একজন নূরজাহান বেগম। এ পৃথিবীতে তিনি এসেছিলেন পিছিয়ে পড়া এবং আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগা নারীদের পথ দেখাতে।
আমার স্পষ্ট মনে আছে, ছোটবেলায় আমার মা প্রায় প্রতিদিনই একটি লালসাদা মলাটের বইয়ের মত পত্রিকা নিয়ে পড়তেন। সাপ্তাহিক হলেও আম্মাকে দেখতাম আরেকটি সংখ্যা না আসা পর্যন্ত পুরনো সংখ্যাটাই বারে বারে পড়তেন। পত্রিকাটির নাম ছিলো “বেগম” যেখানে প্রকাশিত হতো কেবল নারী বিষয়ক গল্প, কবিতা, ছড়া আরো কত কি! অতটা বোঝার মত বয়স হয়নি। সপ্তাহে একটি দিনের জন্য মা অপেক্ষা করতেন কখন হকার দিয়ে যাবেন বেগম পত্রিকাটি। আমার মা সংসার করা ১০০% গৃহিনী। আমাদের ছিলো যৌথ সংসার। মায়ের দায়িত্ব ছিলো শহরের বাসায় আমাদের ৫ ভাইবোন আর চাচাতো ভাইদের তদারকী করা। খুব বেশী পড়াশুনা করতে পারেননি মা। ছিলো জীবনে অনেক স্বপ্ন যার বেশীর ভাগই থেকেছে অপূর্ণ।
সারাক্ষণ সংসারের ঘানি টেনে, রান্নাবান্না শে্ষ করে ছেলেমেয়েদের খাইয়ে দাইয়ে নিজের জন্য যখন সময় পেতেন তখন বেলা যায় যায়। গোসল শেষে খোলা চুলে মা বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমাদেরকে পড়ে শোনাতেন নতুন কি গল্প ছেপেছে বেগম পত্রিকায়। সেই থেকে আমার কান অভ্যস্ত হলো গল্প শুনায়। ধীরে ধীরে একদিন নিজে আগ্রহ বোধ করলাম পত্রিকাটি পড়ে দেখার।
এভাবেই শুরু হলো আমার নিজস্ব ভাবনা চিন্তা করার জগতে প্রবেশ। মাকে দেখেছি কি বুঁদ হয়ে তিনি শব্দ করে করে পড়তেন গল্পগুলি। থাকতো মহীয়সী নারীদের জীবন নিয়ে লেখা। দেখেছি কিভাবে একজন নূরজাহান বেগম মিশে গেছেন একজন সাধারণ আটপৌরে সংসারী নারীর জীবনে। কি ছিলো সেই বেগম পত্রিকায়? বুঝিনি তখন, কিন্তু এখন যখন ভেবে দেখি তখন বুঝতে পারি, গল্পের সেইসব নারী চরিত্রের মাঝে আমার মায়ের মত হাজারো নারী নিজেকে দেখতে চাইতেন।
আজ আমাদের সামনে হাজারো দুয়ার খোলা। চাইলেই খুঁজে পাই আমার আকাংখিত কোন বই। সেই যুগে কিছুই অত সুলভ ছিলো না। নারীর জন্য একটি পত্রিকা সেতো অকল্পনীয়। এই আধুনিক যুগেই যখন আমরা নারীরা নিগ্রহের শিকার তখন কেবলই ভাবি একজন নূরজাহান বেগম কতটা সাহসী হলে এই বিনিয়োগে নিজেকে নিবেদন করেছিলেন।
আজকে আমি বা আমার মতো আরো অনেকে যা, তার এবং তাদের হাতেখড়ি এই বেগম পত্রিকা। যতটুকুই ভাবতে পারি তার পেছনে অবদান একজন নূরজাহান বেগমের। আজকে যখন আমরা এক দুর্যোগময় সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি ঠিক তখনই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।
জানি না তার স্থান কিভাবে পূরণ হবে, হয়তো হবে হয়তো হবে না। তবে তিনি নারীদেরকে যেভাবে আত্মপরিচয়ে পরিচিত হতে শিখিয়ে গেছেন সেভাবে আর কেউ সাহস করবে কিনা জানি না।
আমরা আজো কিন্তু নারীদের তার যোগ্যতম স্থানটি দিতে পারছি না। আধুনিক সাহিত্যে অনেক লেখকের জন্ম। আজ আমাদের সমাজে অনেক নারী সাংবাদিকও আছেন, কিন্তু কয়জন আছেন যারা সাংবাদিক পদে চাকরীর বাইরে নিজেকে প্রকৃত সাংবাদিক পরিচয়ে জন্ম দিতে পেরেছেন? আছে কি এমন কোন পত্রিকা যা আজো ঘরে ঘরে আমাদের সাধারণ মা বোনদেরকে দুপুরের আলস্য সময়ে তার সন্তানদের পড়ে শোনাতে বাধ্য করে? এত হাজারো পত্রিকা, চ্যানেলের ভিড়ে একটাও কি বেগম আছে যা আমার মত, আমাদের মত সদ্য পড়তে শিখা আরেকটি প্রজন্ম তৈরীকরবে? আমরা চাই এমন সংবাদপত্র আসুক যা প্রতিটি ঘরে ঘরে নারীদেরকে দেবে শত না পাওয়ার প্রলেপ। দেবে সামনে এগিয়ে যাবার প্রেরণা। দেশ পাবে একটি শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান প্রজন্ম।
হে মাতা হে বিদূষী হে লড়াকু নূরজাহান বেগম তুমি ফিরে এসো আমার মায়ের মাঝে, বোনের মাঝে, সন্তানের মাঝে যুগে যুগে বারে বারে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







