যাকাতের কাপড় আনতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা প্রায় প্রতি বছরই খবরের শিরোনাম হয়। তবে এবার চট্টগ্রামে পদদলিত হয়ে অন্তত ১০ জন লোকের মৃত্যুর যে ঘটনাটি সংবাদ শিরোনাম হয়েছে, সেটি আরও করুণ। কারণ ওই মানুষগুলো গিয়েছিলেন তাদেরই প্রাণপ্রিয় নেতার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনার জন্য আয়োজিত কুলখানিতে অংশ নিতে। কিন্তু এখন ওই হতভাগ্য মানুষগুলোর জন্যই হয়তো কুলখানির আয়োজন হবে।
কুলখানি বা কারো মৃত্যুর পরে হাজার হাজার মানুষকে দাওয়াত করে খাওয়ানো কতটা ধর্মসম্মত, পণ্ডিতরা তার ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। তবে একজন সাধারণ শিক্ষিত মানুষের পক্ষেও এটা বোঝা কঠিন নয় যে, যাকাতের মতো এই বৃহত্তর আয়োজনের কুলখানির পেছনেও যতটা না ধর্মীয় অনুশাসন কিংবা মৃত ব্যক্তির শান্তি কামনার বিষয়টি থাকে, তার চেয়ে অনেক বেশি কাজ করে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈভব।
তার চেয়ে বড় কথা, যে ব্যক্তির স্মরণে এই কুলখানির আয়োজন করা হয়, এসব আনুষ্ঠানিকতায় তার আত্মা আদৌ কোনো শান্তি পায় কি না? যে ঘটনাটি চট্টগ্রামে ঘটলো, আমরা ধরে নিচ্ছি যে, আয়োজকদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল প্রয়াত নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরীর আত্মার শান্তি কামনার জন্য একটি বড় আয়োজন করা। কিন্তু যে লোকগুলো কুলখানি খেতে এসে পদদলিত হয়ে নিহত হলেন এবং যে পরিবারগুলো তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারালো, তার ক্ষতিপূরণ কি আদৌ সম্ভব হবে? নিহতদের পরিবার প্রতি এক লাখ টাকা সহায়তা কি স্বজনদের মনের ক্ষত দূর করতে পারবে? বরং কুলখানির নামে এতগুলো মানুষের হতাহত হওয়ায় যে সংকটজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, তাতে কি প্রয়াত জননেতা মহিউদ্দিন চৌধুরীর আত্মাও কষ্ট পায়নি?
এই মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের যে নির্মম বাস্তবতার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে তা হলো, কোনো একজন প্রয়াত মানুষের আত্মার শান্তি কামনার জন্য আয়োজিত অনুষ্ঠানে গিয়ে তার জন্য প্রার্থনাটি আসলে মুখ্য বিষয় নয়। মূল বিষয় অনুষ্ঠানের খাওয়া-দাওয়া। সম্প্রতি ঝালকাঠি শহরে মিলাদুন্নবি মাহফিলে হুজুরের মোনাজাত শেষ হওয়ার আগেই বিরিয়ানির প্যাকেট নেয়ার জন্য মানুষের নির্লজ্জ হুড়োহুড়ি দেখে মাইক হাতে নিয়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তা যে ভাষায় মানুষজনকে শান্ত হতে বলছিলেন, তা অত্যন্ত বেদনার। এক প্যাকেটে বিরিয়ানি না খেলে কী হয়? কুলখানিতে গিয়ে মানুষ কী এমন খায়, কতটুকু খায় যার জন্য হাজার হাজার মানুষের ভিড় ঠেলে ওখানে যেতেই হবে?

গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, চট্টগ্রাম সিটির সদ্য প্রয়াত সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর কুলখানির আয়োজন চলছিল ১৪টি স্থানে। এর মধ্যে রীমা কমিউনিটি সেন্টারে মুসলিম ছাড়া অন্য ধর্মের লোকজনের জন্য নির্ধারিত ছিলো। এটা না জেনে অনেক মুসলিমও এখানে ভিড় করেন। অতিরিক্ত ভিড়ে কার আগে কে ঢুকবে এরকম পরিস্থিতিতে হুড়োহুড়ি শুরু হয় এবং মাত্র কয়েক মিনিটে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহারের দাবি, ওই আয়োজনে নিরাপত্তার কমতি ছিল না। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে এই ঘটনা ঘটেছে। তবে মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেছেন, ‘রীমা কমিউনিটি সেন্টারের বাইরে নগরীর আরও ১৩টি কমিউনিটি সেন্টারে মেজবানের আয়োজন করা হয়েছিল। ওইসব সেন্টারের কোথাও বিশৃঙ্খলা হয়নি। কিন্তু রীমা কমিউনিটি সেন্টারে কেন বিশৃঙ্খলা হলো তা এখনও নিশ্চিত নয়। ফলে এটি পরিকল্পিত নাশকতা কি না, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন তদন্ত কমিটি করেছে। হয়তো আরও বিস্তারিত পরে জানা যাবে। তবে আমরা অন্য আরেকটা বিষয়ে নজর দিতে চাই, সেটি হলো যাকাত।
