টেলিভিশন বলতে এক সময় ছিল শুধু বাংলাদেশ টেলিভিশন, সংক্ষেপে বিটিভি। সাদা কালো যুগের সেই টেলিভিশনের নাটক আর সিনেমার গান আমাদের ঘরোয়া বা পারিবারিক মন্ডলে ছিল একমাত্র বিনোদনের খোরাক। এর বাইরে বিনোদন বলতে ছিল হলে গিয়ে সিনেমা দেখা। সেই টেলিভিশনে খন্ড নাটক বা ধারাবাহিক নাটক ছিল অনেক প্রতিক্ষার পর পরম প্রাপ্তির বিষয়। এর বাইরে কবে সিনেমা দেখানো হবে সেই অপেক্ষায় থাকতো ঘরের মা-বোন-ভাবিরা। যাদের হলে গিয়ে সিনেমা দেখার সময় বা পারিবারিক পরিবেশ ছিল না।
শুধু নাটক আর গান নয়, যারা সমাজ-রাজনীতি দেশ তথা রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ে মোটামুটি চিন্তা ভাবনা করতেন তারা খবরের প্রতিও আকৃষ্ট ছিলেন। বিশেষ করে রাতের খবর। দিন শেষে দেশ, দেশের বাইরে কোথায় কি ঘটছে তা জানার আগ্রহ থেকেই রাতের খাবার শেষে খবর দেখতে বসতেন একটু বয়স্কজনেরা।
আস্তে আস্তে বেসরকারি পর্যায়ে যখন টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হয় তখন নাটক-সিনেমা-গান-ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের পাশাপাশি উৎসুক দর্শকের আগ্রহ বাড়ে দেশের কোথায় কি ঘটছে সঙ্গে সঙ্গে তা জানার। সেই লক্ষ্যেই বেসরকারি টেলিভিশন সরাসরি সেই ঘটনা দেখানোর ব্যবস্থা শুরু করে।
দেশে বেসরকারি টেলিভিশনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এক ধরনের প্রতিযোগিতাও শুরু হলো। কোন টেলিভিশন ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকের কাছে তা বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতে পারে, সেই প্রতিযোগিতা। কারণ সেই বিশ্বাসযোগ্যতার কারণেই তাদের দর্শক সংখ্যা বাড়বে। আর দর্শক সংখ্যা বাড়লে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছ থেকে বিজ্ঞাপন পাওয়া যাবে। বেসরকারি টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ বুঝে যায় শুধু নাটক-সিনেমা-গান দিয়েই দর্শকের ঘরে পৌঁছানো যাবে না। টাটকা খবর দিতে হবে, আর সেই খবর হতে হবে সঠিক। সব ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে রাজধানী থেকে শত শত মাইল দুরে কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে প্রচার করতে হবে।
১৯৯৯ সালের ১ অক্টোবর বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল টেলিভিশন চ্যানেল চ্যানেল আই সম্প্রচার শুরু করে।
আজ ১ অক্টোবর ২০১৮, চ্যানেলটি উনিশ বছর পেরিয়ে বিশ বছরে পদার্পণ করছে। দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বের সমগ্র বাংলা ভাষাভাষীর কাছে পৌঁছে গেছে ইতোমধ্যে চ্যানেলটি। পেয়েছে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা। রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজনীতি-সংস্কৃতি-মুক্তিযুদ্ধ-ইতিহাস-ঐতিহ্য সবকিছুর সঙ্গে ওতোপ্রোতোভাবে মিশে গেছে চ্যানেলটি। বিশ বছরের পদার্পণের মুহূর্তে চ্যানেলটির স্লোগান: ‘কোটি প্রাণে মিশে/আমরা এখন ২০-এ।’
অন্য আরও বিশ-পঁচিশটি টেলিভিশন চ্যানেল থেকে সহজেই আলাদা করা যায় চ্যানেল আই-কে। শুধু বিনোদন আর সংবাদ প্রচারে সীমাবদ্ধ থাকেনি চ্যানেল আই। নতুন শিল্পী তৈরির জন্য একে একে করেছে সেরা কণ্ঠ, ক্ষুদে গানরাজসহ নানা ধরনের রিয়েলিটি শো। শুধু দেশেই নয় দেশের বাইরেও শিল্পীদের নিয়ে জমকালো ব্যায়বহুল অনুষ্ঠান করে দেখিয়েছে দেশের সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা আর ভালোবাসা থাকলে সব করা সম্ভব।
