পৃথিবীব্যাপী বাড়ছে ক্যান্সারসহ নানা দুরারোগ্য ব্যাধির সংখ্যা। তা মোকাবেলায় উন্নততর হচ্ছে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যবহৃত প্রযুক্তিও। বাড়ছে খরচ। কিন্তু সবার পক্ষে এ খরচ বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণে তাই বাধ্য হচ্ছেন অনেকেই। কিন্তু অর্থের অভাবে মানুষের মৃত্যু কাম্য নয় কোনভাবেই। যুদ্ধ, জঙ্গিবাদ ও বিলাসিতার নামে একদিকে চলছে হাজার হাজার কোটি টাকার খেলা, অন্যদিকে অর্থাভাবে চলছে চিকিৎসাহীন মৃত্যুর মিছিল। বিজ্ঞান আর সভ্যতার চরম উৎকর্ষের যুগে মানবতার এ যেন এক নিদারুণ পরাজয়!
এমন সব মানুষ যারা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েও প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না তাদের পাশে দাঁড়াতে জন্ম নিয়েছে দাতব্য সংস্থা ‘সঞ্জীবন-জীবনের জন্য’। অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় মরবে না আর কেউ’ প্রত্যয়ে একদল পেশাজীবীর উদ্যোগে গঠিত সংস্থাটি যাত্রা শুরু করেছে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন।
“হাতখানি ওই বাড়িয়ে আনো, দাও গো আমার হাতে- ধরব তারে, ভরব তারে, রাখব তারে সাথে’’ আহ্বানে এরই মধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে সংস্থাটি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী গত তিনদিনেই এর সদস্য সংখ্যা অর্ধশত ছাড়িয়েছে। আগ্রহ দেখাচ্ছেন আরও অনেকেই।
সংস্থাটির মূল উদ্যোক্তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (যুগ্ম জেলা জজ) কেশব রায় চৌধুরী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, দুরারোগ্য ব্যাধির হার ক্রমশ যেভাবে বাড়ছে তাতে যেকোন সময় আক্রান্ত হতে পারে যে কেউ। সেই আশঙ্কা মোকাবেলায় প্রয়োজন নিজস্ব একটা সংগঠন ও একটা স্থায়ী তহবিলের। যাতে আপদকালীন সহায়তাটা আমরা নিজেরাই সংকুলান করতে পারি কিংবা প্রয়োজনে সমন্বিত উপায়ে এই জাতীয় যে-কোনো মানবিক আন্দোলন করা যায়। সে চিন্তা থেকেই গড়ে উঠেছে আমাদের এ সংগঠন।
সংস্থাটির সার্বিক দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে যারা কোনো সংগঠন কিংবা সুনির্দিষ্ট একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দাতব্য কাজে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক এবং যারা নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের তাগিদে একটা আর্থিক নিরাপত্তা বলয়ের অংশীদার হতে আগ্রহী তারা যে-কেউ এই সংগঠনের সদস্য হতে পারেন। অর্থের অভাবে কোনো স্বজনকে যেন দুরারোগ্য ব্যাধির কাছে হারতে না নয় সে প্রত্যয়েই আমরা কাজ করে যাবো।’
যে প্রেক্ষাপটে সংস্থাটির জন্ম:
উদ্যোক্তারা জানান, দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্তদের স্বজন কিংবা শুভাকাঙ্খীদের আর্থিক সাহায্য চেয়ে স্বচ্ছল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। আবার এই সকল ক্ষেত্রে নিয়মিত সহায়তা করার মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও সীমিত। ইদানিং যে হারে এই সব রোগ-ব্যাধি সনাক্ত হচ্ছে তাতে কারও কাছে বারবার দ্বারস্থ হওয়াও খুব বিব্রতকর। তাছাড়া ক্যাম্পাস কিংবা জনসমাগম স্থানে দলবেঁধে সাহায্য চেয়ে সংগ্রহ হয় প্রয়োজনের একেবারেই নামমাত্র অর্থ। সাম্প্রতিককালে একাধিক বিচারকসহ কয়েকজন ক্যানসারাক্রান্তের চিকিৎসা-তহবিল সংগ্রহ করতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের লব্ধ অভিজ্ঞতা থেকেই তাদের ভাবনার ফসল দাতব্য সংগঠন “সঞ্জীবন- জীবনের জন্য’’।
যারা সদস্য হতে পারবেন
বিচারক ও আইনজীবীদের প্রাধান্য থাকলেও সমমনা যে কারোরই সাধারণ সদস্য হওয়ার সুযোগ থাকছে সংগঠনটিতে। থাকছে বিশেষ সদস্যও। সাধারণ সদস্যদের মাসিক অনুদানের হার এক হাজার টাকা আর বিশেষ সদস্যদের ক্ষেত্রে এই অনুদানের হার ন্যূনতম পাঁচ হাজার টাকা। সদস্যদের প্রদত্ত টাকা একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক-একাউন্টে গচ্ছিত থাকবে।
প্রাথমিকভাবে এক হাজার টাকা অনুদান প্রদানের মাধ্যমে সংগঠনটির সদস্য হতে পারবেন যে-কেউ। চলতি ইংরেজি বছরের যেকোনো সময় সদস্য হওয়া যাবে, সেক্ষেত্রে চলমান এপ্রিল মাস থেকে পূর্ববর্তী মাসগুলোর টাকা এককালীন প্রদান করতে হবে। তবে চলতি বছরের পর আর সাধারণ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ থাকবে না বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
যারা সহায়তা পাবেন
সদস্যদের যে-কেউ কিংবা পরিবারের (প্রধানত স্বামী/স্ত্রী ও সন্তানসন্ততি) কেউ কোন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে ওই সদস্য যদি তার চিকিৎসা ব্যয় বহনে আর্থিকভাবে অক্ষম হন তবে তিনি সহায়তা পাবেন। সেক্ষেত্রে আবেদন সাপেক্ষে সংগঠনের আর্থিক সামর্থ্য এবং প্রয়োজন মোতাবেক সংগঠনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।তবে সংগঠনের বিকাশের স্বার্থে প্রথম বছর সংস্থাটির তহবিল থেকে কাউকে কোনো প্রকার সহায়তা দেওয়া হবে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রাথমিক নীতিমালায়।
যেভাবে পরিচালিত হবে সংস্থাটি
প্রাথমিক পরিকল্পনা মতে, এই তহবিল পরিচালনায় গতানুগতিক কোনো কমিটি বা সভাপতি/সেক্রেটারি থাকবে না। সংস্থাটির কার্যক্রম পরিচালিত হবে পাঁচ বা ততোধিক উপযুক্ত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি ট্রাস্টি বোর্ডের অধীনে। যার মেয়াদ হবে দুই বছর। এই বোর্ডের অনুমোদনক্রমে যেকোনো গ্রহণযোগ্য বহিঃ অনুদান গ্রহণ ও আর্থিক সহায়তার পরিমাণ নির্ধারণসহ সার্বিক বিষয়াদি নির্ধারিত হবে।
একজন মেম্বার-সেক্রেটারি দ্বারা পরিচালিত সংস্থার নিজস্ব ফেসবুক-পেজ বা গ্রুপে সদস্যদের তালিকা, সংগৃহীত অর্থ ও সঞ্চিতির সর্বশেষ পরিমাণ এবং আবেদন ও সহায়তার সার্বিক বিষয়াদি প্রতিনিয়ত আপডেট করা হবে বলে জানানো হয়েছে উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে। ইতোমধ্যেই ফেসবুকে খোলা হয়েছে “সঞ্জীবন- জীবনের জন্য’ নামক পেজ।








