চালকবিহীন বিমান বা ড্রোনের খবর এতোদিন আমরা শুধু বিভিন্ন দেশের খবর আর চলচ্চিত্রেই দেখে আসছি। রিমোট কন্ট্রোলে চলা প্রায় খেলনার মতো দেখতে ছোট ছোট উড়ালযানগুলো অনেকগুলো প্রপেলারের সাহায্যে উড়ে বেড়ায়। কখনো আকাশ থেকে ভিডিও করে, ছবি তোলে, কখনো বা জিনিসপত্র পরিবহন করে।
কিন্তু আমাদের বাকি সবার মতো শুধু ‘দেখা’র মাঝে সীমাবদ্ধ নেই কেউ কেউ। বরং প্রযুক্তিকে নিজের হাতে আনার চেষ্টা চালান তারা। এমনই একজন হলেন বাংলাদেশের তরুণ নাহিদ ফেরদৌস। নিজের চেষ্টায় কার্যকর ড্রোন তৈরি করেছেন তিনি।
ছোটবেলা থেকেই রোবটিক্স (রোবট বিষয়ক বিজ্ঞান) এবং মোটরাইজড প্রযুক্তির প্রতি ভীষণ আগ্রহ ছিলো নাহিদের। ‘তখন নিজের মোটরচালিত গাড়ি আর খেলনাগুলো খুলে আবার জোড়া দেয়ার চেষ্টা করতাম আমি। নতুন কিছু তৈরির চেষ্টা করতাম,’ চ্যানেল আই অনলাইনকে বললেন নাহিদ। ‘তখন তো ড্রোন চিনতাম না। কিন্তু এ ধরণের প্রযুক্তির প্রতি খুব কৌতুহল ছিলো। ভিন্ন কিছু বানাতে চাইতাম।’
ওই আগ্রহ থেকেই ঢাকার একটি কলেজে ইলেকট্রনিকসে ডিপ্লোমা করে ভর্তি হন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগে। এক শিক্ষকের সহায়তায় ডিপ্লোমা পড়ার সময় নাহিদ রোবটিক্স বিষয়ক বিভিন্ন কর্মশালায়ও অংশ নিতেন।
ড্রোনের দিকে নাহিদের প্রথম নজর যায় ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া আমির খানের ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র ‘থ্রি ইডিয়টস’ দেখার পর। সেখানে বন্ধুরা মিলে তৈরি করা ড্রোন আকাশে ওড়ানোর দৃশ্য দেখে অনুপ্রাণিত হন তিনি, ‘ছবিটা দেখেই মনে হয় আমাকে এমন কিছু বানাতে হবে।’
এরপরই বিভিন্ন ব্লগ ও লেখালেখি পড়ে ড্রোন তৈরির পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে শুরু করেন নাহিদ। কিন্তু খুব ইচ্ছে থাকলেও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সহজলভ্য না হওয়ায় এবং ব্যয়বহুল এ কাজে যথেষ্ট আর্থিক সহায়তা না পাওয়ায় সে সময় এগোনো সম্ভব হয়নি ড্রোন বানানোর কাজ। তাই উপযুক্ত প্রযুক্তি বাংলাদেশে আসার অপেক্ষা করতে থাকেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর উন্নত প্রযুক্তি পেয়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয় তহবিলের আর্থিক সহায়তা নিয়ে নাহিদ ড্রোন তৈরির কাজ শুরু করেন ২০১৩ সালে। নিজের বাসার একটি ঘরে সাজানো ব্যক্তিগত গবেষণাগারে চলতে থাকে গবেষণা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্পের অংশ হিসেবে চার মাসের চেষ্টায় বন্ধুদের সঙ্গে মিলে নাহিদ তৈরি করেন চার প্রপেলার বিশিষ্ট ‘স্পাই কোয়াড কপ্টার-হেলিক্যাম’।
এরপর নতুন আগ্রহে কাজ শুরু আরো একটি ড্রোন তৈরি করেন তারা। নতুন ড্রোনটিতে আলট্রাসনিক সেন্সর ব্যবহার করা হয়, যার মাধ্যমে বের করা সম্ভব ঠিক কতো উচ্চতায় রয়েছে ড্রোনটি। প্রায় তিন কেজি ওজন বহনে সক্ষম ওই ড্রোনটি এক হাজার মিটার উচ্চতা পর্যন্ত ওড়ার পাশাপাশি বাতাসে স্থিরও থাকতে পারে। দুই কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব পর্যন্ত ড্রোনটি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
