রাজধানীতে প্রতিবছরই ঈদ-উল-আযহার দিন কোরবানি দেয়া গরু-ছাগলের রক্তসহ অন্যান্য বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ায় ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয় নগরবাসীকে। তবে এবছর সেই সমস্যা অন্যরকম অবস্থা তৈরি করেছে।
টানা বৃষ্টির পানিতে পশুর রক্ত মিশে নগরীর স্বাভাবিক জলাবদ্ধতাকে দিয়েছে ‘রক্তগঙ্গার’ রূপ। এতে দুর্ভোগের মাত্রা আরো বেড়েছে। এর জন্য ঢাকার পুরনো সমস্যা জলাবদ্ধতা আর পশু কোরবানিতে মানুষের অসচেতনতা অনেকাংশে দায়ী হলেও অনেকেই ‘অপ্রয়োজনীয়’ বিতর্ক শুরু করেছেন।
এ বিষয় নিয়ে ফেসবুকে বিভিন্ন ব্যক্তির করা মন্তব্য থেকে প্রতিবেদন তৈরি করেছে চ্যানেল আই অনলাইন।
সরকারের পক্ষ থেকে সারাদেশের ১১টি সিটি কর্পোরেশন ও ৫৩টি জেলা শহরে কোরবানির পশু জবাইয়ের জন্য ছয় হাজার ২৩৩টি স্থান নির্ধারণ করে দেয়া হলেও বাধ্যতামূলক নয় বলে সেগুলো ব্যবহার করা হয়নি বললেই চলে। তাই রাস্তাঘাটে যত্রতত্র কোরবানি দেয়ার ফলে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি। যার জন্য মানুষের অসচেতনতাই মূলত দায়ী।
অর্পা রহমান নামের একজন লিখেছেন, “ঢাকার রাস্তায় বৃষ্টির পানি জমে যাওয়া আর সাথে কোরবানির পশুর রক্ত মিশে রক্তের বন্যা ঘটাতে ঢাকার ড্রেন ব্যবস্থা যতটা দায়ী আপনার ফেলা চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল, মুড়ির ঠোঙ্গা, বাদাম এর খোসা ঠিক ততটাই দায়ী! জি, আপনার দায়টা বোধহয় একটু বেশিও হতে পারে!”
গতকাল সকাল সাড়ে দশটার দিকেই রাস্তায় রাস্তায় কোরবানি পশুর রক্ত, আবর্জনায় একাকার হয়ে যাওয়া নয়াপল্টন এলাকার কয়েকটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেন একুশে টেলিভিশনের সিইও মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল।
কবির য়াহমেদ তার স্ট্যাটাসে লিখেন, “ঢাকার রক্তগঙ্গার যে দৃশ্য ভেসে উঠেছে সেটা অপরিকল্পিতভাবে পশু জবাইয়ের এক উদাহরণ। সিটি কর্পোরেশনের নির্দিষ্ট করে দেওয়া স্থানে পশু জবাই না করার কারণে এমনটাই হলো হয়ত। এর দায় এখন কার?
সাম্প্রতিক সময়ের অতিপ্রচারণা যে শব্দে আটকে আছে সেটা হচ্ছে “উন্নয়ন”। দীর্ঘদিন ধরে শোনে আসা এ গল্পের অন্তঃসারশূন্য রূপ এ জলাবদ্ধতা ও নিষ্কাসন ব্যবস্থা। এ ব্যাপারে সরকার ও সিটি কর্পোরেশনের কী বক্তব্য?”
কল্লোল মস্তোফা নামের একজন বিদ্রুপ করে লিখেন, “(রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়): বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জলাবদ্ধতা নিরসনের কি অপুর্ব দৃষ্টান্ত!”
