বিষয়টা আশ্চর্যজনকই বটে! জয়েস হল কি কোনদিন এমনটা ভেবেছিলেন!
এই হলই হলেন ১৯১০ সালের ১০ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিখ্যাত শুভেচ্ছা-কার্ড উৎপাদনকারী ‘হলমার্ক’-এর প্রতিষ্ঠাতা। বণিকের মন বলে কথা! ১৯৩০ সালের ২ আগস্ট তিনি চালু করে দিলেন ‘বন্ধু দিবস’। বন্ধুকে কার্ড দিয়ে শুভেচ্ছা জানাও। ব্যস, ব্যবসা তুঙ্গে! তাঁর প্রচলিত দিবসটির বারটি ছিল শনিবার; কালের বিবর্তনে সেটা রবিবার হয়ে গেছে। অথচ, দিবসটির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাঁর নামটাই রয়ে গেছে! জয়েস হল কি আসলেই এতোটা ভেবেছিলেন!
কালের বিবর্তন বড় অদ্ভুত। নইলে, এবারের বন্ধু দিবস কেন ৬ আগস্টের আসল মাহাত্ম্য ভুলিয়ে দেবে। কেনইবা হল সাহেবের দিবসের কাছে একদম মলিনমুখে ‘মার’ খেয়ে যাবে সেই মাহাত্ম্য। আজকের সোশ্যাল ওয়ার্ল্ড শুধুই ‘বন্ধু দিবস’ নিয়ে মাতোয়ারা হয়ে রইবে, হল সাহেব স্মরিত হবেন, এও কি আজ থেকে ৭৭ বছর আগে তিনি ভেবেছিলেন!

৬ আগস্ট তো একটা বিখ্যাত তারিখ, আমরা জানি। সেটা ৯ আগস্টও বটে। ৬ ও ৯ আগস্ট একসঙ্গে দুটো তারিখের কথা বললে, আমরা সব সময়ই ফিরে যাই ১৯৪৫ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে। ৬ আগস্ট হিরোশিমা দিবস। ৯ আগস্ট নাগাসাকি দিবস। হিরোশিমায় ‘লিটিলবয়’ বোমাটি ফেলেছিল এনোলা-গে আর নাগাসাকিতে ‘ফ্যাটম্যান’ বোমাটি ফেলেছিল বকসকার। দুটোই বি-২৯ বোমারু বিমান। একে তো বোমারু বিমান, তার থেকে নিচে খসে পড়ল পারমাণবিক বোমা! ভাবা যায়!
পৃথিবীর ইতিহাসে ওটাই প্রথম, ওটাই সর্বশেষ পারমাণবিক বোমার ব্যবহারে মানুষের নোংরা রাজনীতি ঘায়েল করেছিল মানুষকে! প্রতিটি বোমার আঘাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন এক লাখ ২৯ হাজার থেকে ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ।
আহা, আধুনিক বিজ্ঞানের প্রবাদপুরুষ আলবার্ট আইনস্টাইন যদি সেই চিঠিটি না লিখতেন!
রোনাল্ড ক্লারিকের সদ্য প্রকাশিত গবেষণাধর্মী ‘আইনস্টাইন: দ্য লাইফ অ্যান্ড টাইমস’ গ্রন্থে এই চিঠির সূত্র ধরেই আমেরিকার ওই পারমাণবিক আস্ফালনের দিকদর্শন বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
১৯৩৯ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পরপরই, আইনস্টাইন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্টকে একটি চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, তিনি জানতে পেরেছেন যে, জার্মানি পারমাণবিক বোমা বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আইনস্টাইন তখন আমেরিকাতেই থাকেন, লং আইল্যান্ডে। ১৯৩০ সালে চলে এসেছেন হিটলারের ইহুদি নিধনের ভয়ঙ্কর থাবা এড়িয়ে। মার্কিন নৌবাহিনীতে বোমা তৈরির প্রকল্পের রিসার্চ কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করতেন এ সময়টায়। ফলে, তাঁর চিঠিকে তো গুরুত্ব দেওয়ার ‘একশ একটা কারণ’ ছিলই রুজভেল্টের। নইলে কি আর ব্যতিব্যস্ত হয়ে মার্কিন পারমাণবিক বোমার আঁতুড়ঘর ‘ম্যানহ্যাটন প্রোজেক্টে’র কাজ শুরু করে দেন প্রেসিডেন্ট!

