রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। আজ যে বন্ধু কাল সে ঘোর শত্রু। আবার শত্রুর শত্রু বন্ধু হতেও বেশি সময় লাগে না। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাচনও হার মানাচ্ছে জাতীয় রাজনীতিকেও। গত ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচনেও দেওয়ান শফিউল আরেফিন টুটুল হটাও আন্দোলনে সোচ্চার ছিলেন মঞ্জুর কাদের এন্ড গং। এবার ফুটবল নির্বাচনে সালাউদ্দিন হটাও আন্দোলনে তারা দুজনই এক পতাকা তলে। ক্রিকেট নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে যারা পাপন-কাদেরদের পিন্ডি চটকেছেন তারাই এখন জয়গান গাইছেন তাদের।
এতোদিন মঞ্জুর কাদেরের প্রধান শত্রু ছিলেন বাফুফের সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদি। লিগ ও টুর্নামেন্ট পরিচালনায় তার স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিবাদে সবচেয়ে সোচ্চার ছিলেন তিনি। এমনকি সালাম মুর্শেদিকে রাজাকার বলতেও ছাড়েননি তিনি। এমনটাও বলেছিলেন সালাম মুর্শেদি স্বাধীনতা বিরোধী বলেই স্বাধীনতা কাপ টুর্নামেন্টে আয়োজন করতে অনীহা তার। শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্লাব টুর্নামেন্ট আয়োজন নিয়ে তার ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে ক্যামেরার সামনেও। জাতির জনকের জ্যেষ্ঠ পুত্রের নামে আয়োজিত সেই টুর্নামেন্টের আয়োজককে আক্রমণ করেছেন স্মাগলার বলে।
নির্বাচনে মুর্শেদিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে নিজেই দাড়িয়ে গিয়েছিলেন শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের সভাপতি। এই পদে প্রার্থী ছিলেন দেওয়ান শফিউল আরেফিন টুটুলও। কিন্তু হঠাৎ করেই নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছেন এই দুজনই। তাদের নাম প্রত্যাহারে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হয়েছেন আব্দুস সালাম মুর্শেদি।

নির্বাচন মার্কেটে শোনা যাচ্ছে মঞ্জুর কাদের, লোকমান ভুঁইয়ারা নাম প্রত্যাহার করেছেন ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক থাকার কারণে। কথা হলো বিষয়টি কি নির্বাচনে দাড়ানোর পরই জেনেছেন তারা? একজন ক্রীড়া সংগঠক যিনি ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম নীতি নির্ধারক হিসেবে কাজ করে আসছেন, তিনি নির্বাচনে অংশ নেয়ার আইন কানুন জানেন না এমনটা ভাবা আসলেই কষ্টকর।
বাফুফে নির্বাচনের এখন মূল আলোচনায় সভাপতি পদটি। টানা টার্ম বাফুফের প্রধান হিসেবে আছেন কাজী সালাউদ্দিন। প্রথমবার যখন তিনি নির্বাচনে অংশ নেন, তখন সবাই আশায় বুক বেধেছিলেন। ক্রিকেটে সাকিব, মুস্তাফিজদের উত্থানের আগ পর্যন্ত ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় তারকা ছিলেন সালাউদ্দিন। তার ক্যারিশমা দিয়ে তিনি মৃতপ্রায় ফুটবলকে জাগিয়ে তুলবেন এমনটা সবারই প্রত্যাশা ছিলো। সরকার তথা প্রধানমন্ত্রীর স্নেহভাজন হওয়ায় তার ওপর প্রত্যাশার পারদটা বেড়েছে বহুগুণে। প্রথম মেয়াদে পেশাদার লিগ মাঠে রাখতে পারলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন ব্যর্থ। দ্বিতীয় মেয়াদে সে ব্যর্থতাগুলো শুধরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েই আবারো নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। যার মধ্যে অন্যতম ছিলো জেলা ফুটবলকে গতিশীল করা। বর্তমানে তার প্রধান শত্রু মঞ্জুর কাদেরের ওপরই দায়িত্ব ছিলো জেলা ফুটবলকে চাঙ্গা করার। জেলা ফুটবল না হওয়ার পেছনে বাফুফে সভাপতি হিসেবে কাজী সালাউদ্দিনের দায় যেমন আছে সেই দায় মঞ্জুর কাদেরের ওপরও বর্তায়।
