ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে আপত্তিকর কথা বলার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক। তিনি এক সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, ‘হিন্দু সম্প্রদায়কে উদ্দেশ করে মালাউনের বাচ্চা বলেছি—এটা প্রমাণ করতে পারলে আমি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেব।’ জানি না মন্ত্রীর এই চ্যালেঞ্জ কেউ নেবেন কি-না। তেমন তথ্যপ্রমাণ কারও কাছে আছে কি-না। তবে না থাকার আশঙ্কাই বেশি। কারণ মন্ত্রীর মুখ থেকে যে এমন মধুর বচন বের হবে এবং সেটা ধারণ করে রাখলে ভবিষ্যতে কাজে লাগবে-এত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কেউ সেখানে উপস্থিত ছিল বলে মনে হয় না। তবে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী যা কিছু বলেছেন, তা স্রেফ আত্মপক্ষ সমর্থন, আত্ম-সাফাই। নিজের সাফাইয়ের সঙ্গে তিনি স্থানীয় প্রশাসনের অভিযুক্ত দুই কর্তাব্যক্তিরও সাফাই গেয়েছেন। তার কথা শুনে মনে হয়েছে, শুধুই রটনাকারী আর ষড়যন্ত্রকারীরা নাসিরনগরের ঘটনার জন্য দায়ী। বাকি সব ধোঁয়া তুলসীপাতা!
মন্ত্রী মহোদয় সংবাদ সম্মেলন করে নিজের পাপের পরিধিই কেবল বাড়ালেন। প্রথমেই আসা যাক, ‘মালাউন’ প্রসঙ্গে। ঘটনার পর গণমাধ্যম কর্মী ও স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর যে পরিমাণ ক্ষিপ্ত ছিলেন, তাতে করে তার পক্ষে এমন কথা বলা মোটেও অস্বাভাবিক মনে হয় নি। তিনি গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে উন্মত্তের মত আচরণ করেছেন। সেই উন্মত্ততার ভিডিও ক্লিপিংস গণমাধ্যমেই প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে আক্রান্ত ও সর্বস্ব হারানো হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা তার সঙ্গে দেখা করে ক্ষোভ প্রকাশ করলে তিনিও উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তিনি তাদের গালাগাল করেন। আক্রান্ত-ভীত-অসহায় ও হতাশ মানুষেরা তার কাছে গিয়েছিল তাদের ক্ষোভের কথা জানাতে, ঘটনার প্রতিকার চাইতে। কিন্তু মন্ত্রী যে তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করবেন-তা তারা কল্পনাও করেননি। তারা নিশ্চয়ই সেই সময় মন্ত্রীর কথা রেকর্ড বা ভিডিও করে রাখতে যান নি। মন্ত্রী এমন গালি দিয়েছেন-এটাই আসল কথা। তিনি যতই ষড়যন্ত্রের দোহাই দেন না কেন, তার মুখ থেকে এমন কথা বের না হলে মুহূর্তে তা এভাবে চাউড় হতো না।

মনে রাখা দরকার যে, সব সত্য সব সময় প্রমাণ করা যায় না। তার দরকারও হয় না। এলাকার এমপি হিসেবে ঘটনার পূর্বাপর যা করেছেন, যা বলেছেন, নৈতিক দিক থেকে তা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। সবচেয়ে ভালো হতো, তিনি যদি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতেন। মন্ত্রী বাহাদুর অপ্রমাণিত কিছু সত্য নিয়ে অনেক বড় গলায় কথা বলেছেন, একই সঙ্গে প্রমাণিত কিছু মিথ্যেকে সত্য হিসেবে চালাবার চেষ্টা করেছেন।