যদিও, খোদ আইনস্টাইন নিজে কোনদিনও ছায়া মারাননি প্রজেক্ট-সাইটটির, কিন্তু যা সর্বনাশ হওয়ার তা তো আগেই হয়ে গেছে! আহা, সেই চিঠিটি! আইনস্টাইন শুধু চেয়েছিলেন, পৃথিবীর ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং নাৎসি হিটলারের জার্মানিকে বশে রাখতে আরেকটি দেশের পারমাণবিক বোমায় শক্তিমান হওয়া জরুরি, বোমা ব্যবহারেরও প্রয়োজন নেই। তাহলেই হিটলারের জার্মানি সেই বোমা ব্যবহার করার আগে অন্তত ভাববে।
কিন্তু, আইনস্টাইনের এই ‘নিরীহ দর্শন’টি শেষ পর্যন্ত কাজে আসল না; আমেরকিা তো তখন প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত। এই বোমা দুটি তারা মেরেছিল জাপানের পার্ল হার্বার আক্রমণের প্রতিশোধ নিতে। বলা যেতে পারে, ওখান থেকেই দুনিয়ায় ‘আমেরিকান আধিপত্য’ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছিল।
কতবড় বিজ্ঞানী আইনস্টাইন, অথচ, তিনিও কতবড় ভুল করে বসলেন! অবশ্য যেদিন বোমা ফেলা হলো হিরোশিমায়, তিনি তখন ছুটিতে, নৌবিহারে গেছেন লোয়ার সারানাক লেকে। তাঁকে জানানোও হয়নি এতো বড় একটি সিদ্ধান্তের কথা। রেডিওতে শুনেই নাকি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। এই দুর্দশাগ্রস্থ দশা নিয়েই শুনলেন, আবার বোমা পড়েছে জাপানে, এবার নাগাসাকিতে!

এই দুই বোমা বিস্ফোরণের প্রভাব এতোটাই বিস্তৃত যে, আজও হিরোশিমা-নাগাসাকিতে কোন নবজাতক জন্ম-প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মালে ‘লিটিলবয়’ বা ‘ফ্যাটম্যানে’র না দেখা ‘ভুত’ই তাদের তাড়া করে! আহা রে, দুটি বোমা দুটি এলাকার জীবজগতের জেনেটিক্সেও অর্নিদিষ্টকালীন দাগ রেখে দিয়ে গেছে! সেই মানুষগুলো, দিবসগুলোকে স্মরণ করতে ভুলে গেলাম আমরা!
আশ্চর্যের বিষয়, ৭২ বছর পর, সেই মার্কিন মুলুকেরই একজন ব্যক্তি জয়েস হলের চালু করা একটি দিবস, মানুষকে মার্কিন বর্বরতা ও অসভ্যতার কথা ভুলিয়ে দিল! জয়েস হল কি কোনদিন এমনটা ভেবেছিলেন, দেশের কুকীর্তি ঢাকতে তিনি এতোটা অদৃশ্য ভূমিকা পালন করবেন!
বাংলাদেশের মানুষ বলে তো খুব, যুদ্ধ নয় শান্তি চাই। এই হলো শান্তি চাওয়ার নমুনা যে, হিরোশিমা দিবসটা নিয়ে তাদের কথাই বলতে দেখলাম না তেমনভাবে!
