শারীরিকভাবে সুস্থ থাকলেও ব্যাপক মানসিক চাপের মধ্যে আছেন জাপানে বসবাসকারী বাংলাদেশীরা। বিশেষ করে উৎকণ্ঠায় আছেন জাপানের কুমামোটোবাসীরা। দফায় দফায় ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশী হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও ভয়ার্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন তারা।
ভূমিকম্পের উৎপত্তি মূলত জাপানের কুমামোটো ও কিয়ুশুতে। ৩.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে ১৩৭ বার, ৫ মাত্রার ভূমিকম্প ১৪ বার, ৬ মাত্রার ৩ বার এবং সর্বোচ্চ ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে ১ বার। কুমামোটো থেকে প্রায় ১শ’ কিলোমিটার দূরে নাগাসাকি। সেখানেও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ভূমিকম্প।
পিএইচডি করার কাজে নাগাসাকিতে স্বামীসহ আছেন বাংলাদেশের আকলিমা খাতুন মৌসুমী। ভূমিকম্পের মাঝে কী অবস্থায় আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্প কত বড় হয়েছে, এই দুইদিনে কতশত বার কাঁপুনি হয়েছে গুগল চাচ্চুকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিন। আমরা কেমন আছি সেটা শোনেন।’
কিউশুতে কতোজন বাংলাদেশী আছেন সে সম্পর্কে তারা বা বাংলাদেশ দূতাবাস কেউই নিশ্চিত নন বলে জানান মৌসুমী। তবে নাগাসাকিতে ১৮ ও ফুকুওকাতে ১শ’ বাঙালি নিজ নিজ বাড়িতে আছেন। এছাড়া কুমামোটোতে ৬০ জন এবং অইতা/বেপ্পুতে আছেন ৭০ জন বাংলাদেশী বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান
নিয়েছেন।
মৌসুমীর স্বামী খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আব্দুল হাসিবও পিএইচডি করতে আছেন নাগাসাকিতে। তিনি জানান, ‘ভূমিকম্প সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে কুমামোটো শহরে। এখানে তেমন ক্ষয়ক্ষতি নেই। তবে ঘুমাতে পারছি না। কিছুক্ষণ পর পর মোবাইল ফোন জাপানি ভাষায় ‘ভূমিকম্প!! ভূমিকম্প!!’ করে এলার্ট দেয়, আর আমরা সবাই হুলস্থূল করে বের হই। কয়েক সেকেন্ড পর শুরু হয় কাঁপুনি। অনেকটা বজ্রপাতের মতো। প্রথম ঝিলিক, তারপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আওয়াজ।’
কুমামোটো ইউনিভার্সিটিতে বাংলাদেশীদের জন্য ৩ টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নেয়া কেউ শারীরিকভাবে আহত হননি। কারো বাসার দেয়াল ভেঙ্গেছে। কাত হয়ে গেছে। কখন আর একটা বড় ভূমিকম্প হবে এই সংশয়ে কারো ঘুম নেই। সবাই এখন আছেন শেল্টার হাউসে।
শেল্টার হাউস হিসেবে সাধারণত স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামকেই ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানান মৌসুমী। কারণ ভবনগুলো ভূমিকম্পের কথা ভেবে তুলনামূলক বেশি মজবুত করে নির্মাণ করা হয়। কয়েকশ’ মানুষ সেগুলোর ফ্লোরে বসতে পারেন। শুতে পারেন। বড় টিভি স্ক্রিন থাকে। টয়লেটের ব্যবস্থা আছে।
কুমামোটোর সঙ্গে প্লেন, ট্রেন, দূর পাল্লার বাস – সব যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। নিজস্ব গাড়ি ছাড়া সেখানে বের হবার উপায় নেই। তবে ভূমিকম্প কবলিত এলাকাগুলোতে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট চালু আছে। ৩ টি মোবাইল ফোন কোম্পানি ফ্রি ইন্টারনেট সেবা দিচ্ছে।
নাগাসাকিতে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস সবই আছে এখনো। তবে কুমামোটোতে বিদ্যুৎ থাকলেও গ্যাস-পানি নেই। তাই সমস্যা হচ্ছে টয়লেট নিয়ে। পানির অভাবে টয়লেট ফ্লাশ হচ্ছে না, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এলাকাগুলোতে রেস্টুরেন্ট ও সুপার মার্কেট বন্ধ রয়েছে। মুদির দোকানগুলোতে খাবার কম। শিগগিরই হয়তো জাপান সরকার খাবার পাঠাবে বলে আশা করছে সেখানকার অধিবাসীরা।
আব্দুল হাসিব জানান, শনিবার রাত সাড়ে ৮ টার দিকে তীব্র বৃষ্টি শুরু হয়। রাত বাড়তেই শুরু হয় ঝড়। ঝড়-বৃষ্টিতে কুমামোটোতে ভূমিধস হয়ে কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছে। তবে এখন তেমন ঠাণ্ডা বা গরম নেই। তাপমাত্রা সবখানে মোটামুটি ১৭-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সুন্দর আবহাওয়া।
বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে স্থানীয় বাংলাদেশীদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হয়েছে। এতে তারা অনেকটা সাহস পাচ্ছেন। সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন তারা।








