চট্টগ্রাম থেকে: তামিম ইকবালের ব্যাটিংয়ের ধরনের সঙ্গে অনেক মিল মাহির হামজা মাহমুদের। বিশেষ করে কাভার ড্রাইভ, অফড্রাইভ, অনড্রাইভে। ইস্পাহানী ক্রিকেট একাডেমির সহকারী কোচ মশহুরুল হক প্রিন্স তাই খুদে এই ছাত্রের প্রতি বিশেষভাবে যত্নবান। তামিমের পর চট্টগ্রাম থেকে জাতীয় দলে জায়গা করে নিতে পারেনি আর কেউ। লক্ষ্য তাই, আরেকটা তামিম যদি তৈরি করা যায়!
তামিমের মতোই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান মাহির। এই ক্রিকেটারের ইচ্ছা তামিমের মতোই ব্যাট করার। পছন্দের ক্রিকেটারদের মধ্যে আরেকজন আছেন, সাকিব আল হাসান। মাহির স্বপ্ন দেখে জাতীয় দলে খেলার, তামিম-সাকিবের মতো বিশ্বমানের হওয়ার।
চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়াসংস্থার অনূর্ধ্ব-১৪ দলের বাছাইয়ে মাহির টিকেছে ১০ বছর বয়সেই। পড়াশুনা করছে পঞ্চম শ্রেণিতে। কোচ প্রিন্সের বিশ্বাস একদিন জাতীয় দলে খেলবে মাহির, ‘চার বছর ধরে ওকে গড়ছি। ৬ বছর বয়স থেকে আমাদের এখানে অনুশীলন করছে। টেকনিক খুব ভাল। প্রতিভা আছে। ওকে নিয়ে আমাদের স্বপ্ন অনেক। এখান থেকে একজনও যদি জাতীয় দলে খেলতে পারে।’
এমএ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেশিয়াম মাঠে বুধ থেকে শনিবার, সপ্তাহে চারদিন খুদে, কিশোর ও তরুণ ক্রিকেটারদের হাট বসে। ইস্পাহানী ক্রিকেট একাডেমিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণার্থী প্রায় ২০০ জন। কাগজে-কলমে সংখ্যাটা আরও বেশি। এখানকার মাঠে অনুশীলন করে জুনিয়র ক্রিকেট একাডেমির প্রশিক্ষণার্থীরাও।

ওদের ছুটির দিন যাওয়ায় সবার দেখা মেলেনি। একাডেমি কোচিংয়ের পাশাপাশি বাকি তিনদিন পাশের টেনিস কোর্টে নিজ উদ্যোগে অনুশীলন করান কোচ প্রিন্স। সেখানেই তার অধীনে অনুশীলন করতে দেখা গেল মাহিরকে। কোচের শেখানো কৌশলে ব্যাট চালিয়ে গেল মাহির, যে লাইনের বল যেদিকে খেলার কৌশলটা রপ্ত করার চেষ্টা চলল।
এমন আরও প্রতিভা রয়েছে বন্দরনগরীর এই দুটি একাডেমিতে। ইস্পাহানী ক্রিকেট একাডেমির পরিচালক জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার নুরুল আবেদিন নোবেল। আরেকটা পরিচয় আছে তার, সাবেক অধিনায়ক মিনহাজুল আবেদিন নান্নুর বড় ভাই। নোবেল মনে করেন, চট্টগ্রামের হারানো ঐতিহ্য মাহিররাই ফিরিয়ে আনবে একদিন।
প্রতিভা থাকলেও মাঠ সংকটে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে চট্টগ্রামের ক্রিকেটাঙ্গন। ক্রিকেটচর্চার প্রাণ এমএ আজিজ স্টেডিয়ামের আউটার মাঠের বেহালদশা। মাঠের দুই পাশে সারিসারি ট্রাক, মাঝে ইট-বালু-পাথরের স্তূপ। কিছু স্থানে গর্ত, তাতে জমে আছে ময়লা পানি। আবর্জনার স্তূপ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে। দুর্গন্ধে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। নর্দমায় রূপ নিয়েছে সবার প্রিয় মাঠটি। তদারকির অভাব ও স্থাপনা গড়ে তোলায় চট্টগ্রামের অনেক খেলার মাঠই হারিয়ে গেছে।