বন্ধু আমাদের জীবনের অনিবার্য উপাদান। যে মানুষের বন্ধু নেই, তার বেঁচে থাকাটা অর্থহীন মনে হয়। বাঁচতে হলে বন্ধু লাগবেই। সেদিক দিয়ে, বন্ধু দিবস পালন খারাপ না। কিন্তু, ব্যবসার স্বার্থে চালু হয়েছিল যে দিবস তা কী করে নিঃস্বার্থ হয়! অথচ, আমরা সবাই বলি, সেটাই প্রকৃত বন্ধুত্ব, যা নিঃস্বার্থ!
আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে ‘বন্ধু দিবস’ পালিত হলো, সেটার গায়ে ‘আন্তর্জাতিক বা বিশ্ব’ তকমা নেই। ২০১১ সালের ২৭ জুলাই জাতিসংঘের ৬৫তম সাধারণ অধিবেশনে সিদ্ধান্ত হয় যে, এখন থেকে ৩০ জুলাইকে ‘বন্ধুত্বের আন্তর্জাতিক দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে। দিবসটির কোন প্রচারণাই নেই!
৩০ জুলাইয়ের এই আইডিয়া অবশ্য সামনে এনেছিলেন প্যারাগুয়ের ড. র্যামন আরতেমিও ব্রাচো। ১৯৫৮ সালের ২০ জুলাই। ব্রাচোর বন্ধুরা মিলে ‘ওয়ার্ল্ড ফ্রেন্ডশিপ ক্রুসেড’ নামক একটা ফাউন্ডেশন শুরু করলেন। এই ফাউন্ডেশনটি বহুদিন জাতিসংঘের সঙ্গে সভা-বৈঠক-তদবির করে ৩০ জুলাইয়ের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করেছে মাত্রই কয়েক বছর হলো। অথচ, লাভ হলো কই, যুক্তরাষ্ট্রের হল সাহেবের দিবসের কাছে তো জাতিসংঘের সমর্থন পাওয়ার পরও প্যারাগুয়ের ব্রাচো সাহেব পরাজিত! খোদ ফেসবুক কর্তৃপক্ষই হল সাহেবের দিবসের প্রচারণা চালিয়েছে, ব্রাচোরটা নয়।
এমনি কি বলে, যুক্তরাষ্ট্র আসলে জাতিসংঘের চেয়েও বেশি ক্ষমতাধর! আর এমনি এমনি কি এবার, হিরোশিমা দিবসটি বন্ধু দিবসের জৌলুসের কাছে পরাজিত হলো!
তো এই ফ্রেন্ডশিপ ক্রুসেড মূলত জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মধ্যে ফ্রেন্ডশিপ ও ফেলোশিপ ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করছে। কিন্তু, তাদের প্রত্যাশিত দিবসের প্রচার তেমন নেই! ঠিক এরকম একটি অসাম্প্রদায়িক কাজ করেছিলেন আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ঠাকুরের প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে, উইকিপিডিয়ার একটি তথ্য জানানোর লোভ সামলাতে পারছি না।
উইকিপিডিয়া বলছে, বন্ধু দিবস সবচেয়ে ঘটা করে পালিত হয় বাংলাদেশ-ভারত-নেপালে। দিবসটি উপলক্ষে ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ডসে’র চাহিদা ব্যাপক এখানে। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে (পাকিস্তানের কথা বলতে পারব না) বছরের এই সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো আসলে ‘রক্ষাবন্ধন’ বা ‘রাখীবন্ধনে’র রাখী। আজকাল অনেক ধরনের হ্যান্ডব্যান্ড বাজারে পাওয়া গেলেও, রাখীবন্ধনে বেচাকেনা সবচেয়ে বেশি হয় আমাদের সংস্কৃতিরই ধারক-বাহকের নকশা-কৌশল-চিহ্নে তৈরি রাখী। রাখীকে ইংরেজিতে ‘ব্যান্ড’ বলে থাকলে, উইকিপিডিয়ার প্রদত্ত তথ্যটিকে তাই যথার্থই বলতে হবে!

