ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে রূপকথার প্রত্যাবর্তনের পর আরেকটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে নামার অপেক্ষায় রিয়াল মাদ্রিদ। শনিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় শিরোপার মঞ্চে স্তাদে দে ফ্রান্স স্টেডিয়ামে স্প্যানিশ জায়ান্টদের প্রতিপক্ষ ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের লিভারপুল।
সেমির দ্বিতীয় লেগে যোগ করা সময়ের দুই লেগ মিলিয়ে ৫-৩ ব্যবধানে পিছিয়ে ছিল রিয়াল। দুই মিনিটের ব্যবধানে রদ্রিগোর জোড়া গোলে সেই ব্যবধান ৫-৫ হয়ে গেলে খেলা অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়।
ম্যাচের ৯৫ মিনিটে করিম বেনজেমা পেনাল্টি কিকে গোল করে লস ব্লাঙ্কোসদের ইতিহাসের ১৭তম ফাইনালের টিকিট এনে দেন। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে এপর্যন্ত ১৬ বার ফাইনাল খেলা রিয়াল রেকর্ড ১৩ বার ট্রফি জয়ের স্বাদ নিয়েছে। হেরেছে কেবল তিনবার।
উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের পূর্বের নাম ছিল ইউরোপিয়ান কাপ। ১৯৫৫-৫৬ মৌসুমে প্রথমবার মাঠে গড়ায় ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরটি। ১৯৯২-৯৩ মৌসুমে নাম পাল্টে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ হয়ে যায়।
প্রতিযোগিতাটির নামকরণ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ হওয়ার পর রিয়াল ৭ বার ফাইনালে খেলে প্রতিবারই জয় তুলেছে। আসরের প্রথম পাঁচটিতেই চ্যাম্পিয়ন দলের নামও রিয়াল।
এক নজরে দেখে নেয়া যাক মাদ্রিদ রাজাদের আগের ১৬ ফাইনালের ইতিবৃত্ত-
১৯৫৫-৫৬ মৌসুম
ইউরোপিয়ান কাপের প্রথম আসরেই চ্যাম্পিয়ন হয় রিয়াল। পার্ক দে প্রিন্সেসে ম্যাচে ৩৮ হাজার দর্শকের সামনে ফ্রেঞ্চ ক্লাব রেইমসের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েছিল স্প্যানিশ জায়ান্টরা। সেদিনও ফুটবল দুনিয়া দেখেছিল রিয়ালের দারুণ প্রত্যাবর্তন। বিরতির আগে কিংবদন্তি আলফ্রেডো ডি স্টেফানো এবং হেক্টর রিয়ালের গোলে সমতা ফিরেছিল।
ম্যাচের ৬২ মিনিটে হিডালগো লক্ষ্যভেদ করলে আবারও পিছিয়ে পড়ে লস ব্লাঙ্কোস দল। কিন্তু চিত্রনাট্যে ছিল স্পেনের ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটিই হবে ইতিহাস প্রথম ইউরোপসেরা। ৬৭ মিনিটে মারকুইটোস এবং ৭৯ মিনিটে হেক্টর রিয়ালের নিশানাভেদে ৪-৩ গোলে ফাইনাল জিতে নেয় মাদ্রিদিস্তারা।
১৯৫৬-৫৭ মৌসুম
দ্বিতীয় আসরেও শিরোপা জেতে রিয়াল মাদ্রিদ। ঘরের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে লক্ষাধিক দর্শকের সামনে ইতালিয়ান ক্লাব ফিওরেন্টিনাকে ২-০ গোলে হারিয়েছিল তারা। এই ফাইনালেও গোল পান ডি স্টেফানো। ৬৯ মিনিটে স্পটকিকে গোল করে লিড এনে দেন। ছয় মিনিট পর দ্বিতীয় গোলটি করেন জেন্টো।
১৯৫৭-৫৮ মৌসুম
সেবারই প্রথম টুর্নামেন্টের ফাইনালের ফল এসেছিল অতিরিক্ত সময়ের গোলে। রিয়ালের প্রতিপক্ষ ছিল এসি মিলান। প্রথমার্ধ ছিল গোলশূন্য। ৫৯ মিনিটে পেপের গোলে পিছিয়ে পড়ে রিয়াল। ৭৪ মিনিটে সমতা টানেন ডি স্টেফানো। আসরের টানা তিন ফাইনালে গোল পেয়ে যান তিনি। ৭৭ মিনিটে গ্রিলো লক্ষ্যভেদ করলে ফের রিয়াল পিছিয়ে পড়ে। দুই মিনিট পর তাদের সমতায় ফেরান হেক্টর রিয়াল।
