হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার উত্তরের শেষ প্রান্তে সবুজ সৌন্দর্যের জনপদ পঞ্চগড় জেলা । ১৯৮৪ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়, বোদা, দেবীগঞ্জ ও আটোয়ারী উপজেলা নিয়ে পঞ্চগড় জেলা গঠন করা হয়। রাজনগড়, মিরগড়, ভিতরগড়, দেবেনগড় ও হোসেনগড় নামের পাঁচটি গড়ের সমন্বয়ে গঠিত পঞ্চগড় জেলার তিনদিকেই ১৮৩ মাইল বেষ্টিত বাংলাদেশ-ভারতীয় সীমান্ত অঞ্চল।
এ জেলার উত্তরে ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলা, উত্তরপূর্ব ও পূর্বে জলপাইগুড়ি ও কুচবিহার জেলা এবং পশ্চিমে ভারতের পূর্ণিয়া ও উত্তর দিনাজপুর জেলা অবস্থিত। করতোয়া, ডাহুক, মহানন্দা, তালমা, পাঙ্গা এবং চাওয়াই নদী বেষ্টিত এই জেলা।
কয়েক বছর আগেও এই জেলাটি ছিল অবহেলিত ও আলোচনায় না থাকা একটি সাদামাটা স্থান। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য ছিল বটে, কিন্তু তা অল্প কিছু সৌন্দর্য পিপাসু ভাবুক প্রকৃতির মানুষ ছাড়া অন্যদের তেমন একটা টানতো না। কিন্তু ইদানীং এই জেলার গুরুত্ব অনেকখানি বেড়ে গেছে। বিশেষ করে চা-বাগানগুলো যেন পঞ্চগড়ের সৌন্দর্য ও আকর্ষণ অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে।
সমতলের সবুজ সুন্দরের জনপদ পঞ্চগড়ের অনন্য আরেক দিক হলো এখানকার সবুজের নৈসর্গ চা বাগান। বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও সিলেটের পর পঞ্চগড় অন্যতম চা অঞ্চল হিসেবে এরই মধ্যে দেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। পঞ্চগড় জেলা ইতিমধ্যে দেশের তৃতীয় চা অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
একসময়ের পতিত গো-চারণ ভূমি ও দেশের সবচেয়ে অনুন্নত জেলা এখন চায়ের সবুজ পাতায় ভরে গেছে। সৃষ্টি হয়েছে চোখ জুড়ানো নৈসর্গিক সৌন্দর্য। দেশের বাজারসহ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে পঞ্চগড়ের চা। এখানকার অর্গানিক চা বিক্রি হচ্ছে লন্ডনের হ্যারোড অকশন মার্কেটে। রপ্তানি হচ্ছে দুবাই, জাপান ও আমেরিকায়।

২০০০ সালের দিকে তেঁতুলিয়া টি কোম্পানি ও কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান চা চাষ শুরু করে। এরপর কয়েক বছরের মধ্যেই তেঁতুলিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ গো-চারণ ভূমি চায়ের সবুজ পাতায় ভরে যায়। সৃষ্টি হয় সবুজের সমারোহ। পঞ্চগড়ে নীরবে ঘটে চা চাষের বিপ্লব।
পঞ্চগড় চা বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্য মতে, বর্তমানে জেলার ১৬ হাজার একর জমি চা চাষের উপযোগী রয়েছে। এ পর্যন্ত চা চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে দুই হাজার ২৫৫ দশমিক ৫৫ একর জমিতে। এসব চা বাগানে প্রায় পাঁচ হাজার নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
এই চা বাগান দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসছে পর্যটক। ভবিষ্যতে যাতায়াত, থাকা-খাওয়া, আরও কিছু বিনোদনকেন্দ্র স্থাপন ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দিলে এই জেলা পরিণত হতে পারে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে।
অপরূপ সৌন্দর্যের কারণে দিন দিন ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বাড়ছে এই জেলার কদর। ফলে এই অঞ্চলকে পরিকল্পিত পর্যটন জেলা হিসেবে গড়ে তোলার দাবি উঠেছে। তিন দিকে প্রতিবেশী ভারতের কাঁটাতারের বেড়ার সীমান্তবেষ্টিত এই জেলায় চা বাগান ছাড়াও রয়েছে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর, জেলা পরিষদ ডাকবাংলো, পিকনিক কর্নার, রওশনপুর জেমকন গ্রুপের শিশুপার্ক ও আনন্দধারা পার্ক, সীমান্তবেষ্টিত ভারতের কাঁটাতারের বেড়ার সার্চলাইট, নদী মহানন্দা, সবজি গ্রাম, পাথর-শিল্প।
পঞ্চগড়ের সর্ব উত্তরের উপজেলা তেঁতুলিয়ায় রয়েছে বাংলাবান্ধা জিরোপয়েন্ট। এখানেই অবস্থিত বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল-ভুটানের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের একমাত্র সম্ভাবনাময় বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর। নিত্যদিন দেশের জিরোপয়েন্ট দেখতে ভিড় লেগেই রয়েছে পর্যটকদের।
এই বাংলাবান্ধা থেকে নেপালের দূরত্ব মাত্র ৬১ কিলোমিটার, এভারেস্ট শৃঙ্গ ৭৫ কিলোমিটার, ভুটান ৬৪ কিলোমিটার, চীন ২০০ কিলোমিটার, ভারতের দার্জিলিং ৫৪ কিলোমিটার ও শিলিগুড়ি ৮ কিলোমিটার।

তেঁতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দূরত্ব কম হওয়ায় কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্যও এখান থেকে উপভোগ করা যায়। শরতের শেষ থেকে শীত পর্যন্ত তেঁতুলিয়া ডাকবাংলোতে দাঁড়িয়ে উত্তরের মেঘমুক্ত আকাশে তাকালেই চোখে পড়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার মোহনীয় মায়াবী দৃশ্য।
তেঁতুলিয়া উপজেলার বুক চিরে বয়ে গেছে নয়নাভিরাম মহানন্দা নদী। এর তীর ঘেঁষে জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর পিকনিক কর্ণার। অসংখ্য পাথর ও স্বচ্ছ পানির এই সীমান্তবর্তী নদীর তীরে দাঁড়ালে যে কোনো মানুষই মুগ্ধ হবেন।
হিমালয় অঞ্চলের শৈত্য প্রবাহের কারণে এ অঞ্চলে শীতের তীব্রতা খুব বেশি। শীত উপভোগ করতে চাইলে ডিসেম্বর থেকে মার্চ-এই জেলায় ভ্রমণ করতে হবে!
যেভাবে যাওয়া যাবে
রাজধানী ঢাকা থেকে সরাসরি বাস যায় তেঁতুলিয়ায়। হানিফ, শ্যামলী, নাবিল, কেয়াসহ বিভিন্ন পরিবহনের এসব বাসে ভাড়া নেবে ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা। তেঁতুলিয়ায় নেমে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর, চা-বাগান বা আশপাশের এলাকায় ঘুরাঘুরির জন্য স্কুটার, অটোরিকশা, অটোভ্যান এবং মাইক্রোবাস ভাড়া পাওয়া যায়।
এ ছাড়া বিমানে সৈয়দপুর পর্যন্ত কিংবা ট্রেনে দিনাজপুর পর্যন্ত যাওয়া যায়। সৈয়দপুর ও দিনাজপুর থেকে বাসে সরাসরি তেঁতুলিয়া যাওয়া যায়। মাইক্রোবাসও ভাড়া পাওয়া যায়। সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা।
আইনশৃঙ্খলার দিক থেকে এই অঞ্চল খুবই উন্নত। নিরাপত্তা নিয়ে কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি। থাকায় ইচ্ছেমতো ঘুরে উপভোগ করা যাবে দর্শনীয় স্থানগুলো।
থাকার জন্য হোটেল-রেস্টুরেন্ট
দেশের এই উত্তরের উপজেলায় ঘুরতে এলে থাকতে পারবেন হোটেল সীমান্তের পাড়-এ। সরকারিভাবে ডাকবাংলো, পিকনিক কর্নারে রয়েছে নতুন ভবন। এখানে থাকতে চাইলে আগে থেকেই তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। দুই বেডের প্রতি কক্ষের ভাড়া পড়বে ৭০০ টাকা।
বন বিভাগের রেস্টহাউসে থাকার জন্য জেলা সদর অথবা তেঁতুলিয়ায় বন বিভাগ থেকে অনুমতি নিতে হবে। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরেও জেলা পরিষদের ডাকবাংলো আছে, এখানে থাকার অনুমতি নিতে হবে পঞ্চগড় থেকে। এখানে প্রতি কক্ষের ভাড়া ৪০০ টাকা। এ ছাড়া পঞ্চগড়ে রয়েছে অনেক আবাসিক হোটেল। ভাড়া পড়বে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যাবে এসি রুম।
কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটের নিজস্ব রেস্ট হাউজ আনন্দধারায়ও রাত্রি যাপনের সুযোগ আছে। তবে সে ক্ষেত্রে ঢাকা থেকে অনুমতি নিতে হয়।
ছবি: চিররঞ্জন সরকার







