দেশ কী চায়, ভক্তরা কী চায়, সতীর্থরা কী চায়, মন কী চায়- তা তিনি জানেন। অনেক নিন্দুকই আবার বলেন, ‘দেশের জার্সি গায়ে কবে কী করল? যত কারিকুরি তো ক্লাবের হয়েই’। কিন্তু বাস্তব যে তা নয় সেটি লিওনেল মেসির চেয়ে ভাল কেউ জানেন না।
বারবার সবটুকু করেও, সব পাওয়া হচ্ছিল না। কোথায় যেন আটকে যাচ্ছিল সব। আর নিন্দুকের দল হাসির রোল তুলছিল। যেন মেসি ব্যর্থ হয়েছে বলেই এত সুখ! চোখের জলে ভেসেছে বলেই এত শান্তি! তাকে ক্ষত–বিক্ষত দেখলেই যত উল্লাস! অবশেষে সেই সব না পাওয়া, পাওয়ায় পরিণত একটা হল।
হয়ত বিশ্বকাপ ট্রফি নয়, আর্জেন্টিনাকে কেবল বিশ্বকাপের টিকিটটা এনে দিতে পেরেই তিনিও কতটা স্বস্তি পেয়েছেন, পরিষ্কার হয়ে গেল মেসির কথাতেই। ২০১৬’র নভেম্বরের পর থেকে মেসি আর তার সতীর্থরা মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলেননি। এদিন বললেন। প্রাণ খুলে বললেন ক্ষুদে জাদুকরও, ‘ইকুয়েডরে খেলতে আসার আগে ভয় কাজ করে। সব সময়। কিন্তু আমরা লাকি। তাই ঠিক সময়ে জ্বলে উঠেছি। আমরা শান্ত ছিলাম, স্থির ছিলাম। আমরা গোল করেছি। যে গোলের লক্ষ্যটা নিয়েই এসেছিলাম এখানে(কিটো)। বলতে পারেন, কাজের কাজটা করতে পেরেছি।’
কয়েক সেকেন্ডের বিরতির পর আবার শুরু, ‘বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা নেই? তেমনটা হলে, পাগলামি বলতে হত। এই দলের ক্ষমতা আছে বিশ্বকাপে খেলার। আমরা তিন–তিনটে বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে ওঠার পরও সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে! জানেন, আমরা মিডিয়ার থেকে, সাধারণ মানুষের থেকে ইচ্ছে করেই দূরে ছিলাম। এই দূরত্বটাই আমাদের, মানে আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের কাছাকাছি এনেছে।’
শুধু বাছাইপর্ব নয় মেসি কথা বলেছেন সামনের সময়গুলোর পানে তাকিয়েও, ‘বিশ্বাস করি, এভাবে হাতে–হাত রেখে যদি এগোতে পারি, তাহলে আমাদের সব কাজ সহজ হয়ে যাবে। দু’দুটো কোপা আমেরিকা আর বিশ্বকাপ ফাইনালে আমাদের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা একেবারেই ঠিক হয়নি। আশা রাখছি, এবার আমরা অন্তত কাপটা হাতে নিতে পারব। নিজেদের জন্যই ওই কাপটা হাতে নিতে চাই। যোগ্যতা পর্বটা উপভোগ করেছি। আমাদের দল প্রতিদিন তৈরি হবে। প্রতিদিন বড় হবে। দলটা বদলাবেই। বিশ্বকাপে অন্য এক আর্জেন্টিনাকে দেখবেন। এই আর্জেন্টিনা আরও আরও উন্নত হবে।’
মেসি যখন এমন কথা বললেন, তখন কোচ সাম্পাওলিও লুকিয়ে রাখতে পারেনি আবেগ। সেই আবেগের মুহূর্তে কণ্ঠে ভাসল, ‘জানেন, ছেলেদের কী বলেছি? মেসি আমাদের বিশ্বকাপে নিয়ে যায়নি, ফুটবলই মেসিকে নিয়ে গেছে বিশ্বকাপে। বিশ্বকাপ জেতাতেই হবে, আর্জেন্টিনার কাছে মেসির এমন কোনও দায় নেই। বরং ফুটবলের কাছে মেসির একটি বিশ্বকাপ পাওনা। ফুটবলই মেসির কাছে দেনাদার। মেসির বিশ্বকাপ জেতা উচিত ফুটবলের জন্যই! আমরা লাকি, বিশ্বের সেরা ফুটবলার মেসির দেশ আর্জেন্টিনা। তার নিকটবর্তী হতে পেরে আমি সত্যিই উদ্দীপ্ত।’
মেসিকে ছাড়া বিশ্বকাপ? সেটা আবার হয় নাকি! সাম্পাওলিরও সেটা ভাবলে গা শিউরে উঠত, ‘ফুটবল বলুন আর বিশ্বকাপ— মেসি ছাড়া কল্পনাই করা যায় না। আমাদের একথা মাথায় নিয়েই খেলতে নামতে হয়েছিল। এই যোগ্যতা পর্ব, এই ভয়ঙ্কর চাপ, আমার দলকে আরও শক্তিশালী করে দিয়ে গেল। বিশ্বকাপে মেসিকে সাহায্য করার আরও একবার সুযোগ পাব আমরা। সেই সুযোগটা ষোলো আনাই কাজে লাগাতে চায় ফুটবলাররা।’
মেসি নিজে যখন কথা বলেছেন, কোচ প্রশংসায় ভাসিয়ে চলেছেন, তখন নীরব থাকতে পারেননি সতীর্থ পাওলো দিবালাও। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা সত্ত্বেও সাইডলাইনে বসে থাকতে হয়েছে তাকে। কিন্তু তাতে কোনও দুঃখ নেই। বরং এমন মেসিকে কাছ থেকে দেখতে পেরেই নিজেকে ‘ভাগ্যবান’ মনে করছেন জুভেন্টাস তারকা।
টুইটারে দিবালা লিখেছেন, ‘এত কাছ থেকে মেসির ম্যাজিক দেখতে পেরেই নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি।’