ওসি আবদুল কাদেরের সাফাই দিয়ে পুলিশ সুপারের নেয়া পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন তা প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড ক্ষুণ্ণ করার জন্য যথেষ্ট। ওসি যদি তার জবাবদিহির দায়বদ্ধ স্থান বা সর্বোচ্চ কর্মকর্তার আদেশ রদ করার সুযোগ পায় তাহলে সংশ্লিষ্ট থানায় বেপরোয়া আধিপত্য বিস্তার করবে যা শুভ হবে না। ওসি আবদুল কাদের ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মোয়াজ্জেম হোসেনের প্রতি মন্ত্রীর এত মমত্ব কেন? সবাই যখন এই দুই কর্মকর্তার দায়িত্বহীনতা ও গাফিলতির প্রমাণ দিচ্ছে, তখন ছায়েদুল সাহেবের এই ‘সাফাই’ ‘ভিন্ন এক সন্ধির’ই ইঙ্গিত দেয়।
একইভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মোয়াজ্জেম হোসেনের পক্ষেও সাফাই গেয়েছেন। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে বক্তব্য রেখে এবং একজন মন্ত্রীর সামনে যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছে তাতে শাস্তি হওয়া উচিত। তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়া উচিত-সে জনগণের শাসক নয়, সেবক।
যদিও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ‘প্রত্যাহার’ করা হয়েছে। মন্ত্রীর চোখে তিনি যদি এত ভালোই হবেন, তাহলে তাকে ‘প্রত্যাহার’ করা হলো কেন? কোনটা তাহলে সত্যি, মন্ত্রীর সাফাই, নাকি প্রশাসনিক এই সিদ্ধান্ত? তিনি মন্ত্রীর সামনে যে চোটপাট করেছেন, সেটা অবশ্যই ‘প্রফেশনাল মিসকন্ডাক্ট’। তার আচরণ দেখে মনে হয়নি আচার-আচরণ, দায়িত্ব-কর্তব্যের উপর কোনো প্রশিক্ষণ বা শিক্ষা তিনি কোথাও পেয়েছেন! এই কৃতকর্মের জন্য অবশ্যই তার শাস্তি হওয়া দরকার। তা না হলে তার আচরণ প্রশাসনে ‘গুণ্ডামি’র এক খারাপ নজির হয়ে থাকবে। ‘প্রত্যাহার’ কোন শাস্তি নয়। ‘প্রত্যাহার’ মানে তো তার বীরত্বের পুরস্কার হিসেবে অন্য কোথাও পোস্টিং। পেশাগত শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং দায়িত্বহীনতার কারণে ওসি এবং ইউএনওর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা ন্যায় বিচারের স্বার্থেই জরুরি।
নাসিরনগরের ঘটনা নিয়ে ছায়েদুল সাহেবের ভূমিকা আগাগোড়াই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ‘শুক্রবার ঢাকায় মানববন্ধন হলেও নাসিরনগরের হিন্দু সম্প্রদায় তাতে যোগ দেয়নি। এখানে কোনো মানববন্ধন হয়নি।’ কালের কণ্ঠের কাছে এই দাবি করেছেন। অথচ তিনিই গত বৃহস্পতিবার দিনে জনসভা করে অভয়বাণী শুনিয়ে আবার রাতের বেলা হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয়দের ডাকবাংলোয় ডেকে এনে পরের দিনের মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি না করতে বলে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, যা সমকালে শনিবার ছাপা হয়েছে। অথচ ছায়েদুল সাহেব পুরো উল্টো কথা বলেছেন। স্থানীয় তিন আওয়ামী লীগ কর্মীকে বহিষ্কার নিয়েও ছায়েদুল সাহেব দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। নাসিরনগরে মন্দির ও হিন্দুদের বাড়িঘরে দুর্বৃত্তদের হামলা চালানোর আগে আয়োজিত সমাবেশে যোগ দেওয়ার অভিযোগে স্থানীয় আওয়ামী লীগের তিন নেতাকে শুক্রবার সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। এই তিনজন হলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসম্পাদক ও নাসিরনগর সদর ইউপির চেয়ারম্যান আবুল হাশেম, তাপরতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সুরুজ আলী ও হরিপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর ফারুক। অথচ মন্ত্রী সাহেব তাদের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। ফারুক সম্পর্কে অতি উচ্ছ্বসিত মন্ত্রী বলেছেন, ‘হরিপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর ফারুক সেদিন এলাকায় না থাকলে হিন্দু পরিবারের আরও অনেক ক্ষতি হতো।’

