” আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমদ্দির ছোট্টবাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলে গড়িয়ে পড়ে পানি।”
চাটগাঁয়ের আকাশে মেঘ জমলেই মনে পড়ে যায় পল্লী কবি জসীমউদ্দিনের আসমানী কবিতার এ লাইনগুলো।
কবির আসমানী ঘরে যেমন একটু বৃষ্টিতে গড়িয়ে পড়ে পানি, তেমনটাই এখন চট্টগ্রামের জন জীবনের দশা। পানিতে কেবল রাস্তাঘাট ঘর বাড়ি ভাসে না। শহরের ফ্লাইওভারে ও জমে যায় পানি। মোদ্দা কথা, শহরের উপরে নীচে সর্বত্র পানি। তাই এ শহরের মানুষের কাছে বৃষ্টি আর বর্ষা এখন আতংক। এক সময়ের সমুদ্র আর সবুজ পাহাড় ঘেরা চাটগাঁ শহরের বর্ষার অপরূপ দৃশ্য এখন কেবলই অতীত স্মৃতি।
কাব্যময় বর্ষাকালে এবার কিছুটা স্বস্তি এনে দিবে এমনটাই প্রত্যাশা ছিল শহরবাসীর। কিন্তু সে আশা নিরাশায় পরিণত হয়েছে আষাঢ় মাসের শেষ বৃষ্টিতে। শীতের দুমাস ছাড়া সারা বছর ধরে সাগরের জোয়ারের পানির কারণে জনজীবনে এমনিতে থাকে সীমাহীন দুর্ভোগ। জলাবদ্ধতার ফলে দিন রাতের অর্ধেক সময় মানুষের পানিবন্দি জীবন। রাস্তা ঘাটের বেহাল অবস্থা। উন্নয়ন কাজের কালক্ষেপণ, জলবায়ুর পরিবর্তন, মানুষের অসচেতনতা, ভুমি দখল সহ নানাবিধ সমস্যা এ জনদুর্ভোগের জন্য দায়ী সন্দেহাতীতভাবে।

আওয়ামী সরকার তার শাসনামলে সারাদেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতাতে বন্দর নগরী চট্টগ্রামকে অগ্রাধিকার দিয়ে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে। এর সমন্বয়ক হিসাবে দায়িত্বে আছে সিটি কর্পোরেশন, সিডিএ, ওয়াসাসহ অন্যান্য সরকারি জন সেবাসংস্থা। মেগা প্রকল্প চলাকালীন সময়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে এটা মেনেই নিয়েছে জনগণ এতদিন ধরে।
কাজের ধারাবাহিকতাতে জলাবদ্ধতা হ্রাস করতে রাস্তাঘাটের সংস্কার অনেকটাই সম্পন্ন হয়েছে সাদা চোখে। তবে অন্তরালের ঘটনা সুস্পষ্ট হলো এবারের বৃষ্টিতে। মেগা প্রকল্পের আওতায় শহরে রাস্তার উচ্চতা বৃদ্ধি সহ রাস্তার দুদিকে ড্রেনেজ সিস্টেম করা হয় জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য। কিন্তু এ বিষয়টি তেমন বিশেষ সুফল বয়ে আনেনি মানুষের জন্য। কারণ রাস্তা উঁচু করার ফলে মানুষের ঘর বাড়ি বিশেষ করে একতলা ভবনগুলোর অবস্থান রাস্তা থেকে অনেক নীচে পড়ে যায়। এতে করে ঘরের ভেতর গিয়ে ঢুকছে রাস্তার পানি। এতে করে দেখা যায় আগের তুলনায় এ বছর ঘরে পানি প্রবেশের পরিমাণ বেড়ে গেছে। সাধারণ জনগণ রাস্তা উঁচু করার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি অনুধাবন করলেও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তা নজরে আনেনি। শুধু মাত্র রাস্তা উঁচু করলে জলাবদ্ধতা নিরসন হবে না। এর পাশাপাশি পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। আবাসিক এলাকায় স্যুয়ারেজ লাইন দিয়ে নোংরা পানি আসে ঘর বাড়িতে। আরও লক্ষনীয়, এবারের বৃষ্টিতে সারা শহরই পানিতে ভেসেছে। অগত্য শহরের পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেয়া হয় বিশেষ কিছু এলাকার পানি অপসারণের জন্য।
জলাবদ্ধতার এহেন হয়রানির পাশাপাশি মেগা প্রকল্পের কাজের নিরাশাজনক চিত্র দেখে হতবিহ্বল হয় চট্টগ্রামবাসী। জনগণের অর্থের শ্রাদ্ধের নুমনা শহরের সংস্কার করা রাস্তাগুলো। বছর না ঘুরতেই রাস্তার কার্পেটিং নষ্ট হয়ে খাল খন্দে পরিণত হয়েছে। কোন রকমভাবে কালো পিচের রাস্তা করে ঠিকাদার লাভবান হয়েছে। রাস্তার স্থায়িত্ব নিয়ে তার কোন দায়বদ্ধতা যে নেই তার স্বাক্ষর মানহীন কাজ। এখনো বর্ষার দু মাস বাকি। আর এ অবস্থায় বৃষ্টি হলে শহরের মানুষ যে ভোগান্তিতে পড়বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, উন্নয়ন প্রকল্পের দায়সারা গোছের কাজ যারা করেছে তারা কিসের ভিত্তিতে এবং কোন শক্তির জোরে! নামমাত্র কাজ করে জনগণের টাকার এমন অপব্যবহার দুঃখজনক।

আর এ ধারাবাহিকতাতে চট্টগ্রামের মেগাপ্রকল্পের অংকুরে বিনাশ ঘটাবার জলন্ত উদাহরণ হলো চট্টগ্রামের আউটার রিং রোড। এ প্রকল্পের রাস্তার ফাটলের ছবি শুধু বন্দর নগরীর মানুষকে হতাশ করেনি। বরং সারা দেশের মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছে, উন্নয়নের নামে এসব নিম্নমানের কাজের মাধ্যমে কারা ফায়দা নিচ্ছে?
প্রকল্পের স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা নেই বলে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের দাবী মেগা প্রকল্পের কাজ সেনাবাহিনীকে দেয়া হোক। সে সাথে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি তদারকি চায় চট্টগ্রামের মেগা প্রকল্পের কাজে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে যেখানে প্রানপন চেষ্টা করছে মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়নের। সেখানে দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের এ ধরনের অপরিপক্ক চিন্তা ধারা,কাজের প্রতি দায়িত্বহীনতা সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আর একই সাথে তথৈবচ জনজীবনে দুর্ভোগ ছাড়া প্রত্যাশার কিছুই থাকে না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