পুরো ভারতবর্ষ যেটিকে ‘রক্ষাবন্ধন’ বলে, উভয় বাংলায় সেটাকে অবশ্য আমরা ‘রাখিবন্ধন’ বলি। শ্রাবণের মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই উপলক্ষটি উদযাপিত হয়। সূর্য-চন্দ্র মাস তো বরাবরই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের নির্দিষ্টতাকে অমান্য করে চলে। ফলে, বঙ্গাব্দের পঞ্জিকানুযায়ী এই তিথিটি সর্বসময়ই একই গ্রেগরিয়ান তারিখে হবে না এটাই স্বাভাবিক; তবে, আগেপিছে হলেও, ৩০ জুলাই বা আগস্ট মাসের দ্বিতীয় রোববারের আশেপাশেই তার আগমন ঘটে।
‘রক্ষাবন্ধন’ বা ‘রাখীবন্ধন’ কে কেন্দ্র করে এই সময়টাতে রাখী বিক্রি অনেক বেড়ে যায়। এ কারণেই বাংলাদেশ-ভারত-নেপালে ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ডস’ সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। যেটা উইকিপিডিয়া বুঝে হোক বা না বুঝে হোক, উল্লেখ করেনি।
মূলত, ভাইয়ের হাতে এখানে রাখী পড়িয়ে দেন বোনেরা। ফলে, কথা পরিষ্কার, আদতে ‘বন্ধু দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবসে’র সঙ্গে এখানকার রক্ষাবন্ধনের কোন দূরতম সম্পর্কও নেই। রক্ষাবন্ধনের উৎস স্পষ্টতই আরও প্রাচীন। এ নিয়ে হিন্দু পুরাণে অনেকগুলো মত আছে। পুরাণের বর্ণনার কোথাও বউ স্বামীর হাতে, কোথাও বোন ভাইয়ের হাতে রাখী পড়িয়ে দেন, এমন বহুধারার মতামত প্রচলিত আছে। সেগুলো এখানে সেসব উল্লেখ করা এই লেখার কন্টেন্টের জন্য তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয় বলে এড়িয়ে যাওয়া হলো।
আমরা বরং, গুরুত্ব দিব রবীন্দ্রনাথের অসাম্প্রদায়িক সামাজিক উদ্যোগের। বাংলায় ভাই-বোনের সম্পর্কের উর্ধ্বে উঠে, রাখীবন্ধনকে সকল জাতি-ধর্ম-বর্ণের ‘ভাতৃত্বের প্রতীক’ বানাতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯০৫ সালে এখানে যখন লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তখন এর বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর কার্জন বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করবেন। এর এক মাস আগে, ১৭ সেপ্টেম্বর, সাবিত্রী লাইব্রেরিতে স্বধর্ম সমিতি আয়োজিত সভার বিশেষ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সভাপতির ভাষণে, তিনি রাখীবন্ধনের প্রস্তাব করেছিলেন বঙ্গভঙ্গ কার্যকরের প্রতিবাদে। তৎকালীন বেঙ্গলী পত্রিকায় ‘রাখী সংক্রান্ত ব্যবস্থা’ শিরোনামে নিম্নরূপ একটি ঘোষণাও প্রকাশিত হয়েছিল—
দিন: এই বৎসর ৩০ শে আশ্বিন ১৬ অক্টোবর
আগামী বৎসর হইতে আশ্বিনের সংক্রান্তি।
ক্ষণ: সূর্য্যোদয় হইতে রাত্রির প্রথম প্রহর পর্যন্ত।
নিয়ম: উক্ত সময়ে সংযম পালন।
উপকরণ: হরিদ্রাবর্ণের তিন সুতার রাখী।
মন্ত্র: ভাই ভাই এক ঠাঁই, ভেদ নাই ভেদ নাই।