মাইকিং করে যাকাতের শাড়ি লুঙ্গি দেয়ার আয়োজন করে একশ্রেণির ধনী লোক শত শত গরিব মানুষকে ডেকে এনে ধর্ম পালনের নামে প্রতি বছরই, বিশেষ করে রোজার মাসে একটা তামাশা করেন। তাতে প্রায়ই অনেক লোক পদদলিত হয়ে মারা যায়। এবং স্বভাববতই তারা সবাই গরিব মানুষ। প্রশ্ন হলো, এই তরিকায় যাকাত দেয়ার মধ্য দিয়ে ধর্ম চর্চা কতটুকু হয় বা যাকাত দানকারী ব্যক্তি কতটা পুণ্য লাভ করেন? আবার এই জাকাত নিতে এসে যে নিরীহ মানুষগুলো নিহত হয়, সেই মৃত্যুর দায় কেউ নেয় না। ধর্ম চর্চার নামে একশ্রেণির ধনী লোক গরিব মানুষের জীবন নিয়ে যে ছিনিমিনি খেলেন, আজ অবধি তার কোনো শাস্তি হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে স্বচ্ছল মানুষেরা যাকাত হিসেবে যে সম্পদ সমাজের বিত্তহীন ও গরিব মানুষকে দান করেন, তার ফলে সমাজে অভাবি মানুষের সংখ্যা কমে আসবে। কিন্তু যাকাত আনতে গিয়ে যখন গরিব মানুষ পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে মারা যায়, তখন বুঝতে হবে যিনি জাকাত দিচ্ছেন, তার নিয়তে গরমিল আছে। দারিদ্র বিমোচন বা সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করা তার উদ্দেশ্য নয়। বরং তিনি যে অনেক সম্পদের মালিক এবং তিনি যে অন্যান্য আকাম-কুকামের মধ্যে ধর্ম চর্চাটাও করেন, সেই বিষয়টিই মূলত জানান দেয়ার জন্য তারা লোক জড়ো করে কম দামি শাড়ি আর লুঙ্গি দিয়ে যাকাত আদায়ের ব্যর্থ চেষ্টা করেন। এর পেছনে ধনী লোকদের আরেকটি বড় উদ্দেশ্য থাকে, রাজনৈতিক সুবিধা আদায় বা অবস্থান শক্ত করা। অর্থাৎ আমাদের দেশের মানুষ যেহেতু ধর্মভীরু, তাই যে লোক শত শত লোকের মধ্যে যাকাতের শাড়ি লুঙ্গি বা টাকা বিলি করেন, তার প্রতি সমাজের মানুষের একটা ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয় এবং ওই ধনী লোকদের অনেকেই এই ইমেজটা কাজে লাগান তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তি বাড়াতে। অর্থাৎ যাকাত এখানে অনুষঙ্গ মাত্র। তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন।
যাকাত সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা খুব পরিস্কার। আর তা হলো, একটি রাষ্ট্রে এমনভাবে যাকাত আদায় করতে হবে যাতে এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে জাকাত গ্রহণকারীর সংখ্যা কমে আসতে থাকে। ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.) যখন শাসনভার গ্রহণ করেন তখন তিনি যাকাতকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত করেন এবং যাকাত আদায়ের জন্য কর্মচারী নিয়োগ করেন। যাকাতের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ রাষ্ট্রের দুঃস্থ, গরিব ও বেকারদের কল্যানে ব্যয় হত। যাকাতের মাল সংগ্রহ ও বণ্টনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অধিকার ছিল না, রাষ্ট্রই এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করত। মহানবীর পরে খোলাফায়ে রাশেদীনদের আমলেও এ নিয়ম চালু ছিল। আমাদের দেশে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি যাকাত বোর্ড থাকলেও এটি কতটুকু কার্যকর তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এমনকি যাকাত বোর্ডে জমা হওয়া অর্থ বণ্টনে স্বজনপ্রীতি এবং লুটপাটেরও অভিযোগ আছে।
বলাই হয় যে, আপনি যাকাত এমনভাবে দেবেন যাতে করে যিনি যাকাত নিলেন, পরবর্তী বছর তাকে আর যাকাত নিতে না হয়। অর্থাৎ আপনি তাকে এমন পরিমাণ অর্থ দিয়ে সহায়তা করুন যাতে সে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে। আপনার উপরে যদি এক লাখ টাকা যাকাত ফরজ হয় তাহলে ওই টাকা দিয়ে আপনি আপনার কোনো গরিব আত্মীয় বা প্রতিবেশীর সন্তানকে বিদেশে পাঠিয়ে দিন অথবা তাকে একটা ব্যবসা ধরিয়ে দিন, যাতে ওই পরিবারটি বিত্তহীন অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারে। এভাবে প্রতি বছর দেশের ১০ লাখ মানুষ যদি প্রত্যেকে একটি পরিবারের আর্থিক অবস্থা উন্নত করার দায়িত্ব নেন, তাহলে ১০ বছর পরে দেশে যাকাত নেয়ার লোক খুঁজে পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু এরকম পদ্ধতিতে শতকরা একজন ধনী লোকও যাকাত দেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
তবে যাকাত নেয়া বা কুলখানিতে অংশ নিতে গিয়ে চট্টগ্রামে হতাহতের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। আজ চট্টগ্রামে হয়েছে, কাল খুলনায় হবে, পরশু রাজশাহীতে। অর্থাৎ সমস্যাটা আমাদের ধর্মচর্চার পদ্ধতি এবং ধর্মকে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তি জাহিরের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের মধ্যে নিহিত। একজন লোক দুই হাত ভরে ঘুষ খাচ্ছেন, সাধারণ মানুষের ফাইল লালফিতায় বন্দি করে রাখছেন আবার সেই লোকই হয়তো আজান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মসজিদে দৌড় দিচ্ছেন। জুমার নামাজের দিন বেলা পৌনে একটার পরে পাঁচ তলা মসজিদে গিয়েও জায়গা পাওয়া যায় না। জায়নামাজ বা কাগজ বিছিয়ে বসে পড়তে হয় রাস্তায়। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে হাজার হাজার মানুষ নামাজ পড়ছে। মানুষের মনে যদি এতই ধর্মকর্মের বোধ ও চেতনা থাকে, তাহলে সেই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এত দুর্নীতি কী করে থাকে!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







