বর্তমান সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং ভয়ঙ্কর জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) সিরিয়ার বিশাল অংশ দখল করে চরমপন্থী শাসনকার্য পরিচালনার করার কারণেই ইউরোপ অভিমুখে লক্ষ লক্ষ অভিবাসন প্রত্যাশীর এক তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
তবে সিরিয়ার আসাদ সরকারকেও দোষারোপ করেছে অভিবাসন প্রত্যাশীরা।
তুরস্কের এডিন প্রদেশ থেকে এক অভিবাসন প্রত্যাশীর সাথে কথা বলার সময় আইএসের কঠোর শাসন এবং সেখানকার অধিবাসীদের চরম দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেন বিবিসির প্রতিনিধি মার্ক লোয়েন।
চলতি বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে মোহাম্মদ নামের অভিবাসী ছেলেটি শঙ্কা প্রকাশ করে বলে, তারা যদি জানতে পারে আমি আপনার সাথে কথা বলেছি তবে তারা আমাকে মেরে ফেলবে। যারাই তাদের বিরুদ্ধে কিছু করবে, সাংবাদিক বা টিভি চ্যানেলের সাথে কথা বলার জন্য যাদেরকে সন্দেহ করা হবে, তাদেরকেই তাৎক্ষণিকভাবে হত্যা করা হবে।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত যুদ্ধ, দারিদ্র, নির্যাতন থেকে মুক্তি পেতে প্রায় ৬ লাখ অভিবাসী ইউরোপে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর’এর হিসাব মতে সিরিয়ার সংঘাত থেকে পালিয়ে এ বছরে ইউরোপে আশ্রয় নিয়েছে ৫ লাখ ২০ হাজার শরণার্থী।
ইংরেজি বলায় দক্ষ তরুণটি আইএস অধ্যুষিত সিরিয়ার রাকা শহর যেটি কার্যতঃ তাদের রাজধানী হিসেবে বিবেচিত, সেখান থেকে পালিয়ে তুরস্কে আশ্রয় নিয়েছে।
আইএস’র একটি বড় গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক রয়েছে উল্লেখ করে মোহাম্মদ বলে, অনেক বিদেশী লোক রয়েছে যারা আইএসের পক্ষে কাজ করছে এবং তাদের সকল বিষয়ে তথ্য সরবরাহ করে থাকে। আইএস’এর পক্ষে কাজ করতে আমি দেখেছি জার্মানি, রাশিয়ার চেচেন জাতি, তুরস্ক, সৌদি আরব এবং তিউনিশিয়ার নাগরিকদের। তারাই আমাদের ধরিয়ে দিবে।
যেহেতু ইসলামিক স্টেট সেই সময়টিতে তার নিয়ন্ত্রণ প্রসারিত করছে এবং তাদের তাণ্ডব অব্যাহত রেখেছে, মোহাম্মদের মতো যারা এই পরিস্থিতি প্রত্যাখান করে স্বাধীন মতো থাকতে চায় তারাই অভিবাসনের পথ বেছে নিয়েছে। নিরাপত্তার জন্য মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিতেই এই গণ অভিবাসন পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।
মূলতঃ আইএসের হুমকির ফলেই ইউরোপ অভিমুখে বিশাল অভিবাসী প্রত্যাশীদের স্রোত সৃষ্টি হয়েছে।
তরুণটি জানায়, আইএসের কঠোর শাসনের অত্যাচারে দুর্ভোগপীড়িত স্থানীয় অধিবাসীরা আসাদের শাসনেই থাকার প্রত্যাশার কথা জানিয়েছে। যদিও দুই পক্ষই শয়তান, তবে আইএস সবচেয়ে নিকৃষ্ট।
এডিন এর একটি স্টেডিয়ামে বসে তরুণটি আইএস প্রতিষ্ঠিত ‘খিলাফত’ শাসন ব্যবস্থার মূল বিষয়গুলো এবং কঠোরতার চিত্র তুলে ধরেন। স্টেডিয়ামটিতে তুরস্ক-গ্রিসের সীমান্ত অতিক্রম করার জন্য আরো ২ হাজার অভিবাসী আশ্রয় নিয়েছিলো।