মন্ত্রীর কথায় আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্বের বিষয়টিও সামনে চলে এসেছে। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের উদ্দেশে প্রশ্ন তুলে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘এ ঘটনার পর আজকে পর্যন্ত সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকারসহ জেলা আওয়ামী লীগের কোনো নেতাই সদর উপজেলায় আসেননি কেন?’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় মন্ত্রীর জনবিচ্ছিন্নতা প্রমাণ করে। ‘কিছু হয়নি’ বলে তিনদিন এলাকায় না গিয়ে ঢাকায় থাকা প্রমাণ করে তিনি একটি বিশেষ চাটুকারগোষ্ঠী দ্বারা পরিচালিত। টিএনও-ওসি, বহিষ্কৃত তিন নেতা-প্রভৃতি ব্যক্তিদের নিয়ে তিনি নিজেই একটি ক্ষমতা-বলয় সৃষ্টি করেছেন। যারা এই ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক আক্রমণের ঘটনায় ইন্ধন যুগিয়েছে। এ হামলায় দলীয় কোন্দল যে একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে-সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র নিশ্চয়ই ছিল। ছায়েদুল সাহেব অনেক পুরনো নেতা । নিশ্চয়ই দলের জন্য তার অনেক ত্যাগও আছে। তার বিরুদ্ধে যে কোনো ষড়যন্ত্র নেই-সেটিও কেউ বলবে না। মন্ত্রী এ সম্পর্কে হয়তো কিছুই জানতেন না। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনা করলে সব অনুভূতি-সহানুভূতি-ত্যাগের ইতিহাস ভুলে তাকে মন্ত্রিত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া উচিত। রাজনীতিতে বর্তমান ও ভবিষ্যতই বিবেচ্য, কৌশল ছাড়া অতীত ও আবেগ নিতান্তই মূল্যহীন। গণদাবিকে বিবেচনায় নিয়ে ছায়েদুল হককে অবিলম্বে মন্ত্রিসভা থেকে বহিষ্কার করা হবে বলেই সকলের প্রত্যাশা।
সমস্ত গণমাধ্যম তথ্য-প্রমাণসহ বলছে উপজেলা ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত তিন নেতা গত সপ্তাহে নাসিরনগরে সংঘটিত তাণ্ডবে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। সঙ্গে উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামানের নামও আছে উস্কাকানিদাতাদের মধ্যে। অথচ নাসিরনগরের ঘটনা নিয়ে ছায়েদুল সাহেব শুরু থেকেই সামান্য ক্ষতি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে বলে গলা ফাটাচ্ছেন। সেই সঙ্গে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচার করছেন তিনি ও তার অনুসারীরা। ষড়যন্ত্রই যদি হয় তাহলে ছায়েদুল সাহেবের উচিত ছিল বিপন্নদের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থান সংহত করা। সেটা না করে তিনি দাঁড়ালেন ইউএনও মোয়াজ্জেমের পাশে। ‘ঘটনা তেমন কিছু না’ বলে বাগাড়ম্বর করে মোয়াজ্জমকে দলীয় ক্যাডারের ভূমিকায় নামালেন। এখন বলছেন, ‘মালাউনের বাচ্চা বলেছি এটা প্রমাণ করতে পারলে আমি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেব।’ এ প্রসঙ্গে একটা কথাই শুধু বলার আছে, ছায়েদুল সাহেব, অন্ধ হলে প্রলয় কিন্তু বন্ধ থাকে না!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







