রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে তৃতীয় কারো উত্থানের কথা দীর্ঘদিন ধরে শোনা গেলেও এবং আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপির দুর্বলতার সুযোগে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী/প্রতিপক্ষ হিসেবে যেসব দল ও জোটকে তৃতীয় শক্তি হিসেবে ভাবা হচ্ছিলো কিংবা তারা নিজেরাও নিজেদের তৃতীয় শক্তি বলে দাবি করছিলো—তাদের একটি বড় অংশই এখন ধানের শীষে বিলীন।
যদিও এই জোট নির্বাচনে জয়ী হলে এবং বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বা তার পরিবারের কেউ নির্বাচনের বাইরে থাকলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন—তা নিয়েও ধোঁয়াশা কাটেনি। এর বাইরে বিকল্পধারা নামে যে বিকল্পশক্তি তুলনামূলক কম শক্তি নিয়েও একটা ভিন্ন ইমেজ তৈরি করার প্রয়াস পাচ্ছিলো, তারাও গাঁটছড়া বেঁধেছে ক্ষমতাসীনদের সাথে। তাহলে বিকল্প বা তৃতীয় শক্তি বলে আর কী থাকলো?
স্মরণ করা যেতে পারে, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশের রাজনীতিতে ওয়ান ইলেভেন বা এক এগারো নামে বড় ধরণের পটপরিবর্তনের পরে ‘তৃতীয় শক্তি’ শব্দটি নানা ফোরামে আলোচিত হতে থাকে। কিন্তু শেষাবধি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে কোনো দল বা জোট নিজেদের তৃতীয় শক্তি হিসেবে প্রমাণে ব্যর্থ হয়। এমনকি ওই সময়ের সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে কিছু রাজনৈতিক দলকে (যাদেরকে পরবর্তীতে কিংস পার্টি নামে আখ্যা দেয়া হয়) দেশের বড় দুটি দলের বাইরে বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা হলেও তারা আখেরে হালে পানি পায়নি।
কারণ নানা আলোচনা-সমলোচনার পরও দেশের মানুষ এখনও মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতেই বিভক্ত। এমনকি এরশাদের জাতীয় পার্টিও উত্তরবঙ্গের কিছু জেলা বাদ দিলে দেশের অন্যান্য এলাকায় ওই অর্থে তৃতীয় শক্তি নয়। তারা আওয়ামী লীগের সাথে মহাজোটের অংশ হিসেবে নির্বাচন করলে যে আসন পায়, এককভাবে তিনশো আসনে প্রার্থী দিলেও সেই পরিমাণ আসন পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখেও সেই ‘তৃতীয় শক্তি’ কথাটি পুনরুচ্চারিত হচ্ছিলো। ধারণা করা যাচ্ছিলো, সাবেক আওয়ামী লীগ (ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্না, কাদের চৌধুরী) এবং সাবেক বিএনপি (বি. চৌধুরী) নেতাদের দলগুলো মিলে হয়তো একটি বড় জোট গঠন করবে এবং ক্ষমতায় যাক বা নাক, অনেক বেশি আসন পাক বা না পাক—অন্তত প্রধান দুটি দলের বাইরে গিয়ে একটা নতুন শক্তি হিসেবে তারা আবির্ভূত হবে—এমন একটি ধারণা বা গুঞ্জন রাজনীতির মাঠে ছিল।
কিন্তু গণেশ উল্টে দিয়ে যেই লাউ সেই কদু তথা সম্ভাব্য বিকল্প শক্তিগণের একটি অংশ বিএনপির সাথে মিলে গঠন করলেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং শুধু তাই নয়, ড. কামাল হোসেন এবং কাদের সিদ্দিকীর মতো একসময়ের ডাকসাইটে আওয়ামী লীগ নেতারও এখন ধানের শীষে নির্বাচন করতে আপত্তি নেই।
একাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন ছোট ছোট দল একাধিক জোট গঠন করছিল। যেমন যুক্তফ্রন্ট, বাম গণতান্ত্রিক জোট, এরশাদের নেতৃত্বে ইসলামিক দল ইত্যাদি। কিন্তু এসব জোটের গুরুত্ব ম্লান হয়ে যায় বিএনপি-গণফোরাম, নাগরিক ঐক্য এবং রবের জেএসডির সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পরে। বস্তুত এই জোটেই যাওয়ার কথা ছিল বিকল্পধারারও। কিন্তু আসন বণ্টন ইস্যুতে তাদের সাথে বিএনপির সমঝোতা না হওয়া এবং জামায়াত ইস্যুতে টানাপড়েনের কারণে শেষ পর্যন্ত তারা জোটের বাইরে থাকে বলে ধারণা করা হয়। তখনই বিষয়টি আলোচনায় আসছিলো যে, যেহেতু এককভাবে বিকল্পধারার বড়জোর দুটি আসনের বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, সুতরাং তারা কি আরেকটু বার্গেইনিং করা তথা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সেই ক্ষমতার অংশীদার হতে অবশেষে নৌকার মিছিলে শামিল হবে? হয়েছেও তাই।