এই ড্রোনের জন্যই ২০১৪-তে ঢাকার এমআইএসটি আয়োজিত প্রথম জাতীয় অ্যারো-ডিজাইন প্রতিযোগিতার ‘রোটারি উইং বিভাগ’-এ নাহিদ ও তার দল প্রথম স্থান লাভ করেন।
প্রথমে দলীয়ভাবে কাজ করলেও একসময় দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কারণে নাহিদের বন্ধুরা ড্রোন নিয়ে গবেষণা করার ওপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু থেমে যাননি নাহিদ। তখন থেকে মোটামুটি একাই কাজ করছেন। এ পর্যন্ত মোট ১২টি ড্রোন তৈরি করেছেন তিনি। এদের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য।
‘ড্রোনগুলোর মধ্যে রয়েছে ইমেজ পোস্ট-প্রসেসিং, অ্যারিয়াল ম্যাপিং, ডিজাস্টার এরিয়া ম্যাপিং, অ্যারিয়াল ফটোগ্রাফি এবং রেসিং ড্রোন,’ জানান নাহিদ। ড্রোনগুলো দিয়ে হাই ডেফিনিশন থ্রিডি ছবি তোরা সম্ভব। ম্যাপিং ড্রোনগুলো দিয়ে ওপর থেকে কোনো এলাকার বা দুর্ঘটনা কবলিত অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করে মানচিত্র তৈরি যায়। ওপর থেকে ভিডিওচিত্রও ধারণ করা যাবে ভিডিও প্রযুক্তিযুক্ত ড্রোনটি দিয়ে।
বাংলাদেশে নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের মতো করে ফিচার যোগ করে ড্রোন বানানোর প্রযুক্তি থাকলেও কর্মক্ষম ড্রোন তৈরির মতো উপযুক্ত বডি এ দেশে পাওয়া যায় না, তৈরি করাও সম্ভব হয় না। কেননা ড্রোন তৈরির থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি বাংলাদেশে নেই। তাছাড়া উপযুক্ত মানের সব কাঁচামালও পাওয়া যায় না এ দেশে। তাই এক থেকে দু’হাজার টাকা মূল্যের বডিটি বিদেশ থেকে কিনে আনা হয়। এরপর নিজস্ব প্রয়োজন ও প্রযুক্তি অনুসারে ড্রোন তৈরি করেন নাহিদ।
ড্রোন নিয়ে আমাদের দেশে কী করার পরিকল্পনা আছে, এমন প্রশ্নের জবাবে নাহিদ বলেন, ‘ড্রোন ব্যবহার করে আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো ক্যাম্পাসের অ্যারিয়াল ভিউ (আকাশ থেকে তোলা ছবি/ভিডিও) ধারণ করেছি। বাংলাদেশে এই প্রচেষ্টা এই প্রথম। আমরা সাধারণভাবে সবসময় ভূমি থেকেই আশপাশটা দেখি। কিন্তু ওপর থেকে দেখলে ক্যাম্পাসের দৃশ্যটা খুব সুন্দর লাগে। তাছাড়া এর মাধ্যমে সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব একটি এলাকার কোথায় কী আছে, কীভাবে আছে।’
কনস্ট্রাকশন এলাকায় নির্মাণ চালানোর আগে বা নির্মাণাধীন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য অ্যারিয়াল ম্যাপিং ড্রোন ব্যবহার করা যায়। আপাতত নিজের অফিসের হয়ে কিছু প্রকল্পে পরীক্ষামূলকভাবে সেই কাজটিই করছেন নাহিদ।
তিনি বলেন, ‘একটি কনস্ট্রাকশন এরিয়ায় কাজ শুরু করার আগে ওই এলাকার একটি নিখুঁত ম্যাপের প্রয়োজন হয়। আগে আমরা সেটা নিতাম গুগল আর্থ থেকে। কিন্তু সমস্যা হলো, গুগল আর্থের ম্যাপটি স্পষ্ট নয়। তাছাড়া সেটি আপডেট হয় এক মাস পর পর। ফলে আমি সেখান থেকে এক মাস আগের তথ্য পাবো। সেখানে ড্রোন ব্যবহার করে এক ঘণ্টার মধ্যে ম্যাপিং করে নতুন তথ্য পাওয়া সম্ভব।’
