বিগত কিছুদিন থেকে অস্থির হয়ে উঠা চালের দাম সরকারের বিভিন্ন অভিযানের পর নামমাত্র কিছুটা কমলেও এখনও পর্যন্ত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেনি। এক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, নানা কারণে চালের দাম বাড়লেও সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে ধীরে ধীরে তা কমে আসবে। তবে অতীত ইতিহাস টেনে ব্যবসায়ীরা বলছেন, চালের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে যে পর্যায়ে গেছে, আগামী বৈশাখের মৌসুমের আগে তা আগের অবস্থায় ফিরে আসার কোন সম্ভাবনা নেই। বরং এভাবে চলতে চলতে তখনও বর্তমান দামই বহাল থেকে যাবে যাবে বলে মনে করছেন তারা।
সরকারের উদ্যোগে চালের দাম অনেকটা কমতে পারে বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম। এ বিষয়ে চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন: বন্যার পাশাপাশি রোহিঙ্গার কিছুটা প্রভাব পড়েছে চালের উপর। এছাড়া গত বছরের জুনের তুলনায় চলতি বছরের জুনে সরকারি চালের মজুদ প্রায় অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। চালের মিলাররা এই খবর জানতে পেরেছে। এ কারণে তারা দাম বাড়িয়েছে।
‘তবে এখন আমদানি শুল্ক কমানোর ফলে বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হচ্ছে। এই আমদানির চাল দ্রুত বন্দর থেকে খালাস করে বাজারে সরবরাহ করলে দাম স্বাভাবিক হতে পারে।’
এখন বাজারে মিনিকেট চাল মানভেদে বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ৬২ থেকে ৬৬ টাকায়, নাজিরশাইল ৬৫ থেকে ৭০ টাকায়, স্বর্না (মোটা চাল) ৪৮ থেকে ৫০ টাকায়, বিআর-২৮ বিক্রি হচ্ছে ৫৬ থেকে ৬০ টাকায়। শুক্রবারে রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও কাঁঠালবাগান বাজার ঘুরে চালের দামের এই চিত্র পাওয়া গেছে।
বেড়ে যাওয়া চালের দাম কবে কমতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে চালের আড়তদার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, হাওর এলাকায় বন্যার পর দেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যায়ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে আগামী অগ্রহায়ণে যে ধান উঠার কথা তা প্রত্যাশানুযায়ী হবে না। কারণ বন্যার কারণে কৃষকরা ভাদ্র-আশ্বিনে ধান রোপন করতে পারেনি।
তারা বলেন: চালের মিলে সরকারের অভিযানের পর দাম যেটুকু কমেছিল এখনও সেখানেই স্থির রয়েছে। এ কারণে চালের দাম ৫ ভাগ বেড়ে কমেছে মাত্র এক ভাগ। এছাড়া দিন দিন ধান উৎপাদনের জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় আমদানির উপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। আর কিছু চাল আমদানি করা হলেও তা আতপ চাল বলে মানুষ কিনছে না। তাই বাধ্য হয়ে দাম বেশি হলেও সবাই ছুটছে সিদ্ধ চালের পেছনে।
তাদের অভিমত, বন্যা দেখা দেয়ার পর চাল মৌসুমের সময় সরকার মিলারদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত চাল কিনতে পারেনি। তখন তারা কৌশলে মজুদ রেখেছে। মিলাররা এখন বলছে, কৃষকের কাছে ধান নাই। তাই চালের সংকট। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় উৎপাদিত ধান গেল কই? মিলাররা মৌসুমের সময় কৃষকের কাছ থেকে সব ধান কিনে মজুদ করে রাখে। এখন তো কৃষকের কাছে ধান থাকবে না- এটাই স্বাভাবিক। তাই আগামী বৈশাখের মৌসুম পর্যন্ত অপক্ষো করতে হবে। তবে সেই পর্যন্ত চালের দাম কিছুটা উঠানামা করে স্থির হয়ে যাবে। অর্থাৎ যা বেড়েছে তার সামান্য কমে আসবে। তবে আগের দামে ফিরবে না।কারওয়ান বাজার চালের আড়তদার মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হান্নান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: মৌসুমের সময় যদি মিলারদের চাপ দিয়ে সরকার চাল কিনে মজুদ রাখতো তাহলে আজ সংকট দেখা দিত না। তাই এখন আগামী মৌসুম পর্যন্ত চালের দাম কমার জন্য অপক্ষো করতে হবে। তবে তাতে খুব বেশি দাম কমবে বলে মনে হয় না।
সিটি জেনারেল এন্টারপ্রাইজের বিক্রয়কর্মী জোবায়ের জানান: দাম যেটা বেড়েছে তা আগের অবস্থায় আর ফিরবে বলে মনে হয় না। সরকার চাপ প্রয়োগ করলে ঘুরেফিরে হয়তো দুই-এক টাকা কমতে পারে। কয়দিন পর নতুন আরেকটা সমস্যা দেখিয়ে কমানো ওই দুই-এক টাকা আবার বেড়ে যাবে।
বাংলাদেশ চাল আমদানির উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে মন্তব্য করে হাজী ইসমাইল অ্যান্ড সন্সের কর্ণধার জসিম উদ্দিন বলেন: দিন দিন কৃষকের জমির পরিমাণ কমছে, কৃষকের সংখ্যা কমছে। ফলে কমছে উৎপাদনের পরিমান। কিন্তু মিলারের সংখ্যা বাড়ছে। জনসংখ্যাও বাড়ছে। তাই স্বল্প উৎপাদিত ধান কে কত পরিমাণ মজুদ করবে তা নিয়ে মিলারদের মধ্যে প্রতিযোগিতা লেগে যায়। ফলে দামও বেড়ে যায়। কিন্তু এর সুফল পায় না প্রান্তিক কৃষক। এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় চাল না আসলে বাংলাদেশে মোটা চালের কেজিও ৬০-৭০ টাকায় উঠে যাবে।
ব্যবসায়ীদের এসব যুক্তি আর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে খাদ্য মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সংগ্রহ ও সরবরাহ) মো. আতাউর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। যুগ্ম-সচিব (সংগ্রহ) মো. শফিউল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কবে নাগাদ দাম আগের অবস্থায় ফিরতে পারে নির্দিষ্ট করে বলতে পারব না। খাদ্য অধিদপ্তর এ বিষয়ে ভাল বলতে পারবে।
‘তবে বৃহস্পতিবার ভারতের একটি প্রতিনিধি দলের সাথে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠক হয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবর আরও একটি প্রতিনিধি দলের সাথে বৈঠক হবে। এছাড়া এবছর ১৫ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যেই অনেক চাল সংগ্রহ করা হবে।’
এরপর খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. বদরুল হাসান ও পরিচালক (সংগ্রহ) আব্দুল আজিজ মোল্লাকে বেশ কয়েকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ২ সেপ্টেম্বরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী চালের মোট মজুদ রয়েছে ৩ লাখ ৫৪ হাজার টন। যা গত বছরের অর্ধেকেরও কম। ওই সময় মজুদ ছিল ৭ লাখ ২৯ হাজার টন চাল।







