বিভিন্নভাবে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইতোমধ্যেই যারা জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে তাদেরকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য পুনর্বাসনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে এ ঘোষণা দেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানরাও বিভিন্ন সময়ে এ ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জঙ্গিদমন কতোটা সম্ভব বা আদৌ সম্ভব কি না সে ব্যাপারে প্রাথমিক পর্যায়ে এ উদ্যোগকে প্রশংসা করলেও অনেকেই এর কার্যকারিতা নিয়ে দিয়েছেন ভিন্নমত। এ প্রক্রিয়ায় জঙ্গিদের ফিরে আসার সম্ভাবনা কম বলে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কেউ কেউ আবার বিষয়টিকে স্রেফ লোক দেখানো হিসেবেও উল্লেখ করে প্রয়োজনে শিক্ষাব্যবস্থায় জঙ্গিবাদ বিরোধী কোর্স চালুর পরামর্শ দিয়েছেন।
সাবেক সেনাপ্রধান হারুনুর রশীদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, সরকারের এ উদ্যোগটি ভালো। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় জঙ্গীদের ফিরে আসার সম্ভাবনা কম।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, রাতারাতি কেউ জঙ্গি হয়ে ওঠে না। বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক কারনে ধীরে ধীরে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। তাই সে কারণগুলোকে গবেষণার মাধ্যমে চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
তার মতে, সরকারসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর উচিত একজন মানুষ জঙ্গিবাদে কেনো জড়ায় সে কারণগুলো খুঁজে বের করে কার্যকর গবেষণা করা এবং গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে জঙ্গিদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক নেহাল করিম মনে করেন, এ পুনর্বাসন প্রক্রিয়া মোটেও ফলপ্রসু হবে না। এটা স্রেফ লোক দেখানো।
এতে আসল জঙ্গি কেউ ফিরে আসবে বলে আমি মনে করি না। বরং নকল জঙ্গি সেজে সরকারের কাছের কেউ কেউ এসব সুবিধা নিতে পারে বলে আমার মনে হয়।
তিনি বলেন, জঙ্গিরা একটা নির্দিষ্ট আদর্শে বিশ্বাস করে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়, কোনো আর্থিক কারণে নয়। তাই এই পুনর্বাসন কোন কাজে দেবে বলে মনে হয় না।
এ বিষয়ে পুলিশর সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে এটিকে ভালো উদ্যোগ বলেই আমি মনে করি। কারণ, যেকোনো অপরাধ দমন কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নির্মূল করা সম্ভব নয়। অনেক সময় অপরাধীদের স্বাভাবিক জীবেন ফিরে আসার সুযোগ দিতে হয়। সে দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারের এ উদোগ প্রসংশনীয়।
এক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়ার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, তারা পুনর্বাসন প্রক্রিয়া গ্রহণ করে জঙ্গিবাদ নির্মূলের ব্যাপারে বেশ সফলতা দেখিয়েছেন। আমাদের সরকার প্রয়োজনে তাদের পরামর্শ নিতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক অধ্যাপক ড. মোঃ রফিকুল ইসলাম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, সরকারের পুনর্বাসনের ঘোষণা একটি ভালো উদ্যোগ। তবে এর মাধ্যমে যে জঙ্গিরা ফিরে আসবে সে সম্ভাবণা একেবারেই ক্ষীণ। কারণ জঙ্গিবাদের ব্যাপারটি যত বেশি আর্থিক তার থেকে অনেক বেশি আদর্শিক। আর টাকা-পয়সা বা সুযোগ সুবিধা দিলেই সহজে কারো আদর্শিক অবস্থান পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক সময়ের জঙ্গিবাদী কার্যক্রমের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, গুলশান হামলায় যারা জড়িত ছিলো তাদের কেউ আর্থিক এ পথে আসেনি। তারা সবাই উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা। তারা ধর্মীয় অপব্যাখ্যার খপ্পরে পড়ে আদর্শিক কারণে এ পথে এসেছে। তাই এ আদর্শের জায়গাটা যাতে পরিবর্তন করা যায় সে ব্যাপারে আগে নজর দিতে হবে।
তিনি বলেন, অনেকে ধর্মীয় কুসংস্কারের কারণে জঙ্গিবাদে জড়ায়। কিন্তু কোনো ধর্মই আসলে জঙ্গিবাদকে যে সমর্থন করে না এ ব্যাপারে সবাইকে আরো বেশি সচেতন করতে হবে। ধর্মীয় কুসংস্কারগুলো দূর করার ব্যাপারে প্রয়োজনে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা বিষয়ে কোর্স যুক্ত করা যেতে পারে








