প্রধানমন্ত্রী আমাদের নরম মনের, একজন মমতাময়ী মানুষ। মাঝে মাঝে ফেসবুকে তার ছবিগুলি দেখি আহা, রাতদিন কাজ করেন দেশের জন্য, নিজের জন্য নেই একফোঁটা বিশ্রাম নেবার সময়। কিন্তু এরমাঝে সময় বের করেন, উঁহু নিজের জন্য নয়, বের করেন পরিবারের জন্য, সন্তানের জন্য, নাতি-নাতনিদের জন্য। কখনো দেখি, বাচ্চাদের সাথে ব্যাডমিন্টন খেলছেন, কখনো তাদের চুল বেঁধে দিচ্ছেন, কখনো দেখি তাদের সাথে পার্কে সময় কাটাচ্ছেন। কখনো আঁচল কোমরে গুঁজে রান্না করেন ছেলের প্রিয় খাবার, রাঁধেন নাতিদের পছন্দের মেনু। কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব শুনেছি সৌভাগ্যক্রমে স্বাদ পেয়েছেন এই মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রীর হাতের রান্না। আহা দু চামচ যদি পেতাম!
শতকরা ৯৯.৯ ভাগ মায়েরা মমতাময়ী হন সন্দেহ নেই। ভালবাসা, বাৎসল্য, মায়ায় পরিপূর্ণ মায়েরা সন্তানের জন্য পারেন না হেন কাজ নেই ভব সংসারে। সন্তানের প্রতি ভালবাসায় অনেক অন্যায় তারা মুখ বুজে সয়ে যান। আবার অসম্ভবকে সম্ভব করেন। নিজে অভুক্ত থেকে সন্তানের মুখে তুলে দেয়া তো ডালভাত, নিজে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে সন্তানের জন্য লাখ টাকার স্বপ্ন দেখেন তারা। অভাব অনটনে জীবন কাটালেও সন্তানের জন্য বা ভালবাসার মানুষদের জন্য আরাম আয়েশের ব্যবস্থা করেন। পরিবারের সবার জন্য নিজের সব কিছু উজার করে দেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নিজে দুর্নীতি না করলেও পুত্রের দুর্নীতিতে মুখ বুজে থেকেছেন, দেখেও দেখেননি। বখে যাওয়া পিতাহীন সন্তানকে বাৎসল্য দিয়ে গেছেন। তার সব অন্যায় আড়াল করে প্রশয়দায়ী মায়ের কাজ পালন করলেও একজন আদর্শ মায়ের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। সেই সাথে ব্যর্থ হয়েছেন পরিবারের মতো দলের সদস্যদের দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতে। সরকার তথা পরিবারের প্রধান হিসেবে হয়েছেন ব্যর্থ।
তার সরকার, দল, পরিবার ও সন্তানকে সুপথে রাখতে না পারার ফল আজ নির্জন কারাবাস। দুষ্টুলোকে বলে শেখ হাসিনা তাকে শাস্তি দিতেই জেলে পাঠিয়েছে, তাই যদি হবে তাহলে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাড়তি সেবা ও সঙ্গ দেয়ার জন্য তার ব্যক্তিগত পরিচারিকাকে কারাগারে থাকার সুযোগ করে দিত না। এখানেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মমতা ও সহানুভূতির পরিচয় মেলে, কারণ খালেদা জিয়া তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। তারপরেরও তার সুবিধা অসুবিধার দিকে লক্ষ্য রেখেছেন। আহা একেই বলে মানবতা।
শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী তরতর করে এগিয়ে চলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সাফল্যর মধ্যে কৃষি, কূটনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতি। এছাড়াও বিশ্বমন্দার মাঝেও গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে সম্মানজনক স্থান অর্জন করেছে। বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আনার ক্ষেত্রে অতীত দিনের রেকর্ড ভেঙেছে। জনশক্তি রপ্তানিতেও প্রশংসা অর্জন করেছে সরকার। অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে তার সরকার। বলা যায় অর্থনীতিতে উন্নয়নের জোয়ার বয়ে চলেছে। একদল নচ্ছর বিশেষজ্ঞ বলছে, তার শাসনামলে দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ চলে যাচ্ছে দেশ থেকে। এসরকারের আমলে বাংলাদেশ ব্যাংকে মজুদ অর্থ হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ, আবার তার আমলেই রেকর্ড পরিমাণ রিজার্ভ অর্থ লুট হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। শেয়ার বাজার ধ্বস, ও ব্যাংক লুটের কথা বলতে গেলে আরব্য রজনীর মতো হয় হাজার রজনী পার হয়ে যাবে। ইস এই বিশেষজ্ঞগুলোর কি কাজ নেই খালি পিছনে লাগে।
প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তির টাকা এখন তাদের মায়েদের মোবাইল ফোনে যাচ্ছে। এক কোটি ৩০ লাখ মা এভাবে টাকা পাচ্ছে। তবে টাকা পাঠানো শুরু করার আগে জানা যায় ২০ লাখ মায়ের কোন মোবাইল নেই। কারণ দরিদ্র্য এই মায়েদের ফোন কেনার সামর্থ্য ছিল না, আমাদের মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রী বিষয়টা জানতে পেরে তাদের ২০ লাখ মোবাইল সেট কিনে দিয়েছেন পুরো ব্যাপারটা নাকি গোপনে ঘটছে! ইস কি করে যে সাংবাদিকগুলা জেনে যায়, নাকি ৩২ ধারায় পরবে তারা! মমতাময়ী না হলে কি এতো ফোন দিতেন কিনে!!
দুষ্টু এই বিশেষজ্ঞরা খুজে খালি খুঁত বের করে আমাদের মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রীর। তারা বলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ব্যর্থতাও অনেক, তার মধ্যে রয়েছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দলীয় কর্মীদের টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস, সরকারের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ইত্যাদি। দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো তাদের ব্যর্থতার পাল্লা ভারি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মহাজোট সরকারের আরেকটি বড় ব্যর্থতা হচ্ছে দেশব্যাপী ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নামধারী কিছু দুর্বৃত্তের বেপরোয়া দুর্বৃত্তপনা। চার বছর ধরেই এদের কারণে সরকারকে বারবার বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল ক্ষমতায় গেলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা; কিন্তু তা হয়নি। সেই সাথে রাজধানীর অসহনীয় যানজট নিরসনে ব্যর্থতার উল্লেখ করতে ভোলেনি তারা। কি কাণ্ড এই বিশ্লেষকদের কি কোন কাজ নেই রাতদিন বর্তমান সরকারের খুঁত খুজে বেড়াচ্ছে।
