পেডরিনহো ফনসেস্কা একজন আলোকচিত্রী। জোয়াও তার ছোট্ট ছেলে। শৈশবে ব্রাজিলে অন্ধ দেশপ্রেম দেখেছেন ফনসেস্কা। কিন্তু বাবা হিসেবে তিনি চান, তার ছেলেটি একজন নারীবাদী হয়ে বেড়ে উঠুক। প্রোথিত সংস্কৃতির প্রতিপালিত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে জোয়াওকে তিনি কীভাবে সাহায্য করছেন? ফনসেস্কা সে গল্প লিখেছেন বিবিসিতে। অনুবাদ করেছেন জাহাঙ্গীর সুর
পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী, এমন জায়গা থেকে এসেছি আমি। আমার জন্ম ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, দরিদ্র এক এলাকায়। এক সময় এই অঞ্চলে পর্তুগিজ উপনিবেশ ছিল। কর্তৃত্ববাদই ছিল সেই শাসনের মূল ধারণা। এর ঘানি টানতে হয়েছিল আমার গ্রামকেও। শ্বেতাঙ্গ আর সম্পদশালী পুরুষের সংখ্যাই ছিল বেশি। তারা আফ্রিকার মানুষদের দাস বানিয়েছিলো। এবং এভাবেই যেন সম্পর্ক শাসিত হয়, সেই শাসনবিধিও উত্তরাধিকার হিসেবে দিয়ে গিয়েছিলো।
আমরাই শাসনকর্তা এমন এক বোধ নিয়ে বেড়ে ওঠে এই এলাকার পুরুষেরা। তারা ভাবে, সব তাদেরই ভোগযোগ্য, সব তাদেরই অধিকারে, হোক তা জমিজমা কিংবা অন্য কোনো মানুষ। বিশেষ করে নারীরা। তাদের ভাবনা, উপার্জন করে বাড়ির জন্য টাকা নিয়ে আসবে, কোনো আবেগ-অনুরাগ নয় কিন্তু।
এবং নারীদের কাজ ছিল ওই পুরুষদের সেবা করা। কয়েক শতাব্দী পরেও, আমরা একইভাবে বেড়ে উঠেছি। আমরা বুঝেছি, আমরা যা খুশি তা-ই করতে পারি। ধরেই নিয়েছি, নারীরা রয়েছে কেবলই আমাদের সুখ দিতে। এভাবেই, প্রকৃতিবিকৃতি এক চর্চা থেকে আপাদমস্তক পুরুষশাসিত প্রজন্ম তৈরি হয়েছে।
কিন্তু বহুবছর পর, যখন আমার ছেলে জোয়াও জন্ম নিল। আমি উপলব্ধি করলাম, আমিই হতে পারি তার জন্য বদলে যাওয়ার উদাহরণ। শৈশবে যাদের জানতাম, তাদের থেকে আমি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানুষ। সুতরাং সে অন্য পৃথিবীর এক বোধ নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে।
পুরুষেরা এখানে হাত গুটিয়ে থাকে। সবচেয়ে সহজ মানব কাজখানিতেও তারা নাক সিটকায়। যেমন ঘরদোর ঝাড় দেওয়া, বিছানা পাতা, রান্নাবান্না করা, বাসনকোসন ধোওয়া, গাছে জল দেওয়া কিংবা বাজারসদাই করা। তাদের কাজ প্রাতভ্রমণে বেরুনো, ঘরে কিছু পয়সাপাতি নিয়ে আসা। তারা ঘরে ফেরে ঘুমাতে। এবং পরদিন ঠিক একই কাজ করে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই চালচিত্রই চলেছে। এমনকি এখনও। বিশেষত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ব্রাজিলে।
আমি এমনই পরিবেশে বড় হয়েছি। এরকম সমাজব্যবস্থায় আমি অভ্যস্থ ছিলাম। আমার মনে কোনো প্রশ্নই তৈরি হয়নি। কেননা এটা সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেমিশে গিয়েছিল। এটা হলো সেই সংস্কৃতি যেখানে পুরুষ এক ঐতিহাসিক কর্তৃত্ববাদের প্রতীক, যেখানে ধরেই নেওয়া হয় যে, নারীরা কেবল দাসীরূপে সেবা দিবে।