নির্ধারিত সময়ে খেলা অমীমাংসিত থাকে। অতিরিক্ত সময়ে গড়ায় লড়াই। ১০৭ মিনিটে জেন্টো গোল্ডেন গোল করা মাত্র হ্যাটট্রিক শিরোপার আনন্দে মাতে সাদা জার্সিধারীরা। তখনকার নিয়মে অতিরিক্ত সময়ে কোনো দল গোল করলেই রেফারি খেলা শেষের বাঁশি বাজিয়ে দিতেন।

১৯৫৮-৫৯ মৌসুম
প্রথম আসরের মতো আবারও রেইমস ছিল চ্যাম্পিয়ন রিয়ালের প্রতিপক্ষ। প্রথম মিনিটেই গোল করে রিয়ালকে এগিয়ে দেন মাতেওস। ৪৭ মিনিটে লিড দ্বিগুণ করেন ফাইনালে গোল করাকে অভ্যাসে পরিণত করে ফেলা ডি স্টেফানো। ২-০ গোলের জয়ে মাঠ ছাড়ে স্প্যানিশ ক্লাবটি।
১৯৫৯-৬০ মৌসুম
জার্মান ক্লাব ফ্রাঙ্কফুর্টকে সেবার খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়েছিল রিয়াল। আরও নির্দিষ্ট করে বললে হাঙ্গেরিয়ান কিংবদন্তি ফেরেন্স পুসকাস ও ডি স্টেফানো ছিলেন অগ্রণী। তাদের গোল উৎসবে ৭-৩ ব্যবধানে লস ব্লাঙ্কোসরা জেতে। ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের ফাইনালে রিয়ালের সবচেয়ে বড় জয়ের এই রেকর্ড এখনও অক্ষত।
হ্যাটট্রিকসহ ৪ গোল করেছিলেন পুসকাস। স্টেফানোও করেন হ্যাটট্রিক, গোল সংখ্যা ৩। গ্লাসগোর ৭২ হাজার দর্শক হয়েছিলেন একের পর এক গোলের সাক্ষী। টানা পঞ্চম শিরোপা উঁচিয়ে ধরে রিয়াল।
১৯৬১-৬২ মৌসুম
এক মৌসুম বিরতির পর আবারও ফাইনালে পা রাখা রিয়াল সেবার প্রথম ফাইনাল হারের স্বাদ পায়। পুসকাসের হ্যাটট্রিকের পরও পর্তুগিজ ক্লাব বেনফিকার কাছে ৫-৩ গোলে হেরে যায় তারা।
১৯৬৩-৬৪ মৌসুম
ইতালিয়ান জায়ান্ট ইন্টার মিলানের কাছে ৩-১ গোলে হেরে রিয়াল সেবার রানার্সআপ হয়। ৪৩ ও ৭৬ মিনিটে মাজ্জোলা ইন্টারের হয়ে জোড়া গোল পান। মাঝে ৬১ মিনিটে মিলানি করেন অপর গোলটি। রিয়ালের পাওয়া একমাত্র গোল ৭০ মিনিটে, করেছিলেন ফেলো।
১৯৬৫-৬৬ মৌসুম
সাবেক যুগোস্লাভিয়ার ক্লাব পার্টিজানকে ২-১ গোলে হারিয়ে ষষ্ঠবারের মতো ট্রফি ঘরে তোলে রিয়াল। ৫৫ মিনিটে ভাসোভিচের গোলে পার্টিজান লিড পেয়েছিল। ৭০ মিনিটে আমানসিও আমারো ও ৭৬ মিনিটে সেরেনার লক্ষ্যভেদে শেষ হাসিটা রিয়ালেরই ছিল।
১৯৮০-৮১ মৌসুম
দীর্ঘ ১৫ বছরের খরা কাটিয়ে ফাইনালে গেলেও সেবার শিরোপাবঞ্চিত হয় রিয়াল মাদ্রিদ। অ্যালান কেনেডির নিশানাভেদে একমাত্র গোলে মাদ্রিদিস্তাদের হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় লিভারপুল।
১৯৯৭-৯৮ মৌসুম
১৭ বছর পর ফাইনালের মঞ্চে পা দিয়ে আর হতাশা নয়, অর্জনের আনন্দে ভেসেছিল রিয়াল। ৩২ বছর পর ঘরে তুলেছিল ট্রফি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ নামকরণের পর সেবারই প্রথম হয়েছিল চ্যাম্পিয়ন। ৬৬ মিনিটে মন্টেনেগ্রো জাতীয় দলের সাবেক স্ট্রাইকার মিজাতোভিচের গোলে হয়েছিল ফলাফল নির্ধারণ।
১৯৯৯-২০০০ মৌসুম
একবিংশ শতাব্দীতে হওয়া প্রথম আসরে শিরোপা রিয়ালের ঘরে গিয়েছিল। ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে তারা জয় তুলেছিল ৩-০ গোলে। ৩৯ মিনিটে প্রথম গোলটি করেন মরিয়েন্টেস। ৬৭ মিনিটে ম্যাকম্যানম্যান এবং ৭৫ মিনিটে গোল পান ক্লাব কিংবদন্তি রাউল গঞ্জালেস।
২০০১-২০০২ মৌসুম
