স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম হেঁটে যাবো মাওয়া। ফেসবুকভিত্তিক ভ্রমণ গ্রুপ বেড়াই বাংলাদেশের এডমিন পলাশ ইসলাম রাজি হলো আমার সঙ্গে যেতে। ওই সময়ে গরম আর রোদ থাকায় অনেকেই শঙ্কা ব্যক্ত করেছিলেন আমরা পারবোতো! আর্কিটেক্ট মীর জাহান এবং ফার্মেসি বিভাগে পড়ুয়া তার মেয়ে রুবাইয়া তাসনিমও যোগ দিলেন। শুক্রবার সকালে মিরপুর থেকে বাসে নামলাম পুরান ঢাকার তাঁতি বাজার। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সেখান থেকে সকাল ৭টা ১২ মিনিটে হাঁটা শুরু করি ৪ ভ্রমণ বন্ধু।বাবু বাজার ব্রীজ হয়ে রাজউকের ঝিলমিল আবাসিক এলাকা, কেরাণীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগার হয়ে বেশ কিছুদূর যাবার পর সকালের নাস্তা করার পরিকল্পনা থাকলেও নোংরা পরিবেশে শেষ পর্যন্ত নাস্তা করার আর রুচি হয়নি আমাদের। অথচ আমার ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় দেখেছি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও নেপালের রাস্তার পাশের রেস্টুরেন্টগুলো পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন। আমাদের দেশে এর পরিবর্তন দরকার, ঠিক করলাম পরেরবার যখন কোথাও যাবো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার বিষয়ে লিফলেট দিবো; সচেতনতায় যদি কিছুটা পরিবর্তন হয় এই আশায়। শেষ পর্যন্ত একটা জায়গায় সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কিছুটা পরিস্কার এক রেঁস্তোরায় নাস্তার বিরতি।

নাস্তা শেষে আবারো চলার শুরু। ধলেশ্বরী ১ ও ২ নম্বর সেতু পার হলাম। সেখানে সেলফিতে বন্দি হলাম আমরা। মেঘলা আকাশ। হিমেল হাওয়া। রাস্তার দুধারের সারি সারি গাছ। আর চারপাশের সবুজ প্রকৃতি যেন আমাদের সব ক্লান্তি দূর করে দিয়েছিল। প্রকৃতির এমন আবহাওয়ায় চা খাওয়া হবে না! তাই কি হয়? তাই মুন্সিগঞ্জের সিরাজদী খান নিমতলা বাসস্ট্যান্ডের কিছুটা আগে চা পানের বিরতি। পথে চলতে কষ্ট হওয়ায় স্যান্ডেলে শুকতলা লাগিয়ে আবার চলা শুরু। চলার গতি বারবারই কমাতে হচ্ছিল আমাদের। কারণ হাইওয়েতে নেই কোনো ওয়াক ওয়ে। এর মধ্যে আছে আবার দূরপাল্লার বাসের বেপরোয়া গতিতে ওভার টেকিং করার প্রতিযোগিতা।
যেতে যেতে পথে পড়লো এক চেয়ারম্যানের বাড়ি। ওখানে ফ্রেশ হতে গিয়ে আমাদের ভ্রমণসঙ্গী মীর জাহান আর তার মেয়ে পড়লেন এক বিব্রতকর অবস্থায়। সেখানে কর্তব্যরত এক পুলিশ সদস্য জানলেন আমরা হেঁটে হেঁটে মাওয়া যাচ্ছি। এরপর থেমে শুরু হলো তার নানা প্রশ্ন। কেন যাবেন? এর প্রয়োজন কি? গাড়িতে যাচ্ছি না কেন? ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের এমন উদ্যোগে মনেহলো উনারা ভীষণ অসন্তুষ্ট হয়েছেন।
পুলিশকে সামলিয়ে আবারও পথচলা শুরু, তখনো লক্ষ্য আরও ১৪ কিলোমিটার দূরে। এই সময়ে আমাদের অবাক করে দিয়ে আমার মেজো মামা ইব্রাহিম আজম খান ও বারডেমের চিকিৎসক প্রফেসর আনোয়ার আহমেদ সস্ত্রীক হাজির। উদ্দেশ্য আমাদেরকে উৎসাহ দেওয়া। কিছুক্ষণ গল্প আর ছবি তোলা শেষে বিদায় নিয়ে তারা আগেই চলে গেলেন মাওয়ার উদ্দেশ্যে।

