শহীদ মিনারে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে শিক্ষার্থী নিপীড়ন ও শিক্ষক লাঞ্ছনার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষকবৃন্দ’।
মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি)- তে তারা এ সংবাদ সম্মেলন করেন।
এসময় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. ফাহমিদুল হক, সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক খান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান প্রমুখ।
লিখিত বক্তব্যে সামিনা লুৎফা বলেন, খুব সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে সরকারি শিক্ষার্থী-সংগঠনের নেতৃত্বে রাষ্ট্রশক্তি সাধারণ শিক্ষার্থী নিপীড়নে যতই বেপরোয়া আর দুর্নিবার হয়ে উঠছে, তারা ততই বিতর্কিত আর সমালোচিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোয় রাষ্ট্রশক্তির পক্ষে মাস্তানতান্ত্রিক কাঠামোর বিকাশ নিশ্চিত হয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে আবাসিক হলসহ ক্যাম্পাসগুলোতে সরবে বা নীরবে সহিংসতা চলছে। তারই পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ আমরা সময় সময় দেখি। যেমনটি আমরা দেখছি কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনের ক্ষেত্রে।
তিনি বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনে বিভিন্ন দল ও মতের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে, যার মধ্যে ক্ষমতাসীন সরকারের শিক্ষার্থী সংগঠনের উপস্থিতিও ছিলো। কিন্তু সম্পতি কোটা সংস্কারের জন্য প্রজ্ঞাপন দাবি করা হলে হঠাৎ করেই নানামুখী দমন প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে জামায়েতে সহিংস আক্রমণ, হাতুড়ি দিয়ে হাড় ভেঙে দেওয়া, আন্দোলনে অংশ নেয়া নারী কর্মীদের শারীরিকভাবে ও সাইবার পরিসরে যৌন নিপীড়ন, গ্রেফতার ও রিমান্ড রয়েছে। পাশাপাশি আন্দোলনে যুক্তদের ‘বামঘরানার শিবির’, তাদের কার্যক্রম ‘জঙ্গির মতো’, তারা আসলে ‘জামাত-শিবির’ ইত্যাদি অভিধায় ভূষিত করা হয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, যারা নিপীড়ক তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপই নেয়া হচ্ছেনা, কোনো বক্তব্যই দেয়া হচ্ছেনা, কেবল যারা নিপীড়িত, তাদের বিরুদ্ধেই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে, বক্তব্য প্রদান করা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দিক থেকে।
লিখিত বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, গত রবিবার শহীদ মিনারে সাধারণ শিক্ষার্থীরা গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি ও নিপীড়কদের বিচারের আওতায় আনার দাবিতে সমাবেশ করতে গেলে আমাদের কয়েকজন শিক্ষক তাতে সংহতি জানাতে যান। কিন্তু ছাত্রলীগের সদস্যরা সেই সমাবেশ পণ্ড করতে নানান অসভ্য উপায় গ্রহণ করে। তারা শিক্ষার্থীদের সমাবেশের কাছে এসে পাল্টা মাইক জুড়ে দিয়ে বক্তৃতা করে, শিক্ষকদের নিয়ে কটুক্তি করে ও কোনো যোগসূত্র ছাড়াই জামাত-শিবিরের আখ্যা দেয়, সমাবেশ ঘিরে হৈচৈ করতে থাকে, মিছিলে হামলা করে প্রায় ১০/১২ শিক্ষার্থীকে মারধর করে এবং কয়েকজন শিক্ষকের উপর চড়াও হয় ও লাঞ্ছনা করে। এরকম ন্যাক্কারজনক ঘটনা সাম্প্রতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খুব বিস্ময়কর না হলেও, শিক্ষক লাঞ্চনার বিষয়টি অত্যন্ত আপত্তিকর। এরকম পরিস্থিতিতে সেই সমাবেশ স্থলে প্রক্টরিয়াল বডির কেউ উপস্থিত ছিলেন না, পুলিশ বাহিনীর কেউ ছিলেন না; এভাবে নিপীড়নের জন্য একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেয়া হয়েছিল।নিপীড়নের অনেক পরে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা আসেন, তাও ঘটনাস্থলের শিক্ষরা আসার পর। প্রক্টরও পুরো ঘটনার জন্য একরকম শিক্ষকদেরই দায়ী করেন। প্রেসকে বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তা ছাত্র বা শিক্ষক যেই হোক না কেন, ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ নিপীড়ক ছাত্রদের সঙ্গে এভাবে জড়িয়ে দেয়া তার এই বক্তব্য স্পর্ধামূলক এবং তার এই বক্তব্য নিয়ে আমরা অত্যন্ত বিক্ষুব্ধ।
এসময় তিনি চার দফা কর্মসূচি উপস্থাপন করেন। কর্মসূচিগুলো হলো: ১. আগামী বৃহস্পতিবার (১৯ জুলাই) সকাল ১১টায় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে শিক্ষকদের সংহতি সমাবেশ, ২. আগামী ২৩ জুলাই কলাভবনের সামনে বটতলায় নিপীড়নবিরোধী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ৩. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির কাছে মিক্ষক লাঞ্ছনার পরিপ্রেক্ষিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য অবিলম্বে পত্র প্রেরণ এবং ৪. বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্বতা রক্ষা, অ্যাকাডেমিক মান সমুন্নত রাখা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের কাছে সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিপীড়নবিরোধী শিক্ষকদের উদ্যোগে শিগগীরই স্মারকরিপি প্রদান।
ঢাবি প্রক্টরের পদত্যাগের দাবিতে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রব্বানির পদত্যাগের দাবিতে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে মিছিল নিয়ে উপাচার্যের কার্যালয়ে যান তারা। সেখানে তারা উপাচার্যকে স্মারকলিপি পড়ে শুনিয়ে প্রক্টরের পদত্যাগ এবং ১৪ জন ছাত্রলীগ নেতার নাম ও ছবি চিহ্নিত করে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের দাবি জানান।
নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে স্মারকলিপি পড়ে শোনান গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী আবু রায়হান খান। এতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ধ্বংস করে এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনে আটক ছাত্রদের মুক্তির দাবিতে লাগাতার প্রতিবাদের ধারাবাহিকতায় গত ১৫ জুলাই শহীদ মিনারে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করা হলে সেখানে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত ও ছাত্রছাত্রীদের ওপর হামলা চালায় চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা। বারবার হামলা ও নিপীড়নে অংশ নেওয়া এসব সন্ত্রাসীদের ছবি ও ফুটেজ গণমাধ্যমে আসলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা কাজ করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রক্টর ও প্রক্টরিয়াল টিমের অব্যাহত ব্যর্থতায় তাদের প্রতি আর বিন্দুমাত্র আস্থা রাখতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। তাই তারা অবিলম্বে প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি জানিয়েছেন।
ঢাবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান স্মারকলিপি গ্রহণ করে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটি এবং নিয়মনীতি অনুসরণ করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, শিক্ষার্থীরা এমন প্রশ্ন করলে উপাচার্য এ বিষয়ে কোনও জবাব না দিয়ে লাউঞ্জ থেকে বের হয়ে যান। এ সময় উপাচার্যের সাথে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. গোলাম রাব্বানি ও প্রো- উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ।