জার্মান ক্লাব বেয়ার লেভারকুসেনের বিপক্ষে জেতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের রাজারা। আট মিনিটে রাউল গঞ্জালেসের গোলে এগিয়ে গেলেও পাঁচ মিনিট পর লেভারকুসেনের হয়ে সমতা টেনেছিলেন লুসিও। ৪৫ মিনিটে শিরোপা নির্ধারণ করে দেয়া গোলটি করেন ফ্রান্সের ১৯৯৮ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক জিনেদিন জিদান।

২০১৩-২০১৪ মৌসুম
লিসবনে মুখোমুখি হয়েছিল নগর প্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদ ও অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ। ডাগ আউটে আনচেলত্তি-সিমিওনের কৌশলের লড়াই। ৩৯ মিনিটে ডিয়েগো গডিনের গোলে অ্যাটলেটিকোর লিড। নির্ধারিত সময় শেষের পরও এক গোলে এগিয়ে থাকল রোজা ব্লাঙ্কোসরা। যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে সার্জিও রামোসের আকস্মিক গোল! ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
পরে ১১০ মিনিটে গ্যারেথ বেল, ১১৮ মিনিটে মার্সেলো এবং ১২০ মিনিটে স্পটকিক থেকে মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো গোল অ্যাটলেটিকোর কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেন। ৪-১ ব্যবধানে জিতে দশমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় রিয়াল।
২০১৫-২০১৬ মৌসুম
আরেকটি রিয়াল-অ্যাটলেটিকো ফাইনাল। ভেন্যু এবার মিলানের সান সিরো স্টেডিয়াম। মহানাটকীয় সেই ফাইনালের ১৫ মিনিটে গ্যারেথ বেলের হেডে গোল করে ব্লাঙ্কোসদের এগিয়ে দেন রামোস। ৩৪ মিনিটে অ্যান্টনিও গ্রিজম্যানের পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেন কেইলর নাভাস।
ম্যাচের ৭৯ মিনিটে ইয়ানিক কারাস্কোর গোলে সমতায় ফেরে অ্যাটলেটিকো, ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়। তাতে ফল না আসায় টাইব্রেকারে হয় শিরোপা নির্ধারণ। ৫-৩ গোলে জিতে চ্যাম্পিয়ন হয় রিয়াল। খেলোয়াড়ি জীবনের পর কোচ হিসেবে এই মৌসুমেই প্রথম ইউরোপসেরার শিরোপার স্বাদ পান কিংবদন্তি জিদান।
২০১৬-২০১৭ মৌসুম
কার্ডিফে জুভেন্টাসের বিপক্ষে রিয়ালের ফাইনাল ম্যাচটি জমজমাট হবে বলেই ধারণা ছিল। ডাগ আউটে জিদান-অ্যাল্লেগ্রি আর গোলবারের সামনে জিয়ানলুইজি বুফন ও কেইলর নাভাসের দ্বৈরথ দেখা নিয়ে ছড়িয়েছিল উত্তেজনা। সেদিন সব আলো কেড়ে নিয়েছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। করেছিলেন ২ গোল।
২০ মিনিটে রোনালদোর গোলে রিয়াল লিড পায়। ২৭ মিনিটে জুভেন্টাসকে সমতায় ফেরান ক্রোয়েশিয়ান স্ট্রাইকার মারিও মানজুকিচ। ৬১ মিনিটে আবারো রোনালদোর গোল। ৬৪ মিনিটে কাসেমিরো আর ৯০ মিনিটে আসেনসিওর লক্ষ্যভেদে একপেশে ম্যাচে তুরিনের বুড়িদের ৪-১ গোলে হারিয়ে শিরোপা উঁচিয়ে ধরে রিয়াল।
২০১৭-২০১৮ মৌসুম
লিভারপুলকে ৩-১ গোলে হারিয়ে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদ। কোচ হিসেবে টানা তিনবার ট্রফি জেতেন জিদান। রেকর্ড ১৩ বার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের কীর্তি গড়ে লস ব্লাঙ্কোসরা।
কিয়েভে হওয়া ম্যাচের ৫১ মিনিটে করিম বেনজেমার গোলে রিয়াল এগিয়ে যায়। চার মিনিট পর সাদিও মানের গোলে অলরেডরা সমতায় ফেরে। ৬৪ ও ৮৩ মিনিটে গোল করে ক্লপের দলকে আর ম্যাচেই ফিরতে দেননি গ্যারেথ বেল।









