পৃথিবীব্যাপী আন্তর্জাতিক অপরাধ কিংবা মানবতাবিরোধী ট্রাইব্যুনালগুলো নিয়ে যারা নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখেন তারা রুয়ান্ডা ট্রায়ালের নাম শুনেছেন। রুয়ান্ডায় সংগঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার জন্যই এই ট্রাইব্যুনালটি গঠন করা হয়েছিলো জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে।
ধর্ষণ মানবতাবিরোধী অপরাধ কি না সেটা নিয়ে এক সময় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনের জগতে একটা বিতর্ক ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে ধর্ষণগুলো হয়েছিলো সেগুলোকে আমরা বলি জেনোসাইডাল রেপ। জোনোসাইডাল রেপের সাথে গণহত্যার সম্পর্ক রয়েছে কি না আর আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সংগঠিত ধর্ষণ জেনসাইডাল রেপের আওতায় পড়বে কি না সেটা নিয়েও দীর্ঘদিন বিতর্ক চলেছে। আমাদের বুঝতে হবে যুদ্ধকালীন সকল ধর্ষণই গণহত্যার সাথে সম্পর্কিত নয়। যদি ধর্ষণের সাথে কোনো একটি গোষ্ঠীকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টা থাকে অর্থাৎ গণহত্যার যেসব উপাদান জরুরি তা যদি ধর্ষণের মাধ্যমে করা হয় সেটাই জেনোসাইডাল রেপ।
এই জেনোসাইডাল রেপ বিষয়টি প্রথম আলোচিত হয় রুয়ান্ডার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়। মেয়র আকায়েসু (Akayesu) মামলায় প্রথমবারের মতো গণহত্যার সাথে ধর্ষণের যোগসূত্র স্থাপিত হয়। আকায়েসু নামক ব্যক্তিটি রুয়ান্ডার একটি কমিউনিটি টাবার মেয়র ছিলেন। তার বিরুদ্ধে গণহত্যা এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়। ১৯৯৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর International Criminal Tribunal for Rwanda- ICTR আকায়েসুর বিরুদ্ধে রায় দেয়।
আকায়েসুর মামলাটি বিখ্যাত কারণ এটিই প্রথম রায় যেখানে গণহত্যা বিচার হয়েছে, যে গণহত্যার সাথে যৌন নির্যাতনের সম্পর্ক আছে। পাশাপাশি এই মামলার রায়ে ধর্ষণ এবং যৌন নির্যাতনের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

আমাদের দেশে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায়ে তাকে মধুসূদন ঘরামীর স্ত্রী শেফালী ঘরামীকে ধর্ষণের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আমাদের ট্রায়ালে সেটাই প্রথম কোনো যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে সরাসরি ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হয় এই মামলায়। আর এই রায়ের সাথেই রেফারেন্স হিসেবে রুয়ান্ডা ট্রায়ালের আকায়েসুর রায়টি জুড়ে দেয়া হয়। ফলশ্রুতিতে আমার পক্ষে আকায়েসুর রায়টি পড়ে গণহত্যার সাথে ধর্ষণকে কেন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয় তা জানার কিঞ্চিত সুযোগ হয়েছে। আগ্রহী কেউ চাইলে মেয়র আকায়েসুর. রায়টি সহজেই অনলাইন থেকে সংগ্রহ করে পড়ে ফেলতে পারেন। এমনকি সাঈদীর রায়টিও আমাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ওয়েবসাইট থেকে নামিয়ে পড়ে যাচাই করে দেখতে পারেন।
আসুন একটু বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনের খতিয়ান দেখি। আমরা খুঁজে দেখি ১৯৭১ সালে আমাদের মা-বোনদের ওপর যে নির্যাতন চলেছিল সেটাকে কি জেনসাইডাল রেপ বলা যাবে কি না।
বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে অবশ্যই জেনোসাইডাল রেপ সংঘটিত হয়েছিল। এনবিসি নিউজ ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি একটি রিপোর্ট করে যাতে জানা যায় ১৩ বছরের মেয়েরাও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। পাকিস্তানী সেনাদের স্থানীয় সহযোগী, রাজাকার এবং আল বদর বাহিনী বিশেষত হিন্দু জনগোষ্ঠীকে নির্যাতনের জন্য ধর্ষণ করতো। বীনা ডি কস্তা লিখেছেন-
“The Pakistan Army’s local militia, known as the Razakaar and al-Badr, used rape to terrorise, in particular the Hindu population, and to gain access to its land and property.”
১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত দৈনিক বাংলার বাণী’র গণহত্যা বিষয়ক বিশেষ সংখ্যা থেকে জানা যায়, দুই থেকে আড়াই লাখের পরিসংখ্যানটি সে সময়ের সরকারি কর্মকর্তারা অনুমানের ভিত্তিতে তৈরি করেছেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী সারাদেশের ৪৮০টি থানার ২৭০টিই পাকিস্তানী সেনাদের দখলে ছিল। প্রতিদিন গড়ে ২ জন করে নিখোঁজ মহিলার হিসাব অনুযায়ী লাঞ্ছিত মহিলার সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখ।

অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক ডা. জিওফ্রে ডেভিস দেশজুড়ে তার চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতায় এবং উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় চালানো নমুনা জরিপের মাধ্যমে পরিসংখ্যান তৈরি করে জানান, ৪ লাখ থেকে ৪ লাখ ৩০ হাজার নারী মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তিনি আরো জানান, অন্তঃসত্ত্বা মহিলার সংখ্যাই ২ লাখ।
সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত গবেষণায় দু’লাখ, তিন লাখ ও চার লাখ- এরকম তিনটি পরিসংখ্যানের উল্লেখ রয়েছে। সুসান ব্রাউনমিলার এ সংখ্যাটিকে প্রায় চার লাখ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন-
“During the nine-month terror, terminated by the two week armed intervention of India, a possible three million people lost their lives, ten millions fled across the border to India and 200,000, 300,000 or possible 400,000 women (three sets of statistics have been variously quoted) were raped. Eighty percent of the raped women were Moslems, reflecting the population of Bangladesh, but Hindu and Christian women were not exempt.”
ওয়ারক্রাইম ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি একাত্তরের নারী নির্যাতনের একটি সামগ্রিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। এই গবেষণা থেকে জানা যায়-
১. স্পট ধর্ষণ, স্পট গণধর্ষণ ও বন্দী নির্যাতিতার সম্মিলিত সংখ্যা চার লাখ আটষট্টি হাজার (স্পট ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার প্রায় তিন লাখ এবং বিভিন্নভাবে পাকিস্তানীদের নিকট বন্দী নির্যাতিত নারী এক লাখ চল্লিশ হাজার চারশ’ নারী)।
২. চিহ্নিত স্থানে নির্যাতিতা নিহত ও অপহৃতসহ স্পট ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার- তিন লাখ ষাট হাজার। এদের মধ্যে শুধুমাত্র স্পট ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার প্রায় তিন লাখ সাতাশ হাজার যা মোট নির্যাতিতার সত্তরভাগ। এদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন প্রায় ত্রিশভাগ অর্থাৎ এক লাখ আট হাজার নারী।
৩. নির্যাতিত বন্দী নারী প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার (এক লাখ চল্লিশ হাজার চারশ’) যা মোট নির্যাতিতার প্রায় ত্রিশভাগ। এরমধ্যে কারাগার, ক্যাম্প, বাঙ্কার প্রভৃতি স্থানে নির্যাতিতার সংখ্যা মোট নির্যাতিদের প্রায় আঠারভাগ।
এছাড়াও বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট, মার্শাল ল’ আদালত এবং শহর ও গ্রামাঞ্চলের বাড়িঘর, অফিস আদালত, হোটেল, বিনোদন কেন্দ্র প্রভৃতি স্থানে নির্যাতিত হন বারোভাগ (ক্যাটাগরি দুই-শতকরা পাঁচভাগ এবং ক্যাটাগরি তিন-সাতভাগ)।
৪. বন্দী নির্যাতিত নারীদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা আশিভাগ অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ছিয়াশি হাজার। এদের মধ্যে চল্লিশভাগকে হত্যা করা হয়েছে অথবা তারা নিজেরাই আত্মহত্যা করেছেন।
অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক ড. জিওফ্রে ডেভিস বলেছেন, পৌনঃপুনিক লালসা চরিতার্থ করবার জন্য হানাদারবাহিনী অনেক তরুণীকে ধরে তাদের শিবিরে নিয়ে যায়। এসব তরুণীদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা হবার লক্ষণ কিংবা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে হয় তাদেরকে পরিত্যাগ করা হয়েছে নয়তো হত্যা করা হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় বারো ও তেরো বছরের বালিকাদের শাড়ি খুলে নগ্ন অবস্থায় রেখে ধর্ষণ করা হয়েছে যাতে তারা পালিয়ে যেতে অথবা আত্মহত্যা করতে না পারে।

সুসান ব্রাউনমিলার তার Against Our Will: Men, Women and Rape বইয়ে লিখেছেন-
“Rape in Bangladesh had hardly been restricted to beauty. Girls of eight and grandmothers of seventy-five had been sexually assaulted during the nine-month repression. Pakistani soldiers had not only violated Bengali women on the spot; they abducted tens of hundreds and held them by force in their military barracks for nightly use. The women were kept naked to prevent their escape.”
উপরের আলোচনা থেকে নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন ধর্ষণগুলো আর দশটা সাধারণ ধর্ষণ ছিল না। সেটা ছিল এই জাতিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার একটা অস্ত্র। এই লেখাটি প্রস্তুত করতে সর্বাধিক সহায়তা পেয়েছি একরামুল হক শামীমের ‘একাত্তরে নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ’ প্রবন্ধ থেকে এবং মুক্তিযুদ্ধ গবেষক অমি রহমান পিয়াল-এর একাধিক লেখনী থেকে। তাদের দু’জনের প্রতিই রইল অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে গভীর কৃতজ্ঞতা।
সুত্রঃ
১. Against Our Will : Men, Women and Rape; Susan Brownmiller; Page 81
২. একাত্তরে নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ; একরামুল হক শামীম
৩. যুদ্ধ ও নারী; ডা. এম এ হাসান, পৃ ২৭-২৮
৪. ড. জেফ্রি ডেভিস যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের স্বেচ্ছাসেবী একজন ডাক্তার, বীণা ডি কস্তা, যুদ্ধাপরাধ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, পৃষ্টা ৪৯-৫০
৫. Bangladesh’s erased past; Bina D’costa
৬. সেইসব বীরাঙ্গনা ও তাদের না-পাক শরীর; ফারুক ওয়াসিফ
৮. মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীর সংখ্যা কতো?; শামীমা বিনতে রহমান, ভোরের কাগজ, ১৭ মে ২০০২
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







