পেটে-ভাতে দিন চলে গেলেই হলো- এমন মানসিকতা এখন দেশের সাধারণ মানুষের। বিশেষ করে কোভিড-১৯ সারা পৃথিবীকে বদলে দিয়েছে। মৃত্যুভয় তাড়া করে সর্বক্ষণ। আর্থিকভাবে মানুষের টানাপোড়েন নিত্যকার জীবনের চালচিত্র। এ অবস্থায় দেশ- রাজনীতি হয়ে গেছে বিশেষ কিছু মানুষের আলোচ্য বিষয়। আর সে দলে রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধ করার লোক সংখ্যাই বেশি।
তবে এ অবস্থার জন্য দায়ী হলো, শুদ্ধ রাজনৈতিক চর্চার অভাব। বিশেষভাবে সরকার সমর্থিত আওয়ামী লীগের কর্মী ও সমর্থক এখন সারাদেশে এত বেশি যে, তা দেখে মনে হয় দেশে আর কোন দল নাই। এর কারণ একটাই, আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় রয়েছেন। চিন্তা-চেতনা ও মননে আওয়ামী লীগার না হয়েও প্রকাশ্যে আওয়ামী প্রেমির ভান ধরে পদ-পদবি ধারণ করে ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করার এখন সহজলভ্য। কারণ পদ পেতে আজকাল আর দলের আদর্শ বা ত্যাগী নেতা হতে হয় না। বরং স্বর্ণলতার মত পরগাছা হয়েই সুযোগ সুবিধা বেশি পাওয়া সম্ভব।
তাই আওয়ামী রাজনীতিতে আগাছাদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আর এই আগাছারই সরকার, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
সাধারণ মানুষ নীরবে সব কিছু হয়তো বা সহ্য করছে। তবে এ সহ্যশক্তি কতদিন ধরে রাখতে পারবে তা ভাবতে হবে দলকে। এলাকাভিত্তিক রাজনীতি বলতে গেলে এখন নিয়ন্ত্রণহীন। উঠতি যুব সমাজের দাপট দেখে দলের পুরনো ত্যাগী নেতা, কর্মীরা ও হতবাক হয়। এমন কি সরকারের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর তাদের এতটাই প্রভাব যা দেখে সাধারণ মানুষ আতংকিত হয়। মিথ্যে আওয়ামী লেবাসে এসব ব্যক্তির নিজেকে জাহির করার প্রবণতা ব্যক্তি নয় দলকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে জনগণের কাছে। এক সময় বলা হতো দল হাইব্রিডদের দখল। আর এখন বলা যায় হাইব্রিডদের পাশাপাশি দল আগাছাদেরও কবলে। এ আগাছারা কোনদিন দলের দুঃসময়ের বন্ধু হবে না। এরা কেবল সরকারের উন্নয়নের পথ চলাতে বন্ধুরতা সৃষ্টি করছে। যদি দেশে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হয় তবে তার প্রমাণ মিলবে আগামী নির্বাচনে।
যেখানে সরকার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণের জীবনযাত্রার উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে; সেখানে একটা মুজিব কোট পরিধান করেই রাতারাতি আওয়ামী লীগ বনে যাওয়া ব্যক্তিদের বিশ্বাস করা ভুল। কারণ এরা তাদের কার্যকলাপে বারবার প্রমাণ করে ‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড়।’ তা না হলে দেশে দুর্নীতি শব্দটা এতদিনে হারিয়ে যেতো, যদি প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের নীতি অনুসরণ করত।
দলের স্বার্থে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহ অন্যান্য সেক্টরে যে ধরনের অন্যায়, দুর্নীতি বিদ্যমান তার অন্তরালে কারা কিভাবে কাজ করছে তা খতিয়ে দেখা খুবই জরুরি। কারণ সরকার আসে সরকার যায়। কিন্তু দল টিকে থাকে তার আদর্শ আর ত্যাগী নেতা কর্মীদের সংগ্রাম ও সাধারণ মানুষের ভালোবাসা নিয়ে। দেশের সব মানুষ সরাসরি রাজনীতি করে না। কিন্তু তারা নিজেদের বিশ্বাস, ভালোবাসা, দেশপ্রেম, দলের আদর্শ ও নেতা কর্মীদের কর্ম দিয়ে দলের সমর্থক হয়। নির্বাচনে ভোট দিয়ে দলকে জয় করে দলে জনগণের জন্য কাজ করবে এ চিন্তা করে।
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে,বর্তমানে দেশের মানুষ মনে করে, ‘সরকার দলে আছি’ এ কথাটা কোনভাবেই প্রকাশ করতে পারলে একটু ভালো থাকতে পারবো। এখানে মুক্তিযুদ্ধ, দেশ প্রেম, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এত কিছু নিয়ে চিন্তার প্রয়োজন নেই। নিজেকে সমস্যা মুক্ত রাখতে আওয়ামী লীগ করাই শ্রেয়। কারণ সারা দেশে কে সত্যিকারের আওয়ামী লীগ তা কেউ দেখার নেই। অন্যদিকে যারা সরকার দলের লেবাস নিয়ে অনিয়ম দুর্নীতির সাথে হাত মিলিয়ে বিত্তশালী হয়ে উঠেছে তারা রাজনৈতিক অংক কষে আগামী নির্বাচন নিয়ে চিন্তা করে না। তাদের ভাবনা হলো আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় না আসলে তাদের ধ্বস নামবে। কারণ এরা ত্যাগী নেতাকর্মী কিংবা হাইব্রিড নয়, এরা হলো দলের আগাছা।
এদের কাছে শেখ হাসিনা আর আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দর্শন নয়। বরং আওয়ামী সরকার হলো তাদের মিথ্যা লেবাসে ক্ষমতা পাওয়ার সিঁড়ি। আর এ সিঁড়ি যে কোনভাবে নির্বাচনে করে আবার ক্ষমতা এলে তাদের জীবনের ভোগ বিলাস বাড়বে বৈ কমবে না। তাই এরা জনগণের ভোটাধিকারকে বিঘ্ন ঘটাতে ও কুন্ঠাবোধ করে না। যার প্রমাণ দেখা যায় জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে। সুতরাং কালক্ষেপণ না করে দলের নাম আর মুজিব কোটধারী এসব আগাছাকে উপড়ে ফেলার দিকে দৃষ্টি দেয়াটা উচিত সরকার ও দলের সত্যিকারের নেতাকর্মীদের।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








