বাঘ যদি বাঘ হয় গর্জন সে করবেই। ফরম্যাট আর ভেন্যু পরিবর্তন হলেও বাঘের গর্জন আছে আগের মতোই। পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে-টি-টোয়েন্টির পর টেস্টেও গর্জন চলছে টাইগারদের।
ঢাকা থেকে খুলনার দুরত্ব ৩৩৫ কিলোমিটার। দূরত্ব আর জায়গা বদলালেও গর্জনের জোর একই। বরং স্টেডিয়াম থেকে সুন্দরবন কাছে হওয়ায় গর্জনের তীব্রতা যেন বেশিই হলো।
সেটাই যদি না হয়, তাহলে পেস ব্যাটারিতে ক্রিকেট বিশ্ব কাঁপানো পাকিস্তানি বোলাররা উইকেট শূন্য থাকার পর নিচু মাথা আর মলিন মুখে মাঠ ছাড়বেন কেন?
শুধু ঢাকা-খুলনা কেনো? লর্ডস থেকে মেলবোর্ন, প্রেমাদাসা থেকে ওয়াংখেড়ে, কিংসটন থেকে হ্যামিলটন– গর্জন শোনা যাচ্ছে সব জায়গা থেকে।
দিনের খেলা শেষে তামিম-ইমরুল যখন মাঠ ছেড়ে যাচ্ছিলেন তাদের দেখে একবারও মনে হয়নি এর আগে ১৬৯ ওভার ফিল্ডিং করার পর ৬১ ওভার (মোট ২৩০ ওভার) খেলে মাঠ ছাড়ছেন তারা। তাদের ক্লান্ত মুখেও ছিলো আলোর ঝলকানি।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমন দিন আসবে না বলা ঠিক হবে না। তবে এমন দিন আগে কখনও এসেছে বলাটা কঠিন। এই দিনটা শুধু তামিম-ইমরুল না, কোনো ক্রিকেট সমর্থকই ভুলবেন না।
ম্যাচের একদিন বাকি থাকতেই যে ম্যাচে প্রাপ্তি অনেক। তামিম ইকবাল-ইমরুল কায়েসের ওপেনিং জুটিতে ২৭৩ রান, যে কোনো জুটিতেই বাংলাদেশের পক্ষে রেকর্ড। পাঁচ মাস আগে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বশেষ টেস্টের প্রথম ইনিংসে এই দু‘জন মিলে করেছিলেন ২২৪ রান।
২৯৬ রানের ঘাটতিটা এখন মাত্র ২৩ রানের। তাও আবার বিনা উইকেটে।
এর আগে আরও তিনটি দুইশ রানের জুটি আছে বাংলাদেশের। তবে তামিম-ইমরুলের জুটি পেছনে ফেলেছে ২০১৩ সালে শ্রীলংকার বিপক্ষে গল টেস্টে করা মোহাম্মদ আশরাফুল ও মুশফিকুর রহিমের সর্বোচ্চ ২৬৭ রানের জুটিকে।
শুধু জুটির প্রাপ্তি নয়, আছে ব্যক্তিগত প্রাপ্তিও। টানা তিন টেস্টে সেঞ্চুরি করার কৃতিত্ব অজর্ন করেছেন তামিম।এই সেঞ্চুরি দিয়ে দুটি রেকর্ড লেখা হয়েছে তার নামের পাশে। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে টেস্টে টানা তিন সেঞ্চুরির পাশাপাশি টেস্ট সেঞ্চুরিতে বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের মধ্যেও শীর্ষে উঠেছেন তিনি। ৬টি সেঞ্চুরি নিয়ে এতদিন একনম্বরে ছিলেন বাংলাদেশের ‘লিটল মাস্টার’ খ্যাত মোহাম্মদ আশরাফুল।
এরআগে ২০১০ সালে ইংল্যান্ড সফরে লর্ডস ও ওল্ড ট্রাফোর্ডে টানা দুই টেস্টে সেঞ্চুরি করেছিলেন তামিম। তামিম ছাড়া এই কৃতিত্ব আছে আর মাত্র দু’জন বাংলাদেশির। ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় সেঞ্চুরি করেছিলেন মুমিনুল হক এবং গত বছরের নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টানা দুই সেঞ্চুরি করেছিলেন খুলনায় তামিমেরই সেঞ্চুরিয়ান সঙ্গী ইমরুল কায়েস। ওই সিরিজে প্রথমে খুলনায় এবং পড়ে চট্টগ্রামে সেঞ্চুরি করে নিজের টানা দুই সেঞ্চুরির মাইলফলক ছুঁয়েছিলেন তামিম। এবার সেই খুলনায় করলেন টানা তৃতীয়টি।
