ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) নির্বাচনে জাল ভোট, অনিয়ম এবং ভোট গ্রহণে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির অভিযোগ এনেছেন পরাজিত প্রার্থীরা। তাদের দাবি, নির্বাচন কমিশন ফলাফল ঘোষণা না করলেও কেউ কেউ ‘স্বঘোষিত বিজয়ী’ হিসেবে বিভিন্ন মিডিয়ায় খবর প্রকাশ করছেন। এমনকি এসব অভিযোগ এনে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করে পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানিয়ে তারা একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন।
এ সংক্রান্ত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন পিটিবিনিউজ ডটকমের প্রধান সম্পাদক আশীষ কুমার দে। পুনরায় ভোট গ্রহণের পক্ষে মত দিয়ে নিজের দেওয়া স্ট্যাটাসে তিনি বলেন: “শুরুতেই বলে রাখি, এই নির্বাচনে আমি কোনো প্রার্থী ছিলাম না। কোনো প্যানেলের পক্ষেও প্রচারণায় নামিনি। দক্ষতা, যোগ্যতা, কর্মকাণ্ড ও পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন পদে ভিন্ন ভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীদের ভোট দিয়েছি এবং ঘনিষ্ঠজনদের ভোট দিতে বলেছি। এছাড়া আমাদের বা আমার রাজনৈতিক মতাদর্শগত একজন সদস্য প্রার্থীর পক্ষে সরাসরি সক্রিয় প্রচারণায় ছিলাম এবং তিনি জয়লাভ করেছেন। এছাড়া বিজয়ী ও পরাজিত সকল প্রার্থীই আমাদের বা আমার সতীর্থ-সহকর্মী। সবার জন্যই আমার শুভ কামনা। তবুও সাংবাদিক সমাজের মর্যাদার কথা বিবেচনায় কিছু না লিখে পারছি না।
২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন-২০১৮ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংগঠনটির জন্মলগ্ন থেকে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চসংখ্যক প্রার্থীর অংশগ্রহণে তুমুল প্রতিদ্বন্ধিতাপূর্ণ এ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলাকালে দুপুরের দিকে পোলিং বুথে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভুয়া ভোটার সনাক্ত করে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি। কিন্তু তাদেরকে আটক না করে রহস্যজনক কারণে ছেড়ে দেয়া হয়।
এক.
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে- প্রকৃত সাংবাদিক-ভোটাররা ভোট দেয়ার জন্য ঘন্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে বিরক্ত হয়ে উঠলেও ভূয়া বা জাল ভোটাররা কিন্তু লাইনকে পাশ কাটিয়ে খুব সহজেই বুথে ঢোকার সুযোগ পেয়েছেন। সাংবাদিকরা জাতির বিবেক বলে পরিচিত এবং জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অনিয়ম-জাল ভোট প্রদানসহ সমাজ ও রাষ্ট্রের সব ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদ করে থাকেন। অথচ সেই সাংবাদিক সমাজের সর্ববৃহৎ সংগঠনের নির্বাচনে জাল ভোট প্রদান মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। তা-ও সে সব জাল ভোট প্রদানকারীকে সনাক্ত করে ছেড়ে দেয়া হলো!
দুই.
এসব নানা অনিয়মসহ ভোট গণনা শুরুর আগেই বিজয়ী হওয়ার বিষয়ে কয়েকজন প্রার্থীর অতি জোরালো মনোবল ও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করার কারণে ভোট গণনা চলাকালেই বেশ কয়েকজন প্রার্থী প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন বাতিলের দাবি তোলেন। এরপর ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গণনা শুরুর পর এবং ফলাফলে ঘোষণার আগেই মোবাইল ফোনের ক্ষুদেবার্তার বদৌলতে কয়েকজন ‘বিজয়ী’ প্রার্থী ও তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্ধিদের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা বাইরে চাউর হয়ে গেলে সাধারণ সদস্য-সাংবাদিকদের মাঝে ক্ষোভ দানা বেধে উঠতে থাকে। এরপর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের কয়েকজন প্রার্থী ইভিএম চ্যালেঞ্জ করে ফলাফল ঘোষণা স্থগিতের জন্য নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কাছে দাবি জানান। তারপর শুরু হয় কালক্ষেপনের পালা।
তিন.
