যে কারিগর বহুদিন ধরে তাঁত বোনেন, তার উপলব্ধির মধ্যে ঢুকে পড়ে বস্ত্রশিল্প। তিনি বুঝে যান বসনভুষণের গভীর রহস্য। জেনে যান বয়ন শিল্পীর জীবন। তার জানা বোঝা শাস্ত্রীয় জ্ঞানাভিমানীকে ধাক্কা দিয়ে দেয়। দুমড়ে মুচড়ে যায় প্রচলিত অনেক চিন্তা। উড়ে যায় অনেক কিছু। আবার সঠিক আসনে জায়গা পান লুপ্তসুপ্ত যথার্থ দাবিদার।

শিশু সাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম বাংলা শিশু সাহিত্যের দীর্ঘ প্রায় সত্তর বছরের যাত্রাপথের মূল্যায়ণ করেছেন দুই খণ্ডের ঢাউশ গ্রন্থের ভেতর দিয়ে। প্রথম খণ্ডটি প্রকাশিত হয় গত বইমেলায়। নাম ছিল ‘শিশু সাহিত্যের আলো ছায়া’। এবার বেরুলো দ্বিতীয় খণ্ড ‘শিশু সাহিত্যের চেনা অচেনা‘ নামে। প্রকাশ করেছে সপ্তডিঙা প্রকাশনী।
আমি আমীরুল ইসলামকে যতটুকু জানি, তিনি যে কথা বলেন, সে কথা লেখেন না। তার মুখের কথা হচ্ছে, লেখার উচ্ছিষ্টাংশ। তার মানে তার যত কথা, সবই তিনি লিখে ফেলেন, সরল সত্যে, গভীর মনোনিবেশ দিয়ে। আর যে কথা বলেন, সেকথা হচ্ছে গুড় তৈরির সময় যে গাদ ফেলে দেয়া হয়, ঠিক তা। বিশ্ব সাহিত্যের বড় বড় মনিষী তার ভালোবাসার ‘গালি’ খেয়ে যান। সেসব ঢাকাইয়া আদিরস মেশানো গালি এখানে উচ্চারণ করতে পারবো না। তবে বুঝি তার গালির আওতায় যা আসে তা, সেই রকম শাণিত জিনিস।
শিশু সাহিত্যের ভেতরে দিয়ে জীবনের পঞ্চাশ বছরের যাত্রাপথ লিখেছেন আমীরুল ইসলাম। তিনি এবার বুঝিয়ে দিয়েছেন, শিশু সাহিত্যের বাজনা বাংলা সাহিত্যে বাজিয়েছেন অনেকেই, কিন্তু সবার বাজনা সত্যিকারে বাজেনি। খোলতাই হয়নি। দায় পূরণ হয়নি। তার বিবেচনার ছুরিতে সত্যজিৎ থেকে শুরু করে সুনীল, শীর্ষেন্দু পর্যন্ত কাটা পড়ে গেছেন। বলে গেছেন অনর্গল। প্রাণের ভেতর থেকে উৎসারিত শিশু সাহিত্য প্রেমের গভীর ভাষায়। তার এই সাহস অর্জিত। তার এই সাহস মার্জিতও। পাঠক হিসেবে এক টানের মধ্যে পড়ে যেতে হয়। ঠিক যেমন আমীরুল ইসলামের গল্প, ছড়ার পাঠের ক্ষেত্রে ঘটে।
আমি করোনাকালের শুরুতে আমীরুল ইসলামকে দেখেছি শিশু সাহিত্যের আলোছায়া নিয়ে মগ্ন হতে। টানা করোনায় লেখনিটাই ছিল তার গভীর অধ্যায়ণ। শিশুসাহিত্যের ঘোর দিয়েই একটি বেষ্টনী তৈরি করেছিলেন। তার মধ্যে কোভিড-১৯ জীবানু পর্যন্ত ঢুকতে পারেনি। লিখে গেছেন বিরামহীন।
একে একে বহু পঠিত বিষয়। পর্যবেক্ষণের বিষয়। শিশু সাহিত্য নিয়ে আশার জায়গাগুলো। হতাশার জায়গাগুলো। তিনি তার স্বভাবসুলভ যত গালি দিয়েছেন পুরোনোদের, প্রতিষ্ঠিতদের একইভাবে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে স্বপ্ন দেখেছেন তার সমসাময়িক ও নতুনদের ভেতর থেকে। এখানেও তিনি সবার থেকে আলাদা। সবাই যখন বর্তমানের ভেতর নৈরাশ্য খুঁজে পান, তিনি তখন আশা ছাড়া আর কিছুই দেখতে চান না।
শিশু সাহিত্য নিয়ে জীবনের এতদূর আমীরুল ইসলাম। অনেক আগে থেকেই দায় অনুভব করেছেন নিজের পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ণ করে যাওয়ার। লিখতে গিয়ে নেমে গেছেন শিশু সাহিত্যের সমুদ্রে। নিজেই বিষয় নির্বাচন করেছেন, আর বিষয়টিকে ফুটিয়ে তুলেছেন উদাহরণ, অভিজ্ঞতা আর উপলব্ধির ভেতর দিয়ে। এর ভেতর দিয়েই তিনি বাল্যকালে ফিরে গেছেন, কৈশোরের পাঠের আনন্দ, তারুণ্যের লেখালেখির গতিপথ আর এখনকার চোখ দিয়ে ফিরে দেখা, এই সবকিছুর একটি বহুমাত্রিক পাঠ প্রস্তুত করেছেন শিশু সাহিত্যের সুন্দর এক আগামী বিনির্মাণের সুপারিশ তৈরির জন্য। তিনি এমন সব বিষয় এনেছেন, যা শিশু সাহিত্যের কোনো গবেষণায় এর আগে স্থান পায়নি।
তার সমালোচনার ধরণটিও ভিন্ন। যেসব বইয়ের মুগ্ধ পাঠক ছিলেন সেসব বইয়ের রসের জায়গাগুলো তিনি যেভাবে খুঁজে পেয়েছেন, তা অন্যদের জন্য আবার পাঠের প্রয়োজনীয়তা দাঁড় করিয়ে দেয়। শিশু সাহিত্যের চেনা অচেনায় এবার আমীরুল ইসলাম সূচি সাজিয়েছেন পর্যায়ক্রমে এভাবে: প্রথমে শিশু সাহিত্য ভাবনা নিয়ে ৭১টি গদ্য, তারপরে ‘প্রিয় বই’ বিষয়ে ২৯টি গদ্য, ‘প্রীতিময় স্মৃতি লেখা’ বিষয়ে ৪৮টি গদ্য, সর্বশেষ ‘বই আলোচনা’য় ৪১টি গদ্য। প্রতিটি গদ্য গল্পের মতো স্বাদু। প্রতিটির মধ্যে তথ্য আছে, তত্ত্ব আছে, আছে শিশু সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসার অমূল্য বয়ান।