আরো একটি কাজ হলো ডিজাস্টার এরিয়া ম্যাপিং। ঘুর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা প্রভৃতি দুর্ঘটনা কবলিত এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, কোথায় ত্রাণ বেশি প্রয়োজন, কোথায় মানুষ আটকা পড়ে আছে, এসব তথ্য সংগ্রহ করা যাবে নাহিদের তৈরি ড্রোন দিয়ে। এর সাহায্যে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে তিন থেকে চার কিলোমিটার এলাকার ম্যাপিং করা সম্ভব। এতে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে দুর্যোগ কবলিতদের সাহায্য করা যাবে।
এছাড়া বৈদ্যুতিক ট্রান্সমিশন লাইনের বিভিন্ন স্থানে ত্রুটি থাকলে বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ড্রোন দিয়ে তা চিহ্নিত করে মেরামত করা সম্ভব। ‘এতো লম্বা একেকটি লাইন তো সবসময় হেলিকপ্টার দিয়ে মনিটর করা সম্ভব নয়। বিদ্যুৎকর্মীরা হাতে ধরে পরীক্ষা করাও বিপজ্জনক। তাই থারমাল ইনফ্রারেড ক্যামেরাযুক্ত (তাপ সনাক্ত করতে পারে এমন ক্যামেরা) ড্রোন ব্যবহার করে কম খরচে ট্রান্সমিশন লাইনগুলো মনিটর করে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা সনাক্ত করা যেতে পারে।’
আবার গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) প্রযুক্তির ড্রোনগুলো ব্যবহার করে যানজট সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব বলেও জানান নাহিদ। রাস্তায় একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর এ ধরণের ড্রোনগুলো বসিয়ে দিলে সেগুলো ট্রাফিক পরিস্থিতি সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করে সরাসরি অনলাইন ডাটাবেসে পাঠাতে পারবে। সেই তথ্য থেকে প্রয়োজন অনুসারে রাস্তার ট্রাফিক সিগনাল নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
কৃষিক্ষেত্রেও ড্রোন ভূমিকার রাখতে পারবে বলে আশা নাহিদের। এক্ষেত্রে এক থেকে দুই কিলোমিটারের মতো বড় বড় কৃষিজমি ড্রোনের মাধ্যমে মনিটর করে জমি ও ফসলের কী অবস্থা, কোথায় কী করা প্রয়োজন এসব তথ্য সংগ্রহ করা যায়।
সহায়তামূলক উদ্দেশ্য ছাড়াও বাণিজ্যিক কাজে ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনাও আছে নাহিদের। ছবি তোলা এবং বিভিন্ন চলচ্চিত্র ধারণের কাজে আসতে পারে ড্রোন। পাশাপাশি পণ্য পরিবহনও করা সম্ভব হবে ড্রোন দিয়ে। তবে এর জন্য আগে প্রয়োজন উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া। নির্দিষ্ট পরিমাণ ভার বহনে সক্ষম ড্রোন দিয়ে পণ্য বহনের জন্য যে অঞ্চলের মধ্যে পরিবহন সেবা দেয়া হবে তার পুরোটাতেই নেটওয়ার্ক টাওয়ার বসাতে হবে।
‘এটা অনেকটা মোবাইল অপারেটরের টাওয়ারের মতো,’ বুঝিয়ে বলেন নাহিদ, ‘যেমন, ঢাকা শহর জুড়ে পণ্য পরিবহন সেবা দিতে হলে টাওয়ারের মাধ্যমে পুরো ঢাকায় নেটওয়ার্ক বিস্তার করতে হবে। নইলে আপাতত আমার ড্রোন ২ কিলোমিটারের বেশি যেতে পারবে না।’
তবে আমাদের দেশে এটি হতে এখনো দেরি আছে বলে মনে করেন নাহিদ। কারণ যথেষ্ট প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে পর্যাপ্ত সহায়তা ও সতর্কতা ব্যবস্থা এখনো বাংলাদেশে নেই।
বর্তমানে নাহিদ ফেরদৌস কাজ করছেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আইটি বিভাগে। চাকরি আর পড়ালেখার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গবেষণাগারে চালিয়ে যাচ্ছেন ড্রোন গবেষণা। ইচ্ছে আছে ড্রোন প্রযুক্তি নিয়ে আরও বড় কিছু করার।