কয়েকজন প্রার্থী ও তাদের সমর্থক এবং আরো একাধিক সাংবাদিক নেতার ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে (জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তন) অবস্থানকালীন সময়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি মিলনায়তনের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেন। এ সময়ে বাইরে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপক্ষ দ্রুত ফলাফল ঘোষণার দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন, অন্যপক্ষ ফলাফল স্থগিতের দাবি থেকে একধাপ এগিয়ে নির্বাচন বাতিলের জোর দাবি তোলেন। অধিকাংশ প্রার্থীও নির্বাচন বাতিলের লিখিত দাবি জানান। যে কারণে দ্বিতীয়পক্ষের দাবিই জোরালো হয় এবং এই পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠ।
চার.
ভোটগ্রহণ চলা অবস্থাতেই নিরপেক্ষতা ও দক্ষতার প্রশ্নে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন পরিচালনা কমিটি শেষপর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ বিক্ষুব্ধ সাংবাদিক নেতা ও সাধারণ সদস্যদের মতামতকে পদদলিত করে মধ্যরাতে ফলাফল ঘোষণা করেন। এ সময় বলা হয়, কোনো সংক্ষুব্ধ প্রার্থী চাইলে পরবর্তীতে এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের (নির্বাচন পরিচালনা কমিটি) কাছে লিখিত অভিযোগ করতে পারবেন। যদিও এর ঘণ্টা তিনেক আগেই এক প্রভাবশালী সাংবাদিক নেতা ভোটকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে মাইকে ঘোষণা দেন যে, ফলাফল ঘোষণা করিয়েই আমি বের হবো এবং ফলাফল নিয়ে কারও কোনো অভিযোগ থাকলে তিনি পরে নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ করতে পারবেন। এ কথা বলেই ওই নেতা ফের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করেন।
পাঁচ.
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের ২০১২ সালের নির্বাচনেও ভোটের ফলাফল নিয়ে বিশেষ করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোটসংখ্যা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্নের সৃষ্টি এবং ভোট গণনার কাজে ব্যবহৃত মেশিন নিয়ে তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছিল। এরপর নির্বাচন পরিচালনা কমিটি থেকে জানানো হয়, সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা চাইলে ভোট হাতে গণনার জন্য আবেদন করতে পারবেন। অনেকেই আবেদন করেছিলেন। এরপর জানানো হলো পুন:গণনার (হাতে গণনা) জন্য প্রত্যেক আবেদনকারীকে ১০ হাজার টাকা জমা দিতে হবে। অনেকে তা-ও দিলেন। কিন্তু ভোট গণনার নির্ধারিত দিনে প্রেসক্লাবে উপস্থিত হয়ে এক নেতা দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, কীসের ভোট পুন:গণনা। ফলাফল যা ঘোষণা করা হয়েছে, তাই বহাল। এরপর মুখে কুলুপ আঁটলেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শ্রদ্ধেয় আবু তাহের। বলাবাহুল্য, এবারের নির্বাচনেও শ্রদ্ধেয় তাহের ভাই-ই নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ছিলেন। অত্যন্ত বিনয়ী, ভদ্র, সৎ ও সদালাপী তাহের ভাইয়ের ওপর শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, উনি এ কাজের জন্য উপযুক্ত নন। উনি সৎ হলেও সৎ-সাহসী নন। দৃঢ়চেতা মনোবলের অভাব রয়েছে উনার।
ছয়.