শিক্ষা ব্যাপারে কি কথা বলবে এই রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা, পরীক্ষায় নকল, প্রশ্ন ফাঁস, বই বিতরণে অনিয়ম- সব কিছুই জেঁকে বসেছিল শিক্ষা খাতে। তো কি হয়েছে! আমাদের প্রধানমন্ত্রী তো বলেই দিয়েছেন প্রশ্নপত্র ফাঁস যুগে যুগে চলে আসছে, তার মন্ত্রী, এমপি, সচিব কি ফাঁস করছে নাকি? যারা করছে তাদের ধরে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। পুলিশ গোয়েন্দা আর সব নিরাপত্তা বাহিনী বসে বসে আঙ্গুল চুষবে আর সাংবাদিকরা সংবাদ পরিবেশনের বদলে সমাজে কারা অন্যায় করছে তাদের খুজে বের করবে। ঠিক ঠিক প্রধানমন্ত্রী ঠিক হিরক রাজার দেশে দেখেননি, সেখানে বলে ‘যায় যদি যাক প্রাণ, হীরকের রাজা ভগবান’, ‘লেখাপড়া করে যে, অনাহারে মরে সে’ ভাবুন কতটা ভাবে সে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে তো আর ছেলে মেয়েদের কষ্ট করে পড়তে হবেনা। ফাঁসকৃত প্রশ্ন নিয়ে লেখাপড়া ছাড়া পরীক্ষা দিয়ে পাস করে যাবে।
দল ত পরিবারই, হাজারও সদস্য নিয়ে বিশাল পরিবার, তার প্রধান হয়ে পরিবারের সদস্যদের মানে মন্ত্রী, এমপি, সচিব, নেতা, দলের অন্তর্ভুক্ত পেশাজীবী সবার প্রতি মমতা দেখান, মমতার কারণে তাদের করা অন্যায়গুলি উপেক্ষা করেন। ছোট ভাইয়ের মতো শামীম ওসমানের মতো প্রমানিত সমস্যা সৃষ্টিকারীকে আগলে রাখেন। দলের মন্ত্রীদের ব্যর্থতাকে উপেক্ষা করে তাদের পাশে থাকেন। শিক্ষা নিয়ে বা মাতামাতি করার কি আছে উনাদের সন্তান বা দলের মন্ত্রী, নেতা, দলবাজ ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের সন্তান ও নাতিপুতিরা তো এদেশের শিক্ষা নেয় না, নেয় তারা বিদেশের উন্নত শিক্ষা। ফলে দেশের আম শিক্ষার্থীরা যথাযথ শিক্ষিত না হলে কিছু আসে যায় না। তাহলে কাদের জন্য এতো কষ্ট করবেন তিনি। মমতায় ছেয়ে আছেন তার নিজের পরিবার তথা দলের জন্য, তার ভালবাসার ছাপ সময়ে সময়ে দিয়ে যান তিনি। কজন দলের জন্য অকাতরে নিজের ইমেজ বিলিয়ে দলকে ভালবাসেন। মমতাময়ী বলেই নিজের ইমেজের তোয়াক্কা করেন না। সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেন। খেয়াল করেন না তেলের ডিব্বা নিয়ে দলবাজ পেশাজীবীরা নিজ নিজ পেশা বাদ দিয়ে রাজনীতির মাঠে চরে বেড়ায়। দলের সবার খুশিতে উনি খুশি, দলের আনন্দে আনন্দিত তিনি। দেশবাসী খুশি কিনা তা ভাবচ্য নহে। কারণ দেশের মানুষের ভোটের প্রয়োজন দিন দিন কমে এসেছে। কিছুদিন পর হয়ত নাই হয়ে যাবে এই আম-জনতার ভোট। কত মায়াময়ী! হয়ত কষ্ট করে আর ভোট কেন্দ্রে যেতেই হবে না জনগণকে।
দুষ্টু কিছু মানুষ বলেই চলেছে, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে নেই আইনের প্রয়োগ। পথে, ঘাটে, ঘরে অফিসে নারীর নেই নিরাপত্তা, নেই মমতার ছায়া। পাহাড়ি জনগণের পাশে নেই কোন মমতার হাত। সড়ক দুর্ঘটনায় বেড়ে চলেছে স্বজনের কান্না, সে কান্নায় বিচলিত নয় কেউ। সংখ্যালঘুর উপর অত্যাচারে প্রতিবাদী নয় কোন মমতাময়ীর ধমক, আছে শুধু নিরবে দেশত্যাগের গল্প। আছে সুন্দরবনের কান্না, আছে বঞ্চিত মানুষের ক্ষোভ, আছে নিরাপরাধীর আইনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হবার করুণ সুর, তনুদের কান্না। আছে দুর্নীতি ও লুটপাটের দাপট, আছে চাঁদাবাজির কালোহাত, আছে প্রতিবাদীর প্রতি হুমকি ধামকি। আছে আশাবাদী মানুষের দীর্ঘ থেকে দীর্ঘশ্বাস। এতো কিছুর পর তবুও আশা দলমত নির্বিশেষে সবাই পাবে মমতার ছায়া, সেই সুশীতল ছায়ায় আমাদের জীবন হবে স্বস্তির।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