অনুষ্ঠান: উচ্চ নিচ হিন্দু মুসলমান, খৃস্টান বিচার না করিয়া ইচ্ছামত বাঙ্গালী মাত্রেই হাতে রাখী বাঁধা, অনুপস্থিত ব্যক্তিকে সঙ্গে মন্ত্রটি লিখিয়া ডাকে অথবা লোকের হাতে রাখী পাঠাইলেও চলিবে।
এ সময়েই তিনি রাখী-সঙ্গীত ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ নামক বিখ্যাত স্বদেশী গানটি লিখেছিলেন।
১৬ অক্টোবর কলকাতায় হরতালও হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন সে যাত্রায় সফল হয়নি। ঠিকই বঙ্গভঙ্গ ঘটে গেল। রাখীবন্ধনের মূল উদ্দেশ্যটাও যে ঠিক বাস্তবায়িত হয়েছিল, তাও বলা যাবে না। সজনীকান্ত দাশকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছেন, ‘সামনে যাকে পেতাম, তারই হাতে বাঁধতাম রাখী। সরকারী পুলিস এবং কনস্টেবলদেরও বাদ দিতাম না। মনে পড়ে, একজন কনস্টেবল হাত জোড় করে বলেছিল, মাফ করবেন হুজুর, আমি মুসলমান।’
তো, ব্যর্থ প্রক্রিয়াকে মনে রেখে কী হবে! তবু, রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগটা শুধু মনে থাকুক। তাই, ১৬ অক্টোবরের ‘রাখীবন্ধন দিবস’ আমরা ভুলে যেতে পারি, পালন না করতে পারি, সমস্যা নেই। কিন্তু উভয় বাংলায় শ্রাবণ পূর্ণিমায় উদযাপিত রাখীর মনন জগতে জেগে থাকুন রবীন্দ্রনাথ, আমাদের অসাম্প্রদায়িক রাখীবন্ধনের জন্মদাতা। যে রাখীতে শুধু বোন ভাইকে নয়, শুধু একক কোন সাম্প্রদায়িক ভাবগাম্ভীর্যে নয়, বাংলা অঞ্চলের প্রতিটি মানুষ একে-অপরের সঙ্গে রাখীর বন্ধনে যুক্ত থাকুক। আজ (৯ আগস্ট) যে বিশ্ব আদিবাসী দিবস, যাদের জন্য এই দিবস, তারাও এই সম্প্রীতির আধিকারিক হোক। আমরা কেউই যেন কাউকে ‘অপর’ না ভাবি। এটা হৃদয়ের দাবি। এই দাবি সত্য হোক।
হয়েছেও দেখলাম। ইন্দো-বাংলা রাখীবন্ধন উৎসব উভয় দেশের সীমান্তবর্তী কোন কোন জায়গায় এবার হতেও দেখা গেছে। যদিও সেগুলো রাজনৈতিক উদ্যোগে করা। কিন্তু, রাজনীতির চেয়েও বড় হলো সমাজ। সেই সামাজিক উদ্যোগটাই প্রয়োজন। রবীন্দ্রনাথ বরাবর সমাজের পক্ষে কথা বলে গেছেন। সমাজ যতদিন শক্তিশালী থাকবে, বাংলার দুই পাশের বন্ধন ততদিন দৃঢ় থাকবে, তা যতই দেশ দুটি হোক।

১৯১১ সালে তো আবার বাংলা এক হলো, সমাজ জিতে গেল। কিন্তু, পরিতাপের বিষয়, বঙ্গভঙ্গ রদ ভাঙনের প্রভাবটা ঠিকই রয়ে গেল। সমাজ সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন হতে লাগল, রাজনীতি সেটার ব্যবহার করতে শুরু করল। কিংবা বলা যেতে পারে, রাজনীতির দুষ্টচক্রে পড়ে, সমাজ সাম্প্রদায়িক মননে বিভক্ত হয়ে পড়ল। ফলাফল: ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দ্বিতীয়বার বাংলা ভাগ হয়ে গেল! সন্দেহাতীতভাবেই, এতে প্রথম ভাগের অভিজ্ঞতা বেশ জুতসই পাটাতন হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছিল বলা যায়। সেই ‘মানবিক ট্র্যাজিডি’র ৭০ বছর পূর্ণ হলো এবার!