জনশ্রুতি আছে, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের ভোটার তালিকায় ৩০০ থেকে ৪০০ সদস্যের নাম রয়েছে, যারা আদৌ কখনও সাংবাদিকতা পেশায় ছিলেন না এবং এখনও নেই। ঢাকায় বসবাস করেন না, এমন অনেকের নামও রয়েছে তালিকায়। এছাড়া শ’ দুয়েক সদস্য আছেন, যারা দ্বৈতভোটার। অর্থাৎ দ্বিধাবিভক্ত ইউনিয়নের দুই অংশের ভোটার তালিকায় তাদের নাম রয়েছে। এই জনশ্রুতি শুধু মুখে মুখে নয়, বাস্তবেও। কিছুসংখ্যক সাংবাদিক নেতা অতীতে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হযে নিজেদের ভোটব্যাংক তৈরির জন্য এই সর্বনাশা কাজটি করেছেন; যা গোটা সাংবাদিক সমাজের জন্য কলঙ্কজনক ঘটনা।
সাত.
নির্বাচনে বিশেষ করে সাধারণ সভা (এজিএম) ও ভোটগ্রহণের দিন বিপুলসংখ্যক বহিরাগত লোকজনের উপস্থিতি, বিভিন্ন প্রার্থীর পক্ষে ভোট প্রার্থনা, নানাভাবে আপ্যায়ন এবং প্রেসক্লাব চত্বরে জমায়েত হয়ে পছন্দের প্রার্থীদের পক্ষে স্লোগান দেয়ার মতো অস্বাভাবিক ও অপ্রত্যাশিত ঘটনা সাংবাদিক সমাজের জন্য মোটেও সুখকর নয়। এটা নির্বাচনী আচরণবিধিরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কিন্তু এসব বিষয়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কোনো মাথাব্যাথা ছিল বলে মনে হয়নি। এছাড়া জাতীয় বা স্থানীয় সরকার অথবা ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনের মতো বিভিন্ন প্রার্থীর সমর্থনে ছবিসহ বিশাল আকৃতির রঙিন ব্যানার, লিফলেট, আর্ট-কার্ড, ইত্যাদি সাংবাদিক ইউনিয়নের মর্যাদাকে ছোট বৈ বড় করবে বলে মনে করি না। এসব কর্মকান্ডে প্রচুর অর্থও ব্যয় হয়ে থাকে।
আট.
যে সাংবাদিকরা নির্দিষ্ট বেতনে জীবনযাপনে অপারগ হয়ে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নবম ওয়েজবোর্ড গঠনের জন্য দুই বছরেরও বেশি সময় আন্দোলন করেছেন, সেই সাংবাদিক সমাজের নির্বাচনে লাখ লাখ টাকা খরচ হবে- এটা তো মেনে নেওয়া যায় না। স্বাভাবিক কারণে প্রশ্ন উঠবে- যারা নির্বাচিত হয়ে সাংবাদিকদের নেতা হন, তারা কি ভিনগ্রহের কেউ, নাকি সাংবাদিক? সাংবাদিকদের নেতা সাংবাদিকরাই হবেন- এটাই তো স্বাভাবিক। গঠনতন্ত্রেও তাই রয়েছে। তাহলেও নির্বাচনে লাখ লাখ টাকার ছড়াছড়ি হয় কীভাবে? পেশাদার একজন সাংবাদিক প্রার্থী হওয়ার পর এই টাকা কোথায় পান? কেনোই বা তারা নেতা হওয়ার জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করেন?
৯.
ছবি দুটি গতকাল রাতে ফলাফল নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনাপূর্ণ মুহুর্তে ভোটকেন্দ্র ও কেন্দ্রর বাইরের ছবি; যা অতীতে কখনও হয়নি।
১০.
যেহেতু সাংবাদিক সমাজ জাতির বিবেক হিসেবে পরিচিত এবং যেহেতু ভোটগ্রহণ, ভোট গণনা, ফলাফল ঘোষণাসহ নানাভাবেই গতকালের নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, সেহেতু স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতার স্বার্থে পেশাজীবী সাংবাদিকদের সর্ববৃহৎ এই সংগঠনের নির্বাচন বাতিল করে পুনর্নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করাই শ্রেয় বলে আমি মনে করি।”








