ষার প্রশ্নই আসে না। আপাততঃ মাদ্রাসাগুলোর কথাই ধরা যাক। মাদ্রাসার শিক্ষার জন্য একটা বোর্ড আছে আলাদাভাবে। কিন্তু কেউ কি বলতে পারবেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা অনর্গল আরবী বলতে পারে? এখানে একটা বিষয় পরিস্কার করি। শুদ্ধভাবে পড়তে পারলেই কিন্তু কথা বলা যায় না। আমি আরবী পড়তে পারি (দেখে আরো ভালো ও শুদ্ধভাবে পারি) কিন্তু বুঝি না কিছুই। ইংরেজিটা বলতে না পারলেও পড়ে বা শুনে বুঝতে পারি। সেই বৃটিশ গেলো, পাকিস্তান গেলো স্বদেশী শাসন আসলো। কিন্তু ধর্ম ব্যবসায়ীদের চরিত্র একই রয়ে গেলো। উপরন্তু নতুন করে সমাজে সৃষ্টি হলো রাজনৈতিক মত পার্থক্যের এক চরম বিভাজন।
আজকের দিনে নিজেদের আধুনিক দাবি করা মানুষগুলো ভুলে গেছে বা মানতে চায় না যে, ধর্ম হলো প্রত্যেক মানুষের জন্মসূত্রে পাওয়া এক আত্মিক বিশ্বাস ও অনুভূতির নাম, যা আমাদের রক্ত প্রবাহের সাথে মিশে আছে, (সে যে ধর্মেরই হোক) যা চাইলেই আমরা অস্বীকার করতে পারি না। জন্মের পর থেকে আল্লাহ, ঈশ্বও, ভগবান শব্দগুলো শুনে বেড়ে ওঠা হয় এই সমাজের ছেলেমেয়েদের। সমস্যা হলো শুনে বেড়ে ওঠার পর এই নামগুলোর সাথে জড়িত যাবতীয় জ্ঞান অর্জন করতে না পারা। আর যাদের এসব বিষয়ে জানার প্রবল ইচ্ছে জেগে ওঠে তারা কি করবে? কোথাও সরাসরি কোন সুযোগ নাই। ধর্মীয় বিষয়টা ধর্মীয় প-িতদের বয়ান শুনার জন্যে জাগতিক সব কাজ কর্ম ফেলে রেখে তাদের দরবারে গিয়ে শুনতে হবে।
আবার কেউ যদি কোন মিডিয়ার মাধ্যমে কারো ঘরে পৌঁছে যায় আর তাদের মুখোশ খুলে দেয় সেখানেও বাধা। বিগত ক’বছর ধরে তো মরার উপড় খাড়ার ঘা। একে তো আমাদের ধর্মীয় বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের সহজ ও সরাসরি তেমন কোন সুযোগ নেই, অন্যদিকে ক’ বছর ধরে দেখছি ধর্মীয় বই পুস্তক পেলেই ওটাকে জিহাদী বই নাম দিয়ে জঙ্গি খাতায় নাম উঠিয়ে দেয়া হয়। তাহলে মানুষ শিখবে কোথা থেকে? জানবে কিভাবে যে, সে যেই ধর্মের অনুসারীর ঘরে জন্মেছে সেটা আসলেই কেমন।
এ কারণে ধর্মীয় বিষয়ের সাথে জড়িত যে একটা বিশাল জগৎ আছে সেটা আমাদের সম্পূর্ণ অজানা ও রহস্য ঘেরা থেকে যায়। যাদেও ভেতর এই অজানাকে জানার ও রহস্য উন্মোচন করার একটা তীব্র ইচ্ছেটা জাগে, ভাবুন তাদের অসহায় অবস্থাটা। অসহায় অবস্থা বলছি কারণ আমাদের ধর্মীয় প-িতরা তাদের জন্যতো কোন রাস্তা খোলা রাখেনি। ধর্মটা জানা যতটা জরুরি এবং গুরুত্বের সাথে বলা হয় ততটাই দূরত্বে রাখে ধর্মীয় ভাষা থেকে। আমাদের ধর্ম যেহেতু ইসলাম তাই আমাদের ধর্মীয় ভাষা আরবীটা জানাও ততটা জরুরি। এদেশে মাদ্রাসা ছাত্ররাই তো বলতে গেলে এই ভাষা জানে না। তাই কোরআন সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞানও তারা অর্জন করতে পারে না। এই ভাষা এবং এই বিষয় সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান যুগ যুগ ধরে থেকে গেছে হাতে গোণা কয়েকজনের মধ্যেই। আর অন্যদিকে অজানাকে জানা এবং রহস্য উন্মোচনের নেশায় যারা বুঁদ হয়ে থাকে তারা বন্য বানরের খপ্পরে পড়ে হারিয়ে যায় গহীন অরণ্যে। আমরা যখন তাদের সন্ধান পাই তখন পড়ে থাকে শুধুই কংকাল।
ইসলাম ধর্মের কথিত পণ্ডিতদের এই কুচক্র ভেদ করতে না পেরে এবং ইসলাম ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা পড়ে একটা শ্রেণী হয়ে যায় নাস্তিক। ছড়ায় ধর্মের নামে বিষবাষ্প। শুরুতেই বলছিলাম চাষাবাদের কথা। এই যে, শত শত বছর ধরে ধর্মীয় নেতারা তাদের স্বার্থে সাধারণ মানুষকে না জানানোর একটা বিষাক্ত বীজ সমাজে রোপণ করে এসেছে তা আজ এতটাই ভয়ঙ্কর বিষবৃক্ষে পরিণত হয়েছে যে, ওটা নি:সৃত বাতাসও সমাজে মৃত্যু ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। যদিও অনেক দেরি হয়ে গেছে তবু সব শেষ হয়ে যায়নি। এখনো যদি তারা ঘুরে দাঁড়ায় এক সময় সুফল পাওয়া সম্ভব।
(এ
বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর
সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