প্রিমিয়ার লিগ হয়নি গত বছর। এসব সমস্যা সমাধান করা না গেলে যতটুকু টিকে আছে সেটিও হারিয়ে যাবে বলে মনে করছেন নোবেল, ‘এগুলো সমাধান না করা গেলে ক্রিকেটার তুলে আনা সম্ভব নয়। আমরা ও আমাদের পরের ক্রিকেটাররা ব্যক্তি উদ্যোগে চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু মাঠ সংকটে আমাদের কার্যক্রম চালাতে পারছি না। এমএ আজিজ স্টেডিয়ামের আউটার মাঠ এখন ট্রাক স্ট্যান্ডে পরিণত হচ্ছে। জেলা ক্রীড়া সংস্থা যদি উদ্যোগ না নেয়, আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যায়। আউটার স্টেডিয়ামে আমরা নিজ খরচে নেট প্র্যাকটিসের ব্যবস্থা করেছি তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য। কিন্তু মাঠের যে অবস্থা, তাতে সেখানে আর অনুশীলন সম্ভব নয়।’
চট্টগ্রামের ক্রিকেটারদের মধ্যে আকরাম খান অনেক বড় নাম। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও বিসিবি এই পরিচালক মাঠে নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনকে বললেন, ‘চট্টগ্রামে এখন খেলার মাঠ নেই। একজন খেলোয়াড়ের মূল ব্যাপার হল ফিটনেস। ছোটবেলায় কেউ মাঠে যাবে, দৌড়াদৌড়ি করবে, সব ধরনের খেলা খেলবে, শিখবে। তারপর এক সময় সে যে খেলায় ভালো সেটা নিয়ে থাকবে। কিন্তু মাঠের অভাবে ছেলেমেয়েরা ঘরে বসে কম্পিউটার চালাচ্ছে, গেম খেলছে। আমরা যে মাঠে খেলে ক্রিকেট শিখেছি, সেই মাঠটিও এখন নেই। সবার সদিচ্ছা ছাড়া সম্ভব হবে না ক্রিকেট বা অন্য খেলাধুলাগুলো বাঁচিয়ে রাখা।’
চট্টগ্রামের কৃতি ক্রিকেটার নুরুল আবেদীন নোবেল, শহীদুর রহমান, মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, আকরাম খানরা একসময় মাঠ কাঁপিয়ে বেড়িয়েছেন। নোবেল-নান্নু-আকরামদের পর এসেছেন এহসানুল হক, তারেক আজিজ, নাফিস ইকবাল, আফতাব আহমেদ, তামিম ইকবালদের মতো প্রতিভা। এখন আর চট্টগ্রামের নাম উজ্জ্বল করার মতো খেলোয়াড় নেই পাইপলাইনে। বলার মতো দুটি নাম- ইরফান শুক্কুর ও ইয়াসির আলি চৌধুরী। তারা আছেন বিসিবির হাই-পারফরম্যান্স স্কোয়াডে।
চট্টগ্রামের দুর্দশা কাটাতে আফতাব আহমেদও করেছেন একটি একাডেমি। সাগরিকায় মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স মাঠে শতাধিক খুদে ক্রিকেটারকে নিয়ে চলে সাবেক এই ক্রিকেটারের কার্যক্রম। ব্যক্তিগত উদ্যোগে মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স মাঠে এবং নাসিরাবাদ বয়েজ স্কুল মাঠে একটি করে উইকেট তৈরি করেছেন। আনিয়েছেন একটি বোলিং মেশিনও।
বিস্তারিত ভিডিওতে:







