বংশাল রোড দিয়ে কিছুটা পশ্চিম দিকে এগোতেই কসাইটুলির লেনের মুখ। কিন্তু সে গলি এতটাই সরু যে তার মধ্য দিয়ে কোন ধরনের যানবাহন চলাচলের সুযোগ নেই। পায়ে হেঁটে যাওয়াও অনেকটা কষ্টকর। কিন্তু সেই গলির মাথায়ই নান্দনিক এক স্থাপনা। স্থানীয়দের কাছে ‘চিনিটুকরা মসজিদ’ হিসেবে পরিচিত কসাইটুলি লেনের কেপি ঘোষ স্ট্রিটের এ মসজিদটির বয়স শতবর্ষ পেরিয়েছে। কিন্তু নির্মাণ শৈলী এবং নান্দনিকতায় যার জৌলুস কমেনি খুব একটা।
তবে সংস্কাররের পরিবর্তন এর নির্মানকালীন বৈশিষ্ট হারিয়েছে অনেকটাই। ধারন ক্ষমতা বেড়েছে অনেক, লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়াও। দামি বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, এয়ারকন্ডিশনার, আধুনিক ওযুখানাসহ সব ব্যবস্থাই রয়েছে। কিন্তু এর ফলে মসজিদটির প্রকৃত আভিজাত্য এখন অনেকটাই ম্লান।

নির্মাণ
বাংলাদেশে এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত ‘ঢাকা কোষ’ অনুসারে মসজিদটি ১৯০৭ সালে নির্মিত হয়। আবদুল বারি নামে এক ব্যবসায়ী এটি নির্মাণ করেন। ১৯৭৯ সালে কারুকার্যে কোন পরিবর্তন না করে মসজিদ সংস্কার করা হয়। পরে মসজিদটির ধারণক্ষমতা বাড়াতে এর পূর্ব ও উত্তর দিকের সম্প্রসারণ করা হয়। মূল মসজিদটি একতলা হলেও বর্ধিত অংশটি তিনতলা। বর্তমানে এটি প্রায় পাঁচ কাঠা জায়গায় অবস্থিত।
শৈলী
মূল মসজিদটির ভবনে সমতল কোন ছাদ নেই। ছাদবিহীন মসজিদের প্রতিটি পিলারের মাথায় রয়েছে গম্বুজ। মূল অংশের ছাদে রয়েছে তিনটি গম্বুজ। তিনটি গম্বুজের মাঝের গম্বুজটি বড় আর দুপাশের দুটির মাঝারি আকারের। এছাড়া চার কোণায় চারটি বুরুজ, চারটির কারুকাজ একই ধরনের। গম্বুজ ও বুরুজগুলোর মাথায় পদ্মফুলের নকশা করা তির রয়েছে। ছাদের চারদিক ঘিরে আছে অনেকগুলো টারেট। এছাড়া ছয়টি ছোট ও দুটি জোড়া পিলারের দুটি গম্বুজ রয়েছে। গম্বুজগুলোর উচ্চতা ৫-১২ ফুট।
‘চিনিটিকরি’ কারুকাজের কারণেই এর নাম চিনিটুকরা
মসজিদটির মূল বৈশিষ্ট্য হল এতে করা ‘চিনিটিকরির কারুকাজ’। এই কারুকাজ মুঘল স্থাপত্য রীতি। মূল ভবনের ভেতরে ও বাইরের দেয়ালসহ সম্পূর্ণ জায়গায় চিনিটিকরি পদ্ধতির মোজাইক দিয়ে নকশা করা হয়েছে। চিনামাটির ভাঙা টুকরা আর রঙিন কাচ দিয়ে গোলাপ ঝাড়, আঙুরের থোকা, ফুলদানির ছবি মসজিদের দেয়ালে-খিলানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মসজিদের ভেতরের মিহরাব ও মিহরাবের আশপাশের নকশাগুলি হচ্ছে সবচেয়ে রঙিন ও জমকালো।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মসজিদটি সকাল থেকে রাত সাড়ে দশটা পর্যন্তই জমজমাট থাকে। মুসল্লীরা নামাজ আদায় ছাড়াও বসে জিকির বিভিন্ন আমল করেন, বয়ান শোনেন। তবে কমিটির নিষেধাজ্ঞা থাকায় রাত সাড়ে দশটার পর থেকে মসজিদের কর্মচারী ছাড়া আর কেউ থাকতে পারেন না।

যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে
মসজিদটির স্থায়ী কর্মচারী হিসেবে এক জন ইমাম, এক জন মুয়াজ্জিন এবং তিনজন খাদেম। তাদের বেতন মসজিদ পরিচালনা কমিটির মাধ্যমেই দেওয়া হয় বলে জানালেন মসজিদটির মুয়াজ্জিন আব্দুল হক।
মসজিদে টাঙানো বোর্ড থেকে জানা যায়, মসজিদটি পরিচালনায় ২১ সদস্যের কমিটি রয়েছে। ইমাজ-মুয়াজ্জিন-খাদেমের বেতনসহ মসজিদ পরিচালনার সমস্ত ব্যয় এই কমিটির মাধ্যমেই নির্বাহ করা হয়।








