হঠাৎ করেই রাজধানী জুড়ে বেড়ে চলেছে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এরই মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৪ জন। গত দু’মাসে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ১৬০ ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন।
মাঝে ডেঙ্গু সংক্রমণের তেমন কোনো সংবাদ না পাওয়া গেলেও অতিবৃষ্টি আর জলাবদ্ধতার কারণে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেশ ক’টি নগরীতে এবার ডেঙ্গু সংক্রমিত হয়েছে। সমগ্র বিশ্বে ডেঙ্গি নামে পরিচিত হলেও এডিস মশাবাহিত এই রোগটি বাংলাতে ডেঙ্গু নামেই সমধিক পরিচিত।
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ওয়ানডে ও টি-২০ দলপতি মাশরাফি বিন মর্তুজা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত ৮ অক্টোবর রাতে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। খুলনার হয়ে জাতীয় ক্রিকেট লিগের তৃতীয় রাউন্ডে খেলতে যাওয়ার কথা থাকলেও অসুস্থতার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। এছাড়া বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের পুত্র আমান মমতাজ মওদুদ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন গত ১৪ সেপ্টেম্বর।
ডেঙ্গু’র প্রকোপ বৃদ্ধির বিষয়টি স্বীকার করেছেন খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ৪ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ঢাকা মহানগরীতে ডেঙ্গু জ্বর কিছুটা বেড়েছে’। সামান্য সতর্কতা অবলম্বন করলেই ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা ধ্বংস করা যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
১৭৮০ সালে প্রথম এই রোগের বর্ণনা পাওয়া যায়। মশার মাধ্যমে এর সংক্রমণ বিস্তার ১৯০৫ সালে এবং এটি যে একটি ভাইরাসজনিত রোগ তা ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। অবশ্য, ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত ভাইরাসটি শনাক্ত করা যায়নি।
এটি এখন প্রতিষ্ঠিত যে, চারটি পৃথক ধরনের ভাইরাস (টাইপ ১-৪) ডেঙ্গু জ্বরের জন্য দায়ী। এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ যা এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। এটি সাধারণত যে সব ঋতুতে মশার প্রকোপ বেশি থাকে অর্থাৎ গরম আবহাওয়ায় বেশি ঘটতে দেখা যায়।
এর সুপ্তাবস্থা অর্থাৎ জীবাণুর সংক্রমণ থেকে শুরু করে প্রথম রোগের লক্ষণ দেখা দেয়া পর্যন্ত ৩ থেকে ১৫ দিন কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৭ থেকে ১০ দিন।
ডেঙ্গু মহামারী আকারে ভারত, থাইল্যান্ড, জাপান, ফিলিপাইন, বাংলাদেশসহ পশ্চিম আফ্রিকা এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা ইন্দোনেশিয়া, উত্তর-পুর্ব অস্ট্রেলিয়া, ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাংশে দেখা যায়।
চলতি বছর সারা দেশে ২ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। ঢাকা শহরেই গত ৪ মাসে আক্রান্ত হয়েছে ৬৯০ জন। এরই মধ্যে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৪ জন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের হিসাবে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ডেঙ্গুর এ প্রকোপের জন্য অতিবৃষ্টির পাশাপাশি জনসাধারণের অসচেতনতাকে দায়ী করছে সিটি করপোরেশন।
ডেঙ্গুর এমন প্রকোপ চললেও তা প্রতিরোধে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। নগরবাসীর অভিযোগ, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ থাকলেও মশক নিধন কর্মীরা ঠিকমতো কাজ করছেন না।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি করপোরেশনের পদক্ষেপ হিসেবে হাসপাতালে আক্রান্ত ভর্তি হওয়া রোগীর ঠিকানা নিয়ে তার আশপাশের ২০০ গজ এলাকায় ডেঙ্গু প্রতিষেধক ওষুধ দেয়া, ডেঙ্গুবিরোধী প্রচারাভিযান, র্যালি ও বিভিন্ন ধরনের ক্যাম্পেইন করা হয়েছে।
এছাড়া ১ লাখ লিফলেট ও ১১ হাজার ৪০০ পোস্টারও বিলি করা হয়েছে। গত ৪ অক্টোবর থেকে সাত দিনব্যাপী ক্রাশ প্রোগ্রাম চালানো হচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধিতে আমরা বিভিন্ন প্রচারাভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। আগামী ১৮ অক্টোবর এ বিষয়ে আমাদের একটি বিশাল র্যালি অনুষ্ঠিত হবে।
প্রকৃত অর্থে ডেঙ্গু জ্বরের এখন পর্যন্ত আধুনিক চিকিৎসা নেই। সম্প্রতি থাইল্যান্ডে এই রোগের ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়েছে এবং বর্তমানে শিশুদের মধ্যে তা প্রয়োগ করা হচ্ছে।
২০০১ সালে দেশে সর্বপ্রথম ডেঙ্গুজ্বর ধরা পড়ে। ওই বছর বেশ কয়েকজন আক্রান্ত হয় এবং একজন রোগী মারা যায়। এ নিয়ে দেশে তোলপাড় শুরু হলে ২০১২ সাল পর্যন্ত এ রোগের প্রাদুর্ভাব তুলনামূলক অনেক কম দেখা যায়। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে আবার ভয়াবহ রূপ ধারণ করলেও ২০১৪ সালে এ সংখ্যা অনেকটা কমে আসে। কিন্তু এ বছর আবার বাড়তে শুরু করেছে।
রাজধানীবাসীর অভিযোগ,বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির পানি জমে মশার উপদ্রব মারাত্মক আকার ধারণ করলেও সিটি কর্পোরেশনের কোনো ভূমিকা নেই। তারা বলছেন, মশার উপদ্রব বাড়লেও উত্তর বা দক্ষিণ কোনো সিটি কর্পোরেশনে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চোখে পড়ছে না।
প্রতি বছর ডেঙ্গু মৌসুম শুরুর আগে ডিসিসির পক্ষ থেকে নাগরিক কমিটির মাধ্যমে জনসচেতনতা কার্যক্রম শুরু হলেও এ বছর তেমনটি নজরে পড়েনি।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায়। তিনি বলেন,বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাতের কারণে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে মশা ডিম পাড়ে। ফলে মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। তাছাড়া আগে আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মশার ওষুধ দেয়া হতো। কিন্তু বর্তমানে ওয়ার্ড কাউন্সিলররা এটি তদারকি করছেন।
ডেঙ্গুজ্বর একধরনের ভাইরাস। এর অপর নাম ‘ব্রেকবোন ফিভার’। ডেঙ্গুজ্বরের সুনির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা নেই। তাই প্রতিরোধ একটু কঠিন। তবে মশার বংশ ধ্বংসের মাধ্যমে অনেকটাই এর প্রতিরোধ সম্ভব। ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা ধ্বংসে সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, সেটাই প্রত্যাশা।