টানা তিন সেঞ্চুরি করে তামিম এমন সব গ্রেটদের পাশে নাম লিখিয়েছেন যা নিয়ে গর্ব করতে পারবেন সারাজীবন। কারণ এই তালিকায় যে আছেন এই ম্যাচেরই আরেক সেঞ্চুরিয়ান পাকিস্তানের মোহাম্মদ হাফিজ, গ্যারি সোবার্স, ভিভ রিচাডর্স, জ্যাক হবস, সুনীল গাভাস্কার, ডেনিস কম্পটন, জহির আব্বাস, মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন, মার্ক টেলর, গ্রাহাম গুচ, ডেভিড বুন, ব্রায়ান লারা, হার্বাট সাটক্লিফ, ওয়ালি হ্যামন্ড, মাহেলা জয়বর্ধনে, কুমার সাঙ্গাকারা, মারভান আতাপাত্তু, অরবিন্দ ডি সিলভা ও গ্রাহাম স্মিথরা।
এখানেই থেমে থাকা নয়, ১৩৮ রানে অপরাজিত তামিম। তার সামনে সুযোগ আছে আরো অনেক রেকর্ড গড়ার। প্রথম সুযোগ দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে ডাবল সেঞ্চুরি করার। পঞ্চম দিনে সেটা করতে পারলে মুশফিকুর রহিমের পাশে নাম লেখাবেন তিনি। ২০১৩ সালে গল টেস্টে শ্রীলংকার বিপক্ষে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন মুশফিক। যেটা এখনো অটুট।
এছাড়া পাকিস্তানের বিপক্ষে এই সিরিজে আরো একটি টেস্ট ম্যাচ আছে। সেই ম্যাচে সেঞ্চুরি করতে পারলে তামিম চলে যাবেন সেই ১৩ জনের কাতারে যারা টানা চার টেস্টে সেঞ্চুরি করে রেকর্ড বুকে জায়গা করে নিয়েছেন। এই তালিকায় আছেন ডন ব্র্যাডম্যান, শচিন টেন্ডুলকার, উইকস, সুনীল গাভাস্কার, রাহুল দ্রাবিড়, কুমার সাঙ্গাকার, গ্রাহাম স্মিথ ও জ্যাক ক্যালিসের মতো গ্রেটরা। টানা চার টেস্টে দুবার করে সেঞ্চুরি করেছেন ব্র্যাডম্যান, ম্যাথু হেইডেন ও বেরিংটন।
তামিমের চোখ থাকবে টানা পাঁচ টেস্টে সেঞ্চুরি করা জ্যাক ক্যালিস, মোহাম্মদ ইউনুফ ও গৌতম গম্ভীরের রেকর্ডের দিকে। টাইগার ওপেনার হয়তো পাখির চোখ করবেন ৭৭ বছর আগে গড়া ব্র্যাডম্যানের টানা ছয় টেস্টে করা রেকর্ডের দিকেও।
অপর দিকে যে ইমরুলকে দলে নেওয়া নিয়ে ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে কোচ চন্দ্রিকা হাতুরেসিংকে। সেই ইমরুল বুঝিয়ে দিলেন সাদা পোশাকে কতাটা পারদর্শী তিনি। প্রথম ইনিংসে ৫১ রান করা পর দ্বিতীয় ইনিংসে তুলে নেন সেঞ্চুরি। ক্যারিয়ারের সেরা ১৩২ রানের ইনিংস অপরাজিত আছেন তিনি। মুশফিকের ডাবল সেঞ্চুরির দিকে ইমরুলও যে চোখ রাখবেন সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
টেস্ট ক্রিকেটে ওভার প্রতি সাড়ে চার করে রান তুলেছে বাংলাদেশ। মোট রানের ১৫৪ এসেছে বাউন্ডারি থেকে।২৮টি চার ও সাতটি ছক্কা হাঁকিয়েছেন তামিম-ইমরুল। পাকিস্তানি ফিল্ডাররা অর্ধেক ক্লান্ত হয়েছেন বাউন্ডারির বল কুড়াতে কুড়াতে।
কে বলে টেস্ট ক্রিকেট মরে গেছে। কে বলে টেস্ট ক্রিকেট দেখলে গায়ের লোম খাড়া হয় না। শুক্রবার তামিম-ইমরুল যা করে দেখালেন, তাতে মনে হয় কোনো কোনো দিন জেতে দেশ, কোনো কোনো দিন জেতে ব্যক্তি, আর নির্দিষ্ট দিনে জেতে খেলাটা। টেস্টের পঞ্চম দিনে একই সঙ্গে তিনটি বিভাগিই জয় চাই আমরা।