সেখান থেকে আবারও হাঁটা শুরু। পথে এক চাচার (যিনি জাকের পার্টির মুন্সিগঞ্জের ষোলঘরের সভাপতি) কাছ থেকে এক কেজি আম কিনে নিলাম, জানলাম আমগুলো স্থানীয় গাছের। ভালোবেসে দুটি আম খাওয়ালেন কিন্তু দাম নিলেন না সেই চাচা। বিদায় নিয়ে একটু এগিয়ে দেখি বাকিরা আমার জন্য অপেক্ষা করছে। তাদেরকেও আম দিলাম। খেয়ে আবারও পথ চলা শুরু। এক পর্যায়ে শুরু হলো পায়ে ব্যথা। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম আর থামা যাবে না। তখনও ১০ কিলোমিটার বাকি। যেতে যেতে তীব্র গতিতে ছুটে চলা বাসের টেনে আনা বাতাস আর তার সঙ্গে উড়ে আসা বালু লাগছিলো শরীরে। তবুও থামা নেই। গন্তব্যে যেতেই হবে।
বিকেল ৫টার পরে দেখা মিললো পদ্মা ব্রীজের নির্মাণ কাজের মহা কর্মযজ্ঞ। বিস্ময় নিয়ে তা দেখতে দেখতে পুলকিত হৃদয়। জাতির অনেক আশার এই ব্রীজের নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে। অনেকেই সেই কাজ দেখতে ভীড় করছেন সেখানে। নির্মাণ কাজের জন্য কিছুটা ঘুরপথে পুরনো ফেরিঘাটে। ওখান থেকে বায়ে আরও সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে নতুন ফেরিঘাট। আমার আগেই পুরনো ফেরিঘাট থেকে অন্য তিনজন অটোরিক্সায় নতুন ফেরিঘাটে পৌঁছায়। আমারও আর পা চলছে না। কিন্ত শেষ মুহূর্তে ব্যর্থ হতে মন চাইলো না, তাই বহুকষ্টে হেঁটে হেঁটে নতুন ফেরিঘাট পর্যন্ত পৌঁছুলাম।

তখন সময় বিকেল ৬টা ৬ মিনিট। হাঁটা রাস্তায় দূরত্ব ৪৫ কিলোমিটার, সময় ৯ ঘণ্টা ১৩ মিনিট, কিন্তু নাস্তা, ফ্রেশ হওয়া, চা বিরতি দিয়ে সময় লাগলো ১১ ঘণ্টা। মাওয়া ঘাটে আগে থেকেই আমাদের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন মামা, ডাক্তার ভাই আর ভাবী। সেখানে তারা আমাদের শুধু অভ্যর্থনাই জানাননি; দুপুরে না খেয়ে বসেছিলেন আমাদের সাথে খাবেন বলে। তারপর সবাই মিলে যখন দুপুরের খাবার খাচ্ছি; তখন মোয়াজ্জিনের কণ্ঠে মাগরিবের আজান।
৪ জনের ছোট এই গ্রুপের ১৫-২২ কিলোমিটার হাঁটার অভিজ্ঞতা থাকলেও এত দীর্ঘ পথ হাঁটার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। বিশেষ ধন্যবাদ মা ও মেয়েকে। শেষ পর্যন্ত স্বপ্নময় এক ভ্রমণ শেষ হলো বাস্তবে। তাই এক কথায় অসাধারণ আমার অনুভূতি।