পুরুষের বলার আছে কত্ত কিছু, কিন্তু নারীরা নির্কণ্ঠ, তাদের আবার বলার কী আছেÑ বিশ্বসমাজ নিয়ে এই যে সহজাত কল্পনা, আমার এই ধ্যানধারণা ধাক্কা খেলো যখন আমার প্রথম সন্তান জন্ম নিলো। একজন ব্রাজিলীয় মানুষ হিসেবে পূর্ব-প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাই তার নেওয়ার কথা। কিন্তু আমি তাকে সেটা অনুসরণ করতে দিতে পারি না। আমার বাড়িতে এখন আরেকজন মানুষের বাস। এবং তার এই উপস্থিতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা বয়ে এনেছে। এই পরিবর্তন তার আর আমার দুজনেরই জন্য।
যে আমি আগে কখনোই আমার জীবনে আমার মায়ের কী ভূমিকা তা উপলব্ধি করিনি, সেই আমি তাকে দেখা শুরু করলাম ভিন্নভাবে। মা একাকি আমাকে বড় করে তুলেছেন। পাশাপাশি সব কাজ চালিয়ে গেছেন: সারাটা দিন ব্যস্ত থেকেছেন, একই সঙ্গে সবসময় আমার যত্ন-আত্তি করেছেন। রান্নাবান্না করেছেন, আমাকে আদর-স্নেহও করেছেন। আমার শৈশব ও কৈশোরের ব্যথা-বেদনা লাঘব করেছেন।
অংশীদারিত্ব (পার্টনারশিপ) কতখানি যে রাজনৈতিক ও নৈতিক মাত্রা যোগ করতে পারে এটা আগে কোনোদিনই বুঝতে পারিনি। আমিও যে জেন্ডার সমতা নিয়ে লড়াই করতে পারি, উপলব্ধি করিনি। সেই আমি আবিষ্কার করলাম, নারীদের সক্ষমতা কতখানি। আমার স্ত্রী লুয়াকে বোঝার মধ্য দিয়ে। ঘরের ভেতরে আর বাড়ির বাইরে তার কথা শুনে, নারীদের শক্তি-সম্ভাবনাকে সুরক্ষা দিতে জোয়াও একটা পথ বেছে নিতে পারে। যে পথ আমি বেছে নিতে পারিনি।
আমি বুঝতে পারলাম, সামাজিক লিঙ্গসমতা অর্জন করা ততক্ষণ পর্যন্ত অসম্ভব যতক্ষণ আমাদের শিশুদের শেখানোর বিষয়টি না বদলাচ্ছি। যখন জোয়াওকে আমি আদর-স্নেহ করি, যখন পরিবারের ছোটখাট সব কাজ সারি সব্বাই মিলে (জোয়াও’র দুই ছোট বোন রয়েছে) তখন সে উপলব্ধি করে, মেয়েদের কথা শুনতে হবে। তাদের শরীরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। তখন আমার মনে হয়, এই পৃথিবীটাকে আমরা নতুন জায়গা থেকে দেখতে পারি। আমি কিংবা আমার প্রজন্মের বড় একটা অংশ যেখান থেকে এসেছি, সেখান থেকে নয়। বরং আমরা যেখানে যেতে চাই সেখান থেকে দেখতে হবে বিশ্বটাকে।

জোয়াও কি কখনো পুরুষতান্ত্রিক অভিজ্ঞতার কথা বলেছে? হ্যাঁ। বলেছে যখন সে বিচলিত হয়ে গিয়েছিলো। সে এক ছোট্ট শিশু। কিন্তু সেও পুরুষতান্ত্রিকতার দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে। যেমন সে আমাদের বলেছে, স্কুলে টিফিনের সময় সব ছেলেমেয়ে ফুটবল খেলতে স্কুলমাঠে গিয়েছিলো। যখন তারা সেখানে জড়ো হলো, ছেলেরা মেয়েদের বলল, তারা যেন অন্য কিছু করে। রাতে খাবারের টেবিলে বসে জোয়াও কথাটা আমাদের বলেছিলো। কারণ তার মনে হয়েছিল, ‘কিছু একটা ভুল হয়েছে। কিন্তু ভুলটা কী, তা স্পষ্ট নয়’।
আমরা তার সঙ্গে কথা বললাম। ভুলটা ধরিয়ে দিলাম। বললাম, মেয়েদের কোনটা করা উচিত এ সিদ্ধান্ত দেওয়াটাই একটা ভুল। ফুটবল খেলা যে ‘মেয়েলি বিষয়’ নয়, এই ভাবনাটাও ভুল।
আমরা বলেছি, ও শুনেছে। প্রশ্নও করেছে কতগুলো। এর পরদিন যখন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরল সে। জোয়াও জানাল আগের দিনের আচরণের জন্য স্কুলের ওই মেয়েদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে সে।







