বসে আছি দোহার হামাদ আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে। ঘড়িতে ভোররাত ৪টা ১৭ মিনিট, এমন সময় অত্যন্ত সুকণ্ঠে ভেসে আসে চিরচেনা শব্দগুচ্ছের সুর, যেই সুরের অর্থ নামাজের জন্য আসো। প্রায় ৫০ গজ হেটে দেখা মিললো বিমান বন্দর তথ্য কেন্দ্রের, তথ্য ডেস্কে বসে আছেন পাকিস্তানের নাগরিক ‘মোহাম্মদ’, যিনি গত ৬ মাস ধরে চাকুরী করছেন এই ডেস্কে। তবে তিনি এর আগে চাকুরী করেছিলেন দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। তথ্য দেওয়ার সময় জনাব মোহাম্মদের হাসিমুখের বাচনভঙ্গী দেখে মনে হলো তিনি একজন ‘সমৃদ্ধ তথ্য শিল্পী’। অর্থাৎ সীমিত শব্দ ব্যবহার করে যথাযথ তথ্যের সাথে উপহার হিসেবে দেন আন্তরিকতার হাসি। আর হাসতে হাসতেই বললেন ‘ইউ ক্যান টেইক পিকচারস বাট নট অফ আস’। অর্থাৎ বিমান বন্দরের ছবি তুললেও কোন কর্মীর ছবি নেওয়া নিষেধ।
বিমান বন্দরের ভেতরে মসজিদের লোকেশন জানতে চাইলে তিনি জানান, বিমান বন্দরের ভেতরে কোন মসজিদ নেই, তবে নামাযের জন্য ৮টি রুম আছে। যেখানে পুরুষদের জন্য ৫টি রুম আর মহিলাদের জন্য রয়েছে ৩টি রুম। বিমান বন্দরেরর বিভিন্ন গেইটে এই নামাযের রুমগুলো অবস্থিত।

একটু সামনে যেতেই দিক নির্দেশনার চিহৃ দেখে সহজেই বুঝা গেল পাশেই নামাযের স্থান। তথ্য অফিসারের মতে নামাযের রুম হলেও বাস্তবে প্রত্যেকটি রুম এক একটি মসজিদ। যেই মসজিদে প্রবেশের বাম পাশে রয়েছে ওযুর স্থান। প্রতিটি ওযুর স্থানে ৫জন মুসল্লি এক সাথে বসে ওযুর সুযোগ রয়েছে। তবে সমগ্র বিমান বন্দর জুড়েই রয়েছে করোনা স্বাস্থ্যবিধির নিয়ম নীতি। তাই ওযুর স্থানে একটির পর অন্য আসনটি বন্ধ আছে। ওযুর জন্য নির্ধারিত পানির কলগুলোতে রয়েছে আধুনিকতা। কোন রকম স্পর্শ ছাড়াই কলের নিচে হাত রাখলেই পানি আসে। সুপেয় পানি ওযুর স্থান থেকেই অনেক মুসল্লিরা সংগ্রহ করেন।
ওযুর স্থান ঘেঁসেই রয়েছে জুতা ও ব্যাগ রাখার কাঠের তৈরী কেবিনেট। মুসল্লিরা নিজ নিজ জিনিস কেবিনেটে রেখেই মসজিদে প্রবেশ করেন। উন্মুক্ত কেবিনেট হলেও কখনই কোন জিনিস এখান থেকে হারায়নি বলে জানান বিমান বন্দরে নিয়োজিত সিকিউরিটির একজন কর্মকর্তা।
প্রতিটি মসজিদের ভেতরের আয়তন প্রায় ৪০০ স্কয়ার ফিট। যেখানে ৬০-৭০ জন মুসল্লি একসাথে নামায আদায় করেন। সামগ্রিক ভাবে হামাদ আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে প্রতি ওয়াক্তে ৮টি নামাযের রুমে সর্বমোট ৫৫০ জন মুসল্লি একসাথে জামাতে নামায আদায় করতে পারেন। নামায কক্ষের একপাশে সাজানো থরে থরে কোরআন শরীফ। মিশর থেকে আসা জনাব রাশেদ ফযর নামায শেষে বসে পড়েন কোরআন শরীফ তেলোয়াত করতে। একই সময়ে আরো কয়েকজন মুসল্লিকে কোরআন শরীফ নিয়ে বসতে দেখা যায়। যাদের প্রত্যেকের ট্রানজিট সময় ৬ ঘণ্টা।

ফযর নামায শেষে কথা হয় সিলেটের রফিক উদ্দিনের সাথে। জনাব রফিক এর গন্তব্যস্থান প্যারিসে। বিমান বন্দরে মনোরম পরিবেশে জামাতে নামায শেষ করে বেশ হাসিখুশি দেখা যায় তাকে।
হামাদ আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নামাযের স্থানের পরিবেশ যেমন মনোরম তেমনি সুসজ্জিত পুরো বিমান বন্দর। যেখানে খুব সহজেই কেটে যায় ট্রানজিটের ৬ ঘণ্টা সময়।
৫ মিনিটেই পাওয়া গেল হারিয়ে যাওয়া জিনিস, সক্রিয় লস্ট এন্ড ফাউন্ড ডিপার্টমেন্ট জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সোলায়মান হোসেন রাকিব উচ্চ শিক্ষার জন্য যাচ্ছেন জার্মানির ব্রেমেন শহরে। বিদায় বেলায় বন্ধুরা মিলে রাকিবকে উপহার দিল নীল রঙের ওয়ান প্লাস ব্র্যান্ডের একটি ব্লুটুথ হেড ফোন। ট্রানজিট সময়ে সেই হেডফোন দিয়েই পরিবার ও বন্ধুদের সাথে কথা বলছিলেন রাকিব। তবে ট্রানজিট শেষে জার্মানির উদ্দেশ্যে ফ্লাইটের পূর্বে হেডফোনটি কোথাও হারিয়ে ফেলেন তিনি। দীর্ঘ সময় খোঁজাখুজিও করেন তিনি। খুঁজবেনই বা না কেন! এ যে প্রিয় বন্ধুদের দেওয়া ভালোবাসা, প্রিয় স্পর্শ। অনেক খোঁজাখুজির পর তিনি সহায়তা নেন বিমান বন্দর তথ্য কেন্দ্রের।

তথ্য কেন্দ্র বিষয়টি জানার সাথে সাথেই যোগাযোগ করেন লস্ট এন্ড ফাউন্ড টিমের সাথে। লস্ট এন্ড ফাউন্ড টিমের সুপারভাইজার জনাব রাকিব থেকে হেডফোনের আকার, রং, ধরন ইত্যাদি জেনে নেন। এর ৫ মিনিটের মধ্যেই নিয়ে আসেন সেই হেডফোন, সাথে সংযুক্ত লস্ট এন্ড ফাউন্ড টিমের দেওয়া রেফারেন্স নম্বর ৭১৪৫।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