আইএসের কঠোর অনুশাসনের বর্ণনা করতে গিয়ে তরুণটি বলেন, খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা প্রতিদিন শুধু দুই ঘন্টার জন্য বিদ্যুত সংযোগ পাই। এখানে ধুমপান করা নিষিদ্ধ। আমাকে দুইবার সিগারেটসহ আটক করেছিলো। এর জন্য আমাকে একদিনের জেল খাটতে হয়েছে এবং ২০ বার বেত্রাঘাতের শাস্তি ভোগ করতে হয়েছে। পুরুষদের ক্লিন শেভ করা নিষেধ। এর ব্যতিক্রম হলে জেল খাটতে হবে।
তরুণটি বলে, আইএস যখন প্রথম এখানে এসেছিলো তখন আমরা খুশিই হয়েছিলাম। কারণ তারা প্রেসিডেন্ট আসাদের বাহিনীকে হটিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু এরপরই তারা তাদের নিয়ন্ত্রণ কঠোরতর করে। তারা তাদের শাসন আরোপ করে।
আইএসের আগমনের ফলে কি ধরনের পরিবর্তন হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে সে বলে, কয়েক মাস আগেও আমাদের বাসায় ইন্টারনেট সংযোগ ছিলো। এখন ইন্টারনেট ব্যবহারে আমাদের ক্যাফেতে যেতে হয় এবং আমরা কোন সাইট দেখছি তা আইএস যোদ্ধারা এসে দেখে যায়।
বাসাবাড়ি থেকে ডিশ স্যাটেলাইট বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হবে বলেও তারা জানিয়েছে যাতে করে আমরা শুধু তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন চ্যানেল দেখতে পারি।
যোদ্ধারা সবসময়ই অস্ত্র বহন করে বলে জানিয়েছে তরুণটি। সে বলে, তুমি যখনই আমাদের নাগরিকদের মুখের দিকে তাকাবে তাদের চোখে আতঙ্ক দেখবে। তারা সবসময়ই আতঙ্কিত থাকে কারণ একটি ভুল শব্দও তাদের কারাগারে পাঠাতে পারে বা এর চেয়েও খারাপ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। আমরা ইসলাম ধর্ম ভালোবাসি তবে এটা কখনই ইসলাম নয়।
রাকা শহর জুড়ে আইএস এর কালো পতাকা উড়ছে এবং প্রতিটি প্রশাসনিক কার্যালয়ের ভবনের দেয়ালে ‘ইসলামিক স্টেট’ এর নাম অলঙ্কৃত করা হয়েছে।
নিরাপদে ইউরোপে পৌছানোর ব্যাপারে বেপোরোয়া মনোভাব দেখা যায় মোহাম্মদের। নৌকায় সীমান্ত অতিক্রম করে গ্রিস যাওয়ার জন্য পাচারকারীদের দাবি করা ২ হাজার ইউএস ডলার পরিশোধে ব্যর্থ তরুণটি তার জীবন ঝুঁকিতে ফেলতেও চায় না।
কিন্তু ১ লাখ ২০ হাজার শরণার্থীকে ইইউভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বন্টনের পরিকল্পনার আওতায় সে পড়ে না। কারণ যারা এরইমধ্যে ইতালী বা জার্মানির অংশে অবস্থান করছে তারাই এই সুবিধাটি পাবে। তুরস্কে বসে যারা এর প্রত্যাশা করছে তাদের জন্য নয়। তাদের থেকে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। কিন্তু মোহাম্মদ তা প্রত্যাখান করেছেন।
মোহাম্মদ বলে, এখানে আমি আমার জন্য ভদ্রোচিত জীবন গড়তে পারবো না। আমি খুবই সামান্য আয় করি তারা আমাকে এখানে চায় না। আমি যদি ইউরোপ যেতে না পারি তবে রাকায় ফিরে যাবো। সেখানে অবরুদ্ধ অবস্থায় জীবন চালাতে হলেও আমি আমার পরিবারকেতো কাছে পাবো।






