বলতে পারেন, আমেরিকায় আবার যুদ্ধ কী! আমেরিকা যুদ্ধ বাধায় পৃথিবীর নানা দেশে। মার্কিন বাহিনী যায় রণসজ্জিত হয়ে। হারাতে হয় কিছু সৈনিককে এবং তা নিয়ে বিক্ষোভ আছড়ে পড়ে আমেরিকার পথে। অন্য দেশে আধিপত্য ছড়াতে গিয়ে নিজের দেশের এত মায়ের কোল খালি করে দিচ্ছে রাষ্ট্রশক্তি, এই ক্ষোভ নীরব থাকে না। শপথ নিয়েই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন, বিজনেস ফর আমেরিকানস, জব ফর আমেরিকানস, সিকিউরিটি ফর আমেরিকানস। মানে বোধহয় দাঁড়ায়, ব্যবসা–বাণিজ্যে চীনের অগ্রগতি আটকাতে হবে, অন্য সব দেশেরও। মেধাবী বিদেশিরা যাতে বেশি কাজ না পান, সেই চেষ্টায় ত্রুটি থাকবে না। নিরাপত্তা মানে মার্কিনিদের নিরাপত্তা, বিশেষত শ্বেতাঙ্গদের! শপথের দু’দিন পরে নতুন যুদ্ধ ঘোষণা করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোজাসাপ্টা কথা: সাংবাদিকরাই সমাজের নিকৃষ্ট শ্রেণীভুক্ত। ওদের আমি ঠান্ডা করে ছাড়ব! আমেরিকার কোন রাষ্ট্রপতি এই বিষয়ে এই ভাষায় কথা বলেননি (মনে হয়েছে, যেন বাংলাদেশের কোনো নেতা মিডিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষোভ ঝাড়ছেন)। আমেরিকায় সংবাদমাধ্যম গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ, মেনে নেওয়া হয়েছে। প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্র ও নিউজ চ্যানেল নির্বাচনে ট্রাম্পের বিরোধিতা করেছে। হাতে যা তথ্য, ট্রাম্পের যা ইতিহাস, অন্য কিছু হওয়ার কথা ছিল না। সবই অবশ্য থিতিয়ে যায়, নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে ন্যূনতম মর্যাদা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত সংবাদমাধ্যম। যদিও লক্ষ লক্ষ মানুষ পথে নেমে জানাচ্ছেন, এই প্রেসিডেন্টকে মানি না! ট্রাম্পের হুঙ্কারের জবাব দিয়েছেন সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিরা: আমরা কী দেখাব, আমরা কী লিখব, তা আমরাই ঠিক করব, আপনি ঠিক করে দেবেন না মিঃ ট্রাম্প!
ডোনাল্ড ট্রাম্প শপথ গ্রহণের পর থেকেই চলছে টানটান উত্তেজনা। নিত্যনতুন সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছেন। দুনিয়া জুড়ে সৃষ্টি হচ্ছে চাঞ্চল্য, উত্তেজনা। আইন তৈরিতে অনেক সময় লেগে যায়, কিন্তু প্রেসিডেন্ট কলমের খোঁচাতেই সরকারের নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ক্ষমতা প্রয়োগে এক মুহূর্তের জন্যও সময় নষ্ট করেননি। নির্বাচনী প্রচারণার সময় দেওয়া প্রধান প্রধান প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একের পর এক নির্দেশনা জারি করে চলেছেন।
২০১৫ সালের জুন মাসে প্রেসিডেন্ট হিসাবে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেয়ার দিনেই ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে মেক্সিকো থেকে অবৈধ অভিবাসন ঠেকানো। তিনি বলেছেন দক্ষিণের সীমান্তে ‘শক্ত, উঁচু, সুন্দর’ দেয়াল তুলবেন। ক্ষমতা নিয়েই সেরকম এক নির্দেশনায় সই করে দিয়েছেন তিনি। টানা ২,০০০ মাইল দেয়াল তোলা হবে। অতিরিক্ত ১০,০০০ অভিবাসন কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হবে। এছাড়া, লস এঞ্জেলেস বা নিউ ইয়র্কের মতো যেসব কসমোপলিটন নগরগুলোতে অবৈধ অভিবাসীদের আশ্রয় মেলে সেসব শহরগুলোতে কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল কমিয়ে দেয়ার একটি সিদ্ধান্তও নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
তিনি দুইটি জ্বালানি পাইপলাইন তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারেও একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে একটি হলো কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি শোধনাগারে জ্বালানি তেল আসার জন্য ১১৭৯ মাইল একটি পাইপলাইন নির্মাণ। পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগের কারণে ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট ওবামা ওই কাজ স্থগিত করেছিলেন। অন্য পাইপলাইনটির কাজও গত বছর বন্ধ হয়ে যায় যখন নর্থ ডাকোটা অঙ্গরাজ্যের আদিবাসীরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। তাদের দাবি ছিল এই পাইপলাইন নির্মাণে তাদের জীবন জীবিকা ঐতিহ্য নষ্ট হবে। ট্রাম্প পরিবেশ বা ঐতিহ্য কোনোটাই আমলে নেননি।