আট বছরের শাসনামলে পুরোপুরি ব্যার্থ হয়েছেন কাজী সালাউদ্দিন এটা চোখ বন্ধ করেই বলা যায়। তিনি ব্যর্থ না হলে আজ আবারো নির্বাচনে পাশ করার জন্য তাকে চিন্তা করতে হয় না। অন্যরাই তাকে জোর করে সভাপতির চেয়ারে বসিয়ে রাখতো। তার বিপক্ষে সবচেয়ে বড় অভিযোগ আর্থিক অনিয়মের। সালাউদ্দিন যতই প্রেস কনফারেন্স করে দায় অস্বীকার করুক, বাফুফের অ্যাকাউন্ট যে শূন্য সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। তার ফেডারেশনের ব্যর্থতার কালো ছায়া পড়েছে জাতীয় দলের পারফরমেন্সেও। ২০২২ বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন দেখালেও বাস্তবতা হলো বাংলাদেশ জাতীয় দল সাফ ফুটবলেই আট দলের মধ্যে অষ্টম হয়। বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের নামে এবার যে টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়েছে সেটি মান বিচারে কোন শ্রেণীর মধ্যেই পড়ে না। সালাউদ্দিন ও তার ফেডারেশন শুধু ফুটবল ভক্তদেরই নয়, প্রতারণা করেছেন এদেশের সরকার, এদেশের সাধারণ জনগনের সাথেও। এজন্য তাদের শাস্তি হওয়াই উচিৎ।
বাফুফে নির্বাচনে সালাউদ্দিনের প্রতিদ্বন্দ্বী কামরুল আশরাফ খানের সভাপতি প্রার্থী হওয়াটাই অনেকের কাছে এসেছে চমক হয়ে। যতই বলা হোক তিনি নরসিংদী ফুটবলের কাউন্সিলর তাকে এ অঙ্গনে চেনে এমন লোক হাতে গোনা। ফুটবল উন্নয়নে তিনি যে ইশতেহার দিয়েছেন তাতে খুব বেশি নতুনত্ব নেই। ভোট পেতে ধারণা মতোই তিনি জেলা ফুটবলের উন্নয়নে কথা বলেছেন। আসলে এই জেলা ফুটবলের উন্নয়ন একটা নির্বাচনী প্রচারণা মাত্র। এ নিয়ে ৬৪ জেলার ফুটবলার বা সাধারণ মানুষের আশান্বিত হওয়ার মতো খুব বেশি কিছু নেই। ইউরিয়া বা পটাশ যেখান থেকেই টাকা আসুক সেটা ফুটবলের উন্নয়নে কাজে লাগবে না কখনোই। পকেট ভারি হবে শুধু ভোটারদের।
কাজী সালাউদ্দিনের যত ব্যর্থতাই থাকুক তিনি ফুটবলের লোক। খেলোয়াড় সালাউদ্দিন সংগঠক সালাউদ্দিনের ছায়া হতে না পারলেও অন্তত তাকে গালমন্দ করার জন্য কাছে পাওয়া যায়। পোটন সাহেব ব্যর্থ হলে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।

উদাহরণ হাতের কাছেই। সালাউদ্দিন যুগের আগে হারুনুর রশিদ কিংবা এসএ সুলতানের আমলেও ফুটবল ফেডারেশনের ব্যর্থতার কোন কমতি ছিলো না। বরং আঙ্গুল গুনে হিসেব করলে ব্যর্থতার রেসে সুলতানী আমলই হয়তো এগিয়ে থাকবে। আমরা কিন্তু সে সময়ের ব্যর্থতার কথা ভুলে গেছি। ভুলে যাবো তুর্যের ব্যর্থতাও।
হয়তোবা পোটন সাহেবও চার বছর পর অপ্রাপ্তি ঝেড়ে আরো একবার ফুটবল জাগরণের ডাক দেবেন। মঞ্জুর কাদেররা আগের মতোই মামুনুলদের সাইড লাইনে বসিয়ে রাখবেন বছরের পর বছর। অন্যদলে খেলতে গেলে ঠুকে দেবেন মামলা। ফুটবলের গলায় পা রেখে আবারো ঝাঁপিয়ে পড়বেন ফুটবল বাঁচাও আন্দোলনে। শুধু হাহাকার করে মরবে ফুটবল ও এদেশের লাখো ফুটবল ভক্ত।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল
আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







