ছিদনি ওঁরাও, অনুকূল ওঁরাও, বিরবল ওঁরাও, মুগিয়া ওঁরাও সবাই এখন একতাবদ্ধ। নিজেদের দাবি-দাওয়া আদায়ে তারা এখন ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা নেয় যাতে করে বজ্রকন্ঠে আওয়াজ তুলতে পারে। নিজেদের দাবির স্বপক্ষে শুধু যুক্তি নয় শক্তিও দেখাতে পারে। তারা এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী নিজেদের একতার শক্তিতে।
ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সেখানে সালিশ বসেছিল। মধ্যবয়সী একজন ওঁরাও নারীর উপর শারিরীক নির্যাতন চালানোর প্রচেষ্টাকারীর বিচারের দাবিতে। অআদিবাসী একজন দুর্বৃত্ত ঐ নারীর পথরোধ করেছিল সুযোগ বুঝে। সেই নারী তার নিকটবর্তী বাজার থেকে ফেরার পথে এমন আচরণে চিৎকার দিলে এলাকার মানুষজন এগিয়ে আসে এবং সে রক্ষা পায়। পরবর্তীতে এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে সমস্ত আদিবাসী পরিবারগুলো একতাবদ্ধ হয়। তারা ঘোষণা দেয়-দুস্কৃতিকারীর বিচার না হওয়া পর্যন্ত তারা কাজে যোগ দেবে না। তারা নালিশ জানায় স্থানীয় চেয়ারম্যান এবং সংসদ সদস্যের কাছেও। পরে স্থানীয় চেয়ারম্যান শিবনাথ মিশ্র শিবু এসে তাদের দাবি পূরণ করলে তারা কাজে যোগদান করে। তাদের অভিজ্ঞতা বলে-তারা আগে এভাবে ঐক্যবদ্ধ না থাকার কারণে অনেক নিগ্রহের শিকার হয়েছিল, যা এখন আর সম্ভব নয়।
নওগা জেলার মহাদেবপুর উপজেলার চেরাগপুর ইউনিয়নের ওঁরাও পাড়ায় বসবাসকারী ৮৪টি পরিবার সবাই জাতিতে ওঁরাও। তারা এখানে শত শত বছর ধরে বসবাস করে আসছে। কিন্তু আর দশটি সাধারণ গ্রামে যেভাবে উন্নয়ন হয়েছে এখানে তার ছোঁয়া সেভাবে লাগেনি। তারা মনে করে-আদিবাসী বলেই হয়তো তারা উন্নয়ন অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ২০১৫ সালে একটি স্থানীয় উন্নয়ন সংগঠন আরকো’র মাধ্যমে তারা সংগঠিত হয়। গঠন করে-উত্তর ওঁরাও পাড়া গ্রাম উন্নয়ন দল। এটি গঠন করার মাধ্যমে তাদের প্রাথমিক যাত্রা শুরু হলে তারা একে একে জানতে পারে তাদের অধিকার। তারা জানতে পারে সরকারের কাছে তাদের পাওনা কি কি। কোথায় কোন বিভাগে গেলে তারা সরকারি সেবাসমূহ পাবে। কিভাবে তারা সেগুলো আদায় করবে। কিভাবে তারা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে যাবে এবং দাবি-দাওয়া তুলে ধরবে। তারা সংগঠিত হওয়ার প্রথম দিন থেকে নিয়মিত সভা পরিচালনা করে উক্ত সকল বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে পারে। তারা এখন অনেক বেশি সচেতন বিশেষ করে তাদের অধিকারের বিষয়ে। 
তারা সম্মিলিতি প্রচেষ্টায় বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে পানির সংযোগ নিয়েছে। ফলে সারাবছর পরিবারগুলো সুপেয় পানি পায়। তাদের পানিবাহিত রোগ-বালাই যেমন কমেছে তেমনি তাদের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতাও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। তারা সরকারি উপবৃত্তির আওতায় তাদের সন্তানদের নিয়েছে। ঐ গ্রামের ১০০টি স্কুলগামী শিক্ষার্থীর সবাই বিদ্যালয়ে যায়। সেখানে এখন ২৪ জন শিক্ষার্থী আছে যারা এসএসসি’র পরও উচ্চ শিক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে।
তারা জানে-বাল্যবিবাহের ক্ষতি এবং এ সংক্রান্ত আইন-কানুন। ২০১৫ সালের পর সেখানে আর কোনো বাল্যবিবাহ সংঘটিত হয়নি। তারা বলছে-যদি সবাই সচেতন থাকি তাহলে আর একটি বাল্যবিবাহের ঘটনাও এই গ্রামে ঘটবে না। তারা সম্মিলিত প্রচেষ্টা নিয়েছে-মাদকের অপব্যবহার রোধেও। অতিরিক্ত মদ্যপান এবং সনাতনী কালচারের দোহাই দিয়ে মাদকের ব্যবহার এখন এখানে অনেক কম। তারা বিশ্বাস করে-সচেতনতা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা যে কোনো দূরহ কাজকেও সহজ করে দেয়। তারা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিভিন্ন স্কিমে নিজেদের নাম অন্তর্ভূক্ত করছে। তারা এখন সম্মিলিতভাবে উপস্থিত হয়ে নিজেদের অন্তর্ভূক্তির বিষয়ে কথা বলে।
নারী-পুরুষ সবাই মিলে শুধু আর্থিক উন্নয়ন নয় বরং একটি সার্বিক উন্নয়ন প্রচেষ্টা চালিয়ে নেবার এই অধিকারভিত্তিক এ্যাপ্রোচ এখন ওড়াও গ্রামে প্রতিদিন নতুন নতুন সফলতা নিয়ে আসছে। তারা সবাই মিলে ভালো থাকতে চায়, তারা একটি অধিকারভিত্তিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য লড়ছে। তাদের এই প্রচেষ্টা সবার জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকুক।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







