এ যেন কোনো সিনেমার শেষ দৃশ্য। মেয়ের জন্য পিতা চোখের জল মুছতে-মুছতে কয়েকদিন হাইকোর্ট দেখলেন। আর আইনের ফ্রেমে প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে দেশ ছাড়ার আদেশ নিয়েই বিদায় নিলেন সেই বাবা-মায়ের কাছ থেকে।
প্রাপ্তবয়স্ক ওই তরুণীকে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ না দেয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে কানাডায় যেতে না দেয়ার অভিযোগে হাইকোর্টে রিট হয়েছিল।
মানবাধিকার সংগঠন ‘ব্লাস্ট’ এবং ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্রের’ পক্ষ থেকে করা ওই রিটে বলা হয়, ‘বাংলাদেশি বাবা-মায়ের সন্তান এই তরুণীর জন্ম কানাডায়। প্রাপ্তবয়স্ক এই তরুণী কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।
প্রায় ১ বছর আগে তরুণীটি কানাডা থেকে তার মা-বাবার সাথে বাংলাদেশে আসেন। এরপর ওই তরুণী কানাডায় ফিরে যেতে চাইলেও তাকে যেতে দেওয়া হয়নি। এছাড়া ওই তরুণীর কাছ থেকে তার মোবাইল নিয়ে নেয়া হয়। একপর্যায়ে ওই তরুণী ল্যান্ড ফোনে ও ইমেইলের মাধ্যে কানাডা সরকার ও হাইকমিশনকে জানান যে সে কানাডায় ফিরতে চান।’
এমন পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মুগদা থানায় কানাডিয়ান হাইকমিশনের পক্ষ থেকে সাধারণ ডায়েরি করা হয়। পরে হাইকমিশন তরুণীটিকে উদ্ধারে মানবাধিকার ও আইনি সহায়তাকারী সংস্থা ব্লাস্ট এবং আইন ও সালিস কেন্দ্রে যোগাযোগ করলে সংস্থা দুটির পক্ষ থেকে হাইকোর্টে ওই তরুণীকে হাজিরের নির্দেশনা চেয়ে রিট করা হয়।
সেই রিটের শুনানি নিয়ে গত ৬ এপ্রিল হাইকোর্ট মুগদা থানার ওসিকে ১০ এপ্রিল ওই তরুণী ও তার মা-বাবাকে আদালতে নিয়ে আসতে বলেন। সে অনুযায়ী রোববার এদের সবাইকে আদালতে নিয়ে আসা হয়। প্রথমে আদালত ওই তরুণীর একান্ত উপস্থিতিতে তার বক্তব্য শুনেন। এরপর হাইকোর্ট তার বাবা-মা ও উভয় পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য শুনেন।
এক পর্যায়ে আদালত মৌখিক আদেশে ওই তরুণীকে তার মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সংযোগসহ ল্যাপটপ দিতে বলেন। ওই তরুণী কানাডায় যেতে চাইলে তাকে বাধা না দিতে এবং কানাডায় যাওয়ার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে যে সময় সে পর্যন্ত ওই তরুণী তার মা-বাবার সাথেই থাকবে বলে নির্দেশ দিয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেন।
সেদিন আদালত বলেন, ‘সন্তান যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হয় তখন তাকে কোনো কিছুতে জোর করে বাধ্য করা যাবে না। তাতে আরও বেশি অবাধ্য হবার ঝুঁকি থাকে। বাবা-মাকে সন্তানের সাথে বন্ধুর মত আচরণ করতে হবে। সম্পর্ক জটিল করা যাবে না। সন্তানের সাথে বাবা-মায়ের বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন গড়তে হবে।’
এরপর বৃহস্পতিবার আদালতে মেয়েটি দ্বিতীয় দিনের মত একান্তে কথা বলেন। পরে খাসকামরায় দুপক্ষের আইনজীবী ও বাবার সাথে আবার কথা বলে মেয়েটি আদালতকে জানায় যে, সে রোববার পর্যন্ত বাবা-মায়ের সাথে থেকে তারপর কানাডায় যেতে চায়। তখন আদালত রোববার পরবর্তী আদেশের দিন ধার্য করে শুনানি মুলতবি করেন। এইদিন অশ্রুসিক্ত বাবা আদালতের ডায়াসে গিয়ে বলেন, ‘ও (মেয়ে) কানাডায় চলে গেলে যাক, কিন্তু আমি ওকে শুধু একটু দিয়ে আসতে চাই।’
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আজ রোববার আবার বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চে উপস্থিত হন বাবা ও মেয়ে।
একপর্যায়ে মেয়েটির বাবা বিচারপতি ফারাহ মাহবুবকে বলেন, ‘এর আগে আমার আদালতে আসার অভিজ্ঞতা ছিলো না। আমার মেয়েই আমাকে হাইকোর্টে এনেছে, তাকে ধন্যবাদ। আপনি (বিচারপতি) কেবল একজন ন্যায় বিচারকই নন, আপনি একজন অভিভাবক। আমার মেয়ের জন্য দোয়া করবেন।’ সে সময় অশ্রুসিক্ত বাবা তার মেয়ের উদ্দেশ্য বলেন, ‘ও যেখানেই থাকুক, যেন ভালো থাকুক।’
হাইকোর্ট মেয়েটিকে বলেন, ‘আশাকরি আপনি অনেক দায়িত্বশীল হবেন। ভালোমতো লেখাপড়া করবেন। মনে রাখবেন এটা আপনার জীবন, ভালো করলে ভালো। আর খারাপ করলে আপনি ও পরিবার কষ্ট পাবে। আমরা আশাকরি আপনি ভালো লেখাপড়া করবেন। আপনার নাম ছড়িয়ে পড়বে। আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবেন, আমরা যেন গর্ব করতে পারি।’
এরপর হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রার মো: গোলাম রব্বানীর হাতে ওই মেয়ের পাসপোর্ট তুলে দেন আদালত। আর রেজিস্ট্রারকে হাইকোর্ট নির্দেশ দেন দুপক্ষের আইনজীবী, একজন দূতাবাস কর্মকর্তা ও বাবার স্বাক্ষর নিয়ে মেয়েটিকে কানাডার দূতাবাস কর্মকর্তাদের কাছে বুঝিয়ে দিতে। আর সেখান থেকে মেয়েটিকে কানাডায় পৌঁছে দিতে দূতাবাসের প্রতি অনুরোধ করেন হাইকোর্ট।
এ আদেশ অনুযায়ীই হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রার তার কক্ষে সবার স্বাক্ষর নিয়ে মেয়েটিকে কানাডার দূতাবাস কর্মকর্তাদের হাতে বুঝিয়ে দেন। এরপর মেয়েটি হাইকোর্ট ছাড়েন।
আদালতের নির্দেশ মেনে ওই মেয়ে ও তারা বাবা-মায়ের নাম পরিচয়, ছবি প্রকাশ না করায় গণমাধ্যমের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ আজ করেন হাইকোর্ট।
রিটের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী সারা হোসেন ও জেড আই খান পান্না। আর রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সমরেন্দ্র নাথ বিশ্বাস। এছাড়া শুনানিতেই কানাডিয়ান হাইকমিশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।







