অ্যানফিল্ডে খেলতে যাওয়ার আগে ৩ গোল সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল বার্সেলোনা। ফাইনালে যেতে হলে এই গোলের বেশি যেতে দেয়া যাবে না লিভারপুলকে। সহজ সমীকরণ। সেই সমীকরণ উল্টে দিয়েছেন ডিভোক অরিগি ও জর্জিনো উইনালদাম। দুজনের জোড়া গোলে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে লিভারপুল।
বার্সাকে দ্বিতীয় লেগে ৪-০ গোলে হারিয়ে দুই লেগে ৪-৩ ব্যবধানের অগ্রগামীতায় টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠে গেছে অলরেডরা।
এমন প্রত্যাবর্তনের গল্প যে কেবল লিভারপুলই লিখেছে তা কিন্তু নয়। হাতেগোণা কয়েকটি দলের আছে অবিশ্বাস্যভাবে এমন ফিরে আসার গল্প। জেনে নেয়া যাক কার রূপকথার গল্পটি কেমন ছিল-
পিএসজিকে যখন স্তব্ধ করে দিয়েছিল বার্সা
(শেষ-১৬, ২০১৬/১৭)
অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়া, এডিনসন কাভানি ও উইলিয়ান ড্রেক্সলারের জোড়া গোলে নিজ মাঠে প্রথম লেগে বার্সেলোনাকে পাত্তাই দেয়নি পিএসজি। ৪-০ গোলের বিশাল জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্নবোণা শুরু করেছিল প্যারিস জায়ান্টরা। এত বড় ব্যবধানে জেতার পর আসলে বাদ পড়ার চিন্তা মাথায় না রাখাই স্বাভাবিক।

কিন্তু নিজ মাঠে সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেয় বার্সা। ৬-৫ গোলের অগ্রগামীতায় ম্যাচ জিতে পিএসজিকে শেষ ষোলো থেকে ছিটকে দেয় লুইস এনরিকের দল। ম্যাচে জোড়া গোল করেন তখনকার পিএসজির ভবিষ্যত তারকা নেইমার। অতিরিক্ত সময়ে প্রয়োজন ছিল দুই গোলের। যার একটি করেন এ ব্রাজিলিয়ান তারকা, আরেকটি আসে একদম অন্তিম মূহুর্তে। সেই গোলে নায়ক হয়ে যান সার্জিও রবের্তো।
রোমার কাছে যখন রূপকথার শিকার বার্সা নিজেই
(কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০১৭/১৮)
আগের মৌসুমে পিএসজির বিপক্ষে প্রত্যাবর্তনের গল্প লেখা বার্সা এবার নিজেই রূপকথার শিকার। রোমার বিপক্ষে নিজ মাঠে ৪-১ গোলে জেতার পর পরের লেগে হেরে বাদ পড়তে হবে, এমনটা হয়ত কল্পনাও করতে পারেননি মেসি-সুয়ারেজরা!

শেষ পর্যন্ত সেই কল্পনাই দুঃস্বপ্ন হয়ে আসে বার্সার সামনে। রোমার মাঠে ৩-০ গোলে হারে কাতালানরা। আগের লেগে এডেন জেকোর অ্যাওয়ে গোলের সঙ্গে এই ব্যবধান যোগ করে ৪-৪ সমতা। সমতাও ঠিক ছিল। কিন্তু ওই যে অ্যাওয়ে গোল। তাতে টানা তৃতীয়বারের মতো কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় বার্সার!
ইস্তাম্বুলে লিভারপুলের ‘ম্যাজিক নাইট’
(ফাইনাল, ২০০৪/০৫)
মঙ্গলবারের রাতের মতো ১৪ বছর আগে আরেকটি প্রত্যাবর্তনের গল্পে নাম আছে লিভারপুলের। সেই গল্পে বধ হয়েছিল আরেক জায়ান্ট এসি মিলান।
ম্যাচের প্রথম মিনিটে পাওলো মালদিনির গোলে নিয়ন্ত্রণ নেয় মিলান। একই অর্ধে ৩৯ ও ৪৪ মিনিটে হার্নান ক্রেসপোর গোলে বড় হারই দেখছিল অলরেডরা।