দেশের নাটক নিয়ে যখন হা হুতাশ চারপাশে তখন চ্যানেল আই কর্তৃপক্ষ গত ঈদুল আযহায় মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর তত্ত্বাবধানে বিশেষ নাটক তৈরি করেছে। যা নাটকের খরার এই সময়টায় দর্শকদের মধ্যে নাটক দেখার আগ্রহ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
‘তৃতীয় মাত্রা’ নামে রাজনীতি নির্ভর টক শো’ প্রচারিত করে বেশ আলোচিত চ্যানেল আই। মানুষের মনে ব্যাপক আগ্রহ সেই শুরু থেকেই। এখনো সমানতালে এগিয়ে চলেছে টক শো‘টি।
বাংলাদেশে শিশুদের নিয়ে অনেক বড় বড় কথা বলে শিশুদের নিয়ে কাজ করা সরকারি বেসরকারি সংস্থাগুলো। কিন্তু শিশুদের বিনোদন বা জ্ঞান-বিজ্ঞান-ভাষা শেখার বিষয়ে তাদের তেমন তৎপরতা চোখে পড়ে না। চ্যানেল আই প্রতি ঈদে শিশুদের জন্য ধারাবাহিক নাটক প্রচার করে থাকে। ফরিদুর রেজা সাগরের রচনায় ছোটকাকু সিরিজের এ নাটকটি পরিচালনা করেন অভিনেতা আফজাল হোসেন। যা ছোটদের কাছে ভীষণ জনপ্রিয়। এদিক থেকে চ্যানেল আই অন্যদের চেয়ে আলাদা।
বিনোদন আর খবরের বাইরে চ্যানেল আই একবারেই আলাদা যে কাজটি করে যাচ্ছে তা হচ্ছে দেশের কৃষকের সুখ-দুঃখ নিয়ে অনুষ্ঠান। দেশের অগ্রগতিতে যাদের ভূমিকা অপরিসীম, সেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিয়ে অনুষ্ঠান করে দেশের অর্থনীতিকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করে যাচ্ছে চ্যানেল আই। পাশাপাশি উৎসাহ যোগাচ্ছে কৃষি বিপ্লবে। অল্প পুঁজি নিয়ে নিজের সামান্য জমিতে ফসল লাগিয়ে কিভাবে স্বচ্ছল থাকা যায় সেই বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে নিয়মিত। আর এই কাজটি করে যাচ্ছেন চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান কৃষি উন্নয়নে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ। দেশকে খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ করতে তার কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ এর ভূমিকা অতুলনীয়। পাশাপাশি বাড়ির আঙিনায় স্বল্প পরিসরে বাগান করার অনুষ্ঠান ‘ছাদ কৃষি’ অনেককেই উৎসাহ যুগিয়ে চলেছে। শুধু দেশেই নয় দেশের বাইরেও অনেক প্রবাসী বাঙালিকেও এই অনুষ্ঠানটি অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে। তাদের নিয়েও শাইখ সিরাজ সমানতালে অনুষ্ঠান নির্মাণ করছেন।
একটি চ্যানেল মানুষের কতটা কাছাকাছি পৌঁছতে পারলে গ্রহণযোগ্যতা পায় তা বোঝা যায় যেকোনো চ্যারিটি শো’র জন্য যখন মিডিয়া পার্টনার হিসেবে চ্যানেল আইকে পাশে থাকার প্রস্তাব দেয়া হয়। কাউকে হতাশ না করে মিডিয়া পার্টনার হিসেবে পাশে থাকে চ্যানেল আই।
চ্যানেল আইয়ের সূচনা সংগীতই বলে দেয় এ চ্যানেলটি সবার। বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্যের কি নেই এটাতে? ২০তম জন্মদিনে শুভ কামনা এবং আশা মাটি ও মানুষের কাছাকাছি থেকে হৃদয়ে বাংলাদেশকে বুকে ধারণ করে চ্যানেল আই এগিয়ে যাক।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