স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতি লম্বা একটি নির্দেশনা জারি করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দরিদ্র মানুষের জন্য সহজ শর্তে যে স্বাস্থ্য বীমার ব্যবস্থা করেছিলেন বারাক ওবামা সেগুলোতে সরকারি ভর্তুকি দেওয়ার ব্যাপারে নানা বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে ওই নির্দেশনায়। ভর্তুকি ছাড় করার বেলায় ‘দেরি, সাবধান হওয়া বা বাতিল’ করার সুযোগ খুঁজতে বলা হয়েছে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান ১৯৮৪ সালে প্রথমবার এক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন যে বিশ্বের যে কোনো জায়গায় গর্ভপাতে সহায়তা করার কর্মসূচিতে সাহায্য দেওয়া যাবেনা। এই নির্দেশনা যুক্তরাষ্ট্রে সবসময় একটি বিতর্কিত ইস্যু। ডেমোক্রেটরা ক্ষমতায় এলেই তা বাতিল করে, আবার রিপাবলিকান আবার তা সক্রিয় করে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই নিষেধাজ্ঞা আবার চালু করেছেন।
নতুন করে কেন্দ্রীয় সরকারের সমস্ত নিয়োগ নিষিদ্ধ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ব্যতিক্রম থাকবে সেনাবাহিনী। ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ বা টিপিপি চুক্তি থেকে প্রত্যাহার প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার কিছু দেশের সাথে এই বাণিজ্য চুক্তিকে খুবই গুরুত্ব দিয়েছিলেন ওবামার সরকার। কিন্তু ট্রাম্প এই চুক্তিকে ইতিহাসে ছুঁড়ে দিয়েছেন।
সিরিয়াসহ সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ট্রাম্প। তারা তিন মাস যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থীদের প্রবেশও চার মাসের জন্য স্থগিত করেছেন। এক নির্বাহী আদেশে তিনি এইসব পদক্ষেপ নিয়েছেন। নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপগুলো মার্কিন নাগরিকদেরকে সন্ত্রাসী হামলা থেকে সুরক্ষা দেবে। সিরিয়া ছাড়া বাকি যে ৬টি মুসলিম দেশ তিন মাসের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে সেগুলো হলো ইরান, ইরাক, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান এবং ইয়েমেন।
হাত কামড়াচ্ছেন ৪৪% মার্কিনি, যারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম সপ্তাহের রকমসকম দেখে প্রমাদ গুনছেন। আর ১৯% মার্কিনি এখন বিভ্রান্ত। বুঝে উঠতে পারছেন না, যা হচ্ছে ঠিক হচ্ছে, নাকি ভুল। অন্য দিকে ৩৬% মনে করছেন, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর যা যা করেছেন, ঠিকই করেছেন। গত সপ্তাহে একই রকম একটি জনমত সমীক্ষায় ধরা পড়েছিল, আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে কম জনসমর্থন নিয়ে প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ট্রাম্পের নীতি হচ্ছে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’। কিন্তু প্রথম এক সপ্তাহে তার ঘোষিত সিদ্ধান্তে এটাই স্পষ্ট, কেবল আমেরিকা ফার্স্ট, আর বাকি সব দেশ লাস্ট, মাঝখানে বিশেষ কোনও সেকেন্ড থার্ড ইত্যাদি নেই। আমাদের লাভ মানে তাদের ক্ষতি, তাদের লাভ মানে আমাদের ক্ষতি, এই সরল সমীকরণই ট্রাম্প প্রশাসনের একমাত্র হিসেব।

ইতিমধ্যে আমেরিকার বন্ধু হিসেবে পরিচিতরা প্রমাদ গুণতে শুরু করেছে। ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ বা টিপিপি চুক্তিটি বাতিল করে এশিয়ার অনেক দেশের বিরাগভাজন হয়েছেন। সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে বলেছেন, এশিয়া এতে কী হারাল, তা অস্পষ্ট। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এশিয়াকে হারাল সেটা স্পষ্ট।
চেনা মিত্রদের শত্রু পক্ষে ঠেলে দিয়ে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধন আলগা করলে দেশের অর্থনীতির অবনতি রোধ হবার আশা সামান্য। শস্তা বিদেশি শ্রমিকগুদেরকে চাকরি থেকে বের করে দিলেই যে মার্কিন শ্রমিকরা দলে দলে কাজ পাবেন, তা নিতান্ত অলীক কল্পনা। আমেরিকার বেকার-সমস্যার মূল কারণ শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রে অটোমেশন-এর ব্যাপক প্রসার, সস্তা এশীয় বা দক্ষিণ আমেরিকান শ্রমিক নয়।একথা ট্রাম্প প্রশাসনকে কে বোঝাবে? প্রশ্ন হলো, আমেরিকা ফার্স্ট হোক ক্ষতি নেই, কিন্তু গোটা দুনিয়াকে এই ভাবে লাস্ট কিংবা শত্রুর মতো পরিত্যাজ্য করে রাখলে ফার্স্ট হবার পথটি ত্বরান্বিত হবে কি? বর্তমান দুনিয়ায় অর্থনৈতিক বহুপাক্ষিকতা বহু ক্ষেত্রেই নিজ স্বার্থের পরিপন্থী নয়, বরং নিজ স্বার্থের বিকাশপন্থী। ট্রাম্পের কথা বাদ থাকুক, তার উপদেষ্টারাও কি এই কথাটি জানেন না?
পূর্বসূরীরা বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ বাধিয়েই রেখেছেন। সেই যুদ্ধকে আরও ব্যাপক রূপ দিচ্ছেন ট্রাম্প। এই যুদ্ধতরী আর কোথায় নিয়ে যাবেন, তা অনুমান করা যাচ্ছে না। সাংবাদিকদের ‘ঠাণ্ডা করা’র হুমকি দিয়ে দিয়ে দেশের মধ্যেই একটা বড় যুদ্ধ বাধিয়ে দিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। হায়, অগ্রাধিকার!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








