দীর্ঘ আড়াই বছরেও বহুল আলোচিত বেসিক ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারির মামলাগুলোর তদন্ত শেষ না হওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রতি চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট।
বেসিক ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারির মামলায় ব্যাংকের সাবেক ডিএমডি ফজলুস সোবহানসহ বেশ কয়েকজনের জামিন আবেদনের শুনানিকালে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন।
আজ আদালতে দুদকের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী খুরশিদ আলম খান, সৈয়দ মামুন মাহবুব ও ফজলুল হক। জামিন আবেদনকারীদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী রোকনউদ্দিন মাহমুদ।
শুনানির শুরুতেই দুদকের আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে আদালত বলেন, গত আড়াই বছরে ৫৬টি মামলার মধ্যে একটি মামলারও চার্জশটি দিতে পারেননি। ঋণ যাচাই বাছাই কমিটির নেতিবাচক সুপারিশ (নেগেটিভ ফাইন্ডিং) থাকার পরও বোর্ড কীভাবে ঋণের অনুমতি দিল? সেই বোর্ডের কাউকে কেন আসামি করা হয়নি?
এর জবাবে খুরশীদ আলম খান বলেন, আমরাতো চেষ্টা করছি। আদালতের আদেশের পর প্রত্যেক তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে বসেছি। তদন্ত কর্মকর্তাদের কোনো গাফিলতি নেই। দুদক বসে নেই। ব্যাংকের চেয়ারম্যানকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। প্রত্যেকটা বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এসময় আদালত বলে, আমাদের এত পর্যবেক্ষণ, নির্দেশনায় কী হয়েছে? আসামি গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রেও পিক অ্যান্ড চুজ করেছেন।
আদালত বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির অর্থের উৎস খুঁজে দেখতে দুদক চেয়ারম্যান ও একজন পরিচালকের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, টাকা কোথায় গেল এটা খুঁজে দেখতে হবে কেন? এটা অর্থপাচারের মামলা না। এখানে দেখতে হবে অপরাধজনিত কারণে বিশ্বাস ভঙ্গ হয়েছে কিনা, অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে কিনা। এক্ষেত্রে কেয়ামত পর্যন্ত অর্থ খুঁজেও টাকা পাওয়া যাবে না।
এসময় বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারক বলেন, এটা যদি একজন কৃষকের বিরুদ্ধে ৫ হাজার টাকার ঋণের মামলা হতো, তাহলে তার মাজায় রশি বেঁধে নিয়ে আসা হতো। এদের বেলায় হচ্ছে না কেন?
এরপর বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, আমরা এখন আর কী বলব। আমরাতো তদন্তকারী কিংবা প্রসিকিউটর হতে পারব না।
আপনাদের নির্লিপ্ততার কারণে যেসব আসামি ভেতরে আছে তারা বেরিয়ে যাচ্ছে। চার্জশিট দিতে দেরি করছেন। আসামিরা জামিন পেয়ে যাচ্ছে। আমরা তাদের জামিন দিতে বাধ্য হচ্ছি।
এরপর আদালত দুদকের তদন্ত কর্মকর্তাদের পক্ষে দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের কাছে মামলার অভিযোগপত্র দিতে বিলম্বের কারণ জানতে চায়।
এসময় ইকবাল হোসেন আদালতকে বলেন, আমরা তদন্তের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি।
এসময় বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বলেন, আপনাদের এই পারফরম্যান্স আমরা হতাশ। এখন আমাদের জামিন দিতে হচ্ছে। সব আসামি এক এক করে বের হয়ে যাচ্ছে।
এরপর কনিষ্ঠ বিচারক বলেন, প্রায় শেষ বলছেন। এটাকি আসলেই শেষ নাকি ছোটো গল্পের মতো শেষ হয়েও হইলো না শেষের মতো?
এসময় আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারক দুদক পরিচালককে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি মনে করেন টাকা আত্মসাৎ হয়েছে? তখন ইকবাল হোসেন আদালতকে বলন, হ্যা, আত্মসাৎ হয়েছে।
তখন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম দুদক পরিচালককে জিজ্ঞেস করেন, তাহলে ঋণ গ্রহীতাদের গ্রেপ্তার করছেন না কেন?
জবাবে সৈয়দ ইকবাল হোসেনে বলেন, ঋণ গ্রহীতারা ঠিকানা পরিবর্তন করে। যে ঠিকানা আমাদের কাছে অাছে সে ঠিকানায় খুঁজে পাওয়া যায় না।
এসময় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, বলছেন ঠিকানা পরিবর্তন করছে। কিন্তু তাদের তো টকশোতে দেখি। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও দেখা যায়।
রাষ্ট্রের এতগুলো টাকা চলে গেল। এখন সংস্থা যদি কাজ না করে আমাদের তো করার কিছু নাই। এখন লজ্জায় মনে হয় কালো কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকি।
এর আগে আজ দুপুরে শুনানি শুরুর আগেই মামলার নথিপত্রসহ আদালতে হাজির হন বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ৫৬ মামলার ৮ তদন্ত কর্মকর্তা। আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলাগুলোর তদন্ত শেষ না হওয়ায় গত ২৩ মে হাইকোর্টের এই বেঞ্চ ওই তদন্ত কর্মকর্তাদের তলব করেছিলেন।
রাষ্ট্রায়ত্ব বেসিক ব্যাংকের বোর্ড চেয়ারম্যান থাকাকালে ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে নিয়ম ভঙ্গ করে আব্দুল হাই বাচ্চু সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়। ২০১৪ সালের ১৪ জুলাই দুদকের কাছে পাঠানো এক প্রতিবেদনে বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির বিশদ বিবরণ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেখানে মূলত বাচ্চুকেই দায়ি করা হয়।
এরপর ২০১৫ সালের ২১, ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনায় রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন ও গুলশান থানায় ১২০ জনকে আসামি করে ৫৬ টি মামলা করে দুদক। এসব মামলায় বেসিক ব্যাংকের ২৭ কর্মকর্তা, ১১ জরিপকারী ও ৮২ ঋণগ্রহণকারী ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। কিন্তু এসব মামলার কোনোটিতেই বাচ্চুকে আসামি করা হয়নি।








