কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদ এবং ঘটনায় জড়িতদের বিচারের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন অব্যাহত রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১০টি বিভাগের শিক্ষার্থীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বহিরাগত মুক্ত রাখতে উপাচার্যের নানা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
যেসব বিভাগে ক্লাস হচ্ছে না বলে শিক্ষার্থীরা চ্যানেল আই অনলাইনকে জানিয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে- সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ, যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগ; কলা অনুষদের বাংলা বিভাগ, আরবি সাহিত্য বিভাগ; আইন অনুষদভুক্ত আইন বিভাগ; জীববিজ্ঞান অনুষদভুক্ত অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ; ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদভুক্ত ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগ, মার্কেটিং বিভাগ, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ। এছাড়া কিছু কিছু বিভাগে ব্যাচ ভিত্তিক এবং ব্যক্তিগতভাবে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করা হচ্ছে বলেও চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান কয়েকজন শিক্ষার্থী।
সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ও কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী মশিউরকে আটকের প্রতিবাদে এবং তার মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ৫ জুলাই ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেয় বিভাগটির শিক্ষার্থীরা। ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের ছাত্র কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খানকে গ্রেফতার ও রিমান্ডে নেওয়ার প্রতিবাদে গত ৮ জুলাই মানববন্ধন থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বর্জন কর্মসূচি ঘোষণা করেন শিক্ষার্থীরা। আইন বিভাগের ছাত্র তারিকুলকে মারধর ও গ্রেফতারের প্রতিবাদে বিভাগের শিক্ষার্থীরা ৯ জুলাই বিভাগের সামনে মানববন্ধন করে ক্লাস বর্জন কর্মসূচির ঘোষণা দেয়।

সর্বশেষ মঙ্গলবার বেলা বারোটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে বাংলা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র মাসুদ রানার ওপর হামলার প্রতিবাদে বিভাগের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করে ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দেয়।
ক্লাস না হওয়া প্রসঙ্গে সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নেহাল করিম বলেন, শিক্ষার্থীরা ক্লাস না করলে আমরা কি করব? যখন ক্লাসের সময় তখন শিক্ষকরা এসে ছাত্র-ছাত্রীদের পাচ্ছেন না। এ বিষয়টির একটি সমাধান করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নিরাপত্তা চৌকি বসানো হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। তিনি বলেন, নিরাপত্তা চৌকিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মী দায়িত্ব পালন করবে।
মঙ্গলবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে উপাচার্য সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। এসময় তিনি কোটা আন্দোলনের মতো স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন কিছু অশুভ শক্তির অনুপ্রবেশের ফলে নষ্ট হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন। পাশাপাশি কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের তিনি জঙ্গি বলেননি, বরং তাদের কিছু কর্মকাণ্ড জঙ্গিবাদের কর্মকাণ্ডের সাথে মিলে যায় বলে মন্তব্য করেছেন বলে জানান।
উপাচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় বাজারঘাটের জায়গা নয়। এটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জায়গা। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপাদান এখানে সম্মিলন ঘটে। যেহেতু এটি গণতন্ত্রের সূতিকাগার এখানে সকল প্রকার কর্মসূচি পালিত হবে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিতর্ক, কবিতা, গানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে এ সকল কাজে এখানে সবাই আসবে। কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থীদের এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবারের সাধারণ জীবন বিঘ্নিত হয় এমন বহিরাগতদের অযথা অবস্থান এখানে কাম্য নয়।
আখাতারুজ্জামান বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে বলেন, আমরা দেখেছি, অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গাড়ি প্রবেশ করে। এটা বন্ধ করা হবে। আমরা সড়ক ব্যবস্থাপনা করব। যেমন ফুলার রোডে দ্রুত গতিতে মোটরসাইকেল চালানো রোধে সড়ক গতিরোধক বসিয়েছি। শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস তারা যেন নিরাপদ থাকে আমরা সেই চেষ্টা করব। নিরাপত্তা চৌকি মানে ক্যান্টনমেন্ট না, পুলিশ পোস্ট না, এখানে আমাদের সিকিউরিটি গার্ড থাকবে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লোকটি যাতে বসতে পারে সে ব্যবস্থা করা হবে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, কোটা আন্দোলন একটি স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ছিল। হাজার হাজার শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নিয়েছে। আমরা নৈতিক সমর্থন দিয়েছি। সময়ের আবর্তে বিভিন্ন অপশক্তি ও অশুভ শক্তি এতে ঢুকে পড়ল। এমন একটি অবস্থায় গেল যে এদের পরে গোপন জায়গা থেকে ভিডিও বার্তার মধ্য দিয়ে আন্দোলন করতে হলো। স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে দুষ্টচক্র নষ্ট করে ফেলল। কিছু অপশক্তি ও অশুভ শক্তির অনুপ্রবেশের ফলে ভালো একটি আন্দোলন নস্যাৎ হয়ে গেল।
নিরাপত্তা চৌকি স্থাপনের বিষয়ে তিনি বলেন, বহিরাগত ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আমরা শিগগিরই কিছু নিরাপত্তা চৌকি বসাব। যাতে ভ্রাম্যমাণ মানুষ অন্য কোনো গোষ্ঠী এখানে এসে হঠাৎ করে কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারে।

নিরাপত্তার নামে রক্ষণশীলতার বাঁধ তৈরি না করার দাবি ছাত্র ইউনিয়নের: নিরাপত্তার নামে রক্ষণশীলতার বাঁধ তৈরি না করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ। মঙ্গলবার সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি মোঃ ফয়েজ উল্লাহ এবং সাধারণ সম্পাদক রাজীব দাস যৌথ এক বিবৃতিতে এ দাবি জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, নিরাপত্তার নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে উপেক্ষা করে রক্ষণশীলতার বাঁধ তৈরি করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এসময় প্রভোস্ট কমিটির সভায় বহিরাগতদের বিনা অনুমতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কথিত পড়াশোনার পরিবেশ ও সাধারণ জীবনযাপনে বিঘ্ন ঘটিয়েছে- আমরা এমন অভিযোগের তীব্র নিন্দা জানাই।
ছাত্র ইউনিয়ন নেতারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্যই শিক্ষার্থীদের জন্য। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের অবস্থান নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যে বক্তব্য তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বর্তমান পরিস্থিতিতে তার ব্যর্থতা আড়াল করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামত উপেক্ষা করে তাদের উপর সিদ্ধান্ত জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। অবিলম্বে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের দমন না করে তাদের উপর হামলাকারীদের বিচারের আওতায় এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।