সিটি কর্পোরেশন কর্মীদের ‘বিরামহীন কাজ’ এবং ‘স্থানীয়দের সচেতনতা বৃদ্ধির’ ফলে ইতিমধ্যে ৩৬ ঘণ্টারও কম সময়ে রাজধানীর অলিগলি থেকে কোরবানির পশুর বর্জ্য সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন।
মানুষের পরিচ্ছন্নতাবোধ বৃদ্ধির ইতিবাচক প্রবণতাও তুলে ধরেন আতিক বাঙ্গাল নামের একজন। ফেসবুকে তিনি লিখেন, “ঢাকার রাস্তায় বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার পানির সাথে কোরবানির পশুর রক্ত মিশে পানির রঙ লাল হয়ে গেছে। এটা নিখাঁদ জলাবদ্ধতার সমস্যা। কোরবানি প্রতিবার যেভাবে হয় এবারো তার কোন ব্যাতিক্রম হয়নি। আমি বরং দেখেছি আগের চেয়ে মানুষের পরিবেশ ও পরিচ্ছনাবোধ অনেক বেড়েছে। প্রায় সবাই পানি ঢেলে রক্ত ধুয়ে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দেয়।”
হাবিব বাবুল নামের একজন লিখেছেন, “জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশের কথা চিন্তা করে যেখানে সেখানে কোরবানির পশু জবাই করার বিষয়টা সবার একবার ভেবে দেখা উচিৎ । বৃষ্টির পানির সাথে রক্ত মিশে ঢাকার কিছু কিছু রাস্তায় যে রক্ত স্রোতের ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হচ্ছে তা অবশ্যই শঙ্কার বিষয়।”
পশ্চিমা বিশ্বেতো অবশ্যই, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যেও কোরবানি হয় বিশেষ ব্যবস্থাপনায়, বিশেষ জায়গায়। মানুষ দাম দিয়ে টোকেন নিয়ে আসে, পরে গিয়ে মাংস নিয়ে আসে। কাতার এবং বাহরাইন গিয়ে এমন অভিজ্ঞতা অর্জনের কথা গতকাল ফেসবুকে শেয়ার করেন সাংবাদিক শরীফুল হাসান।
কাতারে কোরবানি দেয়ার নিয়ম সম্পর্কে তিনি লিখেন, “…এই দেশে শহরের মধ্যে যেখানে-সেখানে পশু জবাইয়ের কোনো সুযোগ নেই। কোরবানি করা হয় শহরের বাইরে আবু হামর এলাকায়। …সেখানে ভেড়া, ছাগল, গরু, উট সার বেঁধে রাখা। কেউ একজন যেটা পছন্দ করছেন সেটার নির্ধারিত মূল্য জমা দিয়ে কুপন সংগ্রহ করছেন। শুনলাম ঈদের দিন বা পরের দিন লাইনে দাঁড়িয়ে সেই কুপন নিয়ে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করলে ভেতর থেকে সেটি জবাই এবং মাংস কাটাকুটির কাজ শেষ হয়ে আসবে। ফলে ঈদুল আজহায় কাতারের কোনো সড়ক বা কোথাও কোনো রক্ত বা পশুর বর্জ্য চোখে পড়ে না। পরদিন বাহরাইনে গিয়েও একই চিত্র পেলাম।”
অথচ এদেশের একেবারে বিপরীত চিত্রটাও তুলে ধরেন তিনি পোস্টটিতে, “আজ সকালে যারা ঢাকা শহরে বেরিয়েছেন তারা দেখবেন সব রাস্তাঘাট বৃষ্টির পানিতে সয়লাব। পশুর রক্তে সেই পানি হয়ে গেছে টকটকে লাল। মনে হবে দেশে বুঝি যুদ্ধ চলছে। সিটি করপোরেশন গতবছর থেকে কোরবানির স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু সেটা তদারকির কেউ নেই। ফলে সব রাস্তাই ভেসে যাচ্ছে রক্তে। ঈদের দিন বা পরের দিন আপনি কোথাও বের হবেন দুর্গন্ধে টেকা দায়। আর এই যে রক্তস্নাত শহর কতো যে রোগ বালাই ছড়াবে কে জানে?”