এই ঘটনা ঘটার আগ পর্যন্ত বিকল্পধারার প্রধান সাবেক বিএনপি নেতা বদরুদ্দোজা চৌধুরী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কড়া সমালোচনা করলেও তারা আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত হয়েছেন। ফলে রাজনীতিতে শেষ কথা এবং চিরন্তন শত্রু-মিত্র বলে যে কিছু নেই—মি. চৌধুরী এবং অন্যদিকে ড. কামাল, কাদের সিদ্দিকী ও মাহমুদুর রহমান মান্নারা সেটিই প্রমাণ করলেন। অর্থাৎ তারা প্রত্যেকেই তাদের আদর্শের বিপরীতে গিয়ে এখন সাবেক শত্রুদের সাথে মৈত্রীর বন্ধনে আব্দ্ধ হয়েছেন। এর দ্বারা আখেরে তারা কে কতুটুক লাভবান হবেন তা সময়ই বলে দেবে।
প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় এলে কি বি. চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করা হবে? সেই সম্ভাবনা শূন্য। কারণ তিনি বিএনপির আমলে শুধু রাষ্ট্রপতিই ছিলেন না বরং তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিবও। সুতরাং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বি. চৌধুরী ও তার দল কী পাবে তা এখনও অনিশ্চিত।
অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনে জয়ী হলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা আছে। যদি শেষমেষ খালেদা জিয়া, তারেক রহমান বা তাদের পরিবারের কেউ নির্বাচন করতে না পারেন, তাহলে কি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধানমন্ত্রী হবেন আর ড. কামাল হোসেন রাষ্ট্রপতি? এই প্রশ্নটি ১৬ নভেম্বর ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের জিজ্ঞেস করেছিলেন বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদকরাও। কিন্তু ঐক্যফ্রন্টের তরফে সুস্পষ্ট জবাব আসেনি। কারণ এখন পর্যন্ত এর কোনো সুস্পষ্ট জবাব তৈরি হয়নি।
তাছাড়া যদি বিএনপি ও তাদের জোট নির্বাচনে জয়ী হয়ও তারপরও খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে এনে কোনো একটি আসন থেকে উপনির্বাচনে জয়ী করে এনে প্রধানমন্ত্রী করা অত্যন্ত জটিল ও কঠিন। ফলে আগামী নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি ও তার জোট জয়ী হলেই যে তাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, বিষয়টা এমন নয়।
আলোচনার বাইরে রাখার সুযোগ নেই আরেক সম্ভাব্য তৃতীয় শক্তি জাতীয় পার্টিকেও। তারা এবারও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের অংশ হিসেবেই নির্বাচন করবে। কিন্তু যদি এবারও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে এবং বিএনপি ও তার জোট বিরোধী দলে বসে, তখন জাতীয় পার্টির অবস্থান কী হবে? গত ৫ বছর ধরে তারা একইসঙ্গে সরকারে ও বিরোধী দলে থেকে রাজনীতিতে ‘সরকারি বিরোধী দল’ নামে একটি নতুন টার্ম যুক্ত করেছে। কিন্তু এবার আওয়ামী লীগ ফের ক্ষমতায় এলে তারা তো আর বিরোধী দলেও থাকতে পারবে না। তখন এরশাদ ও তার দলের নেতাদের কী হবে? তাদেরকে কি দু তিনটি মন্ত্রীত্ব নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে?
আগামী সংসদ নির্বাচনে এই প্রশ্নগুলো খুব বড় করে আসবে বলেই মনে হয়। তবে সেই সাথে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে গিয়ে তৃতীয় কারো জনপ্রিয় হয়ে ওঠার একটি সম্ভাবনারও যে মৃত্যু হলো, সেটিই ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণের কী ভূমিকা রাখে, তা দেখার জন্য আমাদের অন্তত আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