কিন্তু রাফা বেনিতেজের লিভারপুল হার মানেনি। দ্বিতীয়ার্ধের ৫৪ মিনিটে এক গোল শোধ দেন স্টিফেন জেরার্ড। দুই মিনিট পর ব্যবধান কমান ভ্লাদিমির সিমচের। ৩-২ গোলে ম্যাচ তখন জমে গেছে।
পরে ৬০ মিনিটে একদিকে হেলে পড়া ম্যাচকে সমতায় আনে জাভি আলোনসোর পেনাল্টি গোল। প্রথমার্ধে যে দলটা পিছিয়ে ছিল ৩-০ গোলে, ছয় মিনিটের ব্যবধানে সমতা ফিরিয়ে সেই লিভারপুলই শেষ পর্যন্ত শিরোপা ঘরে তোলে ৩-১ টাইব্রেক গোলে!
ইরুয়েতার ‘অলৌকিকতা’ দর্শন
(কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০০৩/০৪)
প্রথম লেগে ৪-১ গোলে হার। প্রতিপক্ষ এসি মিলান। দেপোর্তিভো লা করুনা কোচ হাভিয়ের ইরুয়েতা ঘোষণা দিলেন তিনি অলৌকিকতায় বিশ্বাস করেন না। পরের লেগে ব্যবধান যত কমিয়ে ম্যাচটা শেষ করা যায় ততই মঙ্গল!

কিন্তু ইরুয়েতার শিষ্যরাই যেন চেপে ধরলেন, কোচকে ‘অলৌকিক’ বিষয়টা দেখিয়েই ছাড়বেন। সান সিরোতে লা করুনার হয়ে একমাত্র গোল করা ওয়াল্টার পানডিয়ানই ৫ মিনিটে শুরু করলেন গোল উৎসবের।
ম্যাচের ৩৫ মিনিটে আরেকটি গোল করে ব্যবধান কমিয়ে আনলেন হুয়ান কার্লোস ভ্যালেরন। আর ৯ মিনিট পর আলভার্ট লুকের গোল তখন উৎসবে মাতিয়েছে স্প্যানিশ দলটির সমর্থকদের। কারণ, ম্যাচে তখন ৪-৪ গোলে সমতা। অ্যাওয়ে গোলে সেমিফাইনাল দেখছে লা করুনা।
তরুণ কাকাকে নিয়ে তখন পর্যন্ত আশা ছাড়েনি এসি মিলান। চেষ্টা অন্তত একটি অ্যাওয়ে গোল আদায়ের। কিন্তু সেই চেষ্টায় জল ঢেলে দেন বদলি খেলোয়াড় ফ্রান্স গঞ্জালেস। ৭৬ মিনিটে তার গোলেই মিলানকে টপকে সেমির টিকিট কাটে দেপোর্তিভো লা করুনা।
ডি মাত্তেওর ধ্রুপদী চেলসি
(শেষ-১৬, ২০১১/১২)
আন্দ্রে ভিলাস বোয়াসের চাকরিচ্যুতির পর তার জায়গায় অন্তর্বর্তীকালীন কোচের পদে দায়িত্ব পান সহকারী কোচ রবের্তো ডি মাত্তেও। দায়িত্বের প্রথম ধাপেই প্রতিপক্ষ ইতালিয়ান দল নাপোলি, চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শেষ ষোলো।
প্রথম লেগেই চাকরি হারানোর ঝুঁকির মুখে পড়েন ডি মাত্তেও। নাপোলির মাঠ থেকে ৩-১ গোলে হেরে আসে চেলসি। ইজিকুয়েল লাভেজ্জির জোড়া গোলের সঙ্গে আরেকটি গোল করেন এডিনসন কাভানি। চেলসির হয়ে একমাত্র গোলটি হুয়ান মাতার।

দ্বিতীয় লেগেই নিজের জাদু দেখান ডি মাত্তেও। জ্বলে ওঠেন দিদিয়ের দ্রগবা, জন টেরিরা। ২৮ মিনিটে দ্রগবার গোলে প্রথমার্ধ শেষ করা চেলসি ৪৭ ও ৭৫ মিনিটে সমতায় ফেরে টেরি ও ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের গোলে। কিন্তু ঝামেলা বাধান ইনলার। তার ৫৫ মিনিটের প্রদর্শনীতে অ্যাওয়ে গোল পায় নাপোলি। দুই লেগ মিলিয়ে ৪-৪ গোলে সমতায় নাপোলি-চেলসি। দুই দলেরই আছে একটি করে অ্যাওয়ে গোল।
এমন অবস্থায় যখন টাইব্রেকারই মনে হচ্ছিল আসল সমাধান, তখন আঘাত হানেন ব্রানিস্লাভ ইভানোভিচ। ১০৫ মিনিটে এই সার্ব ফুটবলারের গোলে শেষ পর্যন্ত জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে চেলসি। উঠে যায় ফাইনালেও। সেখানে বায়ার্ন মিউনিখকে তাদেরই মাঠে হারিয়ে নিজেদের ইতিহাসে একমাত্র চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপাটি জেতে ব্লুজরা।