রবীন্দ্রনাথ এই দুর্ঘটনার ৬ বছর ৭ দিন আগেই মারা গেলেন। ফলে সেই তীব্র হৃদয়ক্ষরণ তাঁকে আর দেখে যেতে হয়নি! বাঙালির হৃদয় দুইভাগে ভাগ হয়ে গেল। কী আশ্চর্য কাকতালীয় ব্যাপার, রবীন্দ্রনাথ (এবং নজরুলও) দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেলেন! ঠিক এখানেই রবীন্দ্রনাথের ‘রাখীবন্ধনে’র সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতির প্রত্যাশাটা এসে কোথায় যেন নড়বড়ে হয়ে যায়!
২২ শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ দিবস। বাংলাদেশে দিবসটি এবার পালিত হলো ৬ আগস্ট। পশ্চিমবঙ্গে ৮ আগস্ট। এ যেন বাংলাভাগের সেই লিগ্যাসিই বহন করে চলেছি আমরা!
বাংলাদেশ বহুআগেই সূর্যমাসের পঞ্জিকারীতির বৈজ্ঞানিক বয়ান পরিত্যাগ করে, (যদিও, চন্দ্রমাসের রীতি ঠিকই মেনে চলে) রাষ্ট্র প্রণীত সিভিল ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে আসছে। ফলে দেখা যায়, রবীন্দ্র-নজরুল জন্মজয়ন্তী কিংবা মহাপ্রয়াণবার্ষিকী কদাচিৎ বাংলাদেশে প্রকৃত তারিখে পালিত হয়। এই দুই মহীরুহর জন্ম-তারিখের আগেই জন্মজয়ন্তী পালন, মৃত্যু-তারিখ আসার আগেই প্রয়াণদিবস পালন আশ্চর্য এক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশে। এবারই যেমন, ২ দিন আগেই রবীন্দ্রনাথকে মেরে ফেলা হয়েছে!
বস্তুত, ঠাকুর মারা গিয়েছিলেন ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট। তাঁর ও নজরুল ক্ষেত্রে প্রায় সবকিছুই বঙ্গাব্দে অনুসরণ করা হয় বলে, পঞ্জিকানুযায়ী সেদিন যেহেতু ২২ শ্রাবণ ছিল, সেহেতু এই তারিখটিই রবি ঠাকুরের মহাপ্রয়াণদিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় রাষ্ট্রের সিভিল ক্যালেন্ডারের পথ ধরে বঙ্গাব্দকে অনুসরণ করা হয় না। সেখানে, মানুষ এখনও এক ও অদ্বিতীয় পঞ্জিকাপন্থি। ফলে, তারাই সঠিক পথে আছে বলতে হবে। বাংলার রাষ্ট্রে বঙ্গাব্দের একেবারে লেজে-গোবরে অবস্থা!
দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের স্যোশাল মিডিয়ার কমিউনিটিতে ৬ আগস্ট তিনটি দিবস নিয়ে আলোচনার সুযোগ ছিল। রবীন্দ্রনাথ কম আলোচিত হয়েছেন। হিরোশিমা-ট্র্যাজেডি তো বলতে গেলে সেভাবে কেউই মনেই রাখেননি। কিন্তু, বন্ধু দিবসের জয়জয়কার। বন্ধুত্ব তো প্রয়োজন। সেজন্যই হয়তো এতো বিশাল ব্যবধানে তার জয় হয়েছে।
৯ ও ১৪ আগস্টে তো অন্য কোন সেলিব্রেটেড দিবস নেই। দেখা যাক, মানুষের মর্জি নাগাসাকি ট্র্যাজিডি ও বাংলা ভাগ তথা ভারত ভাগের ৭০ বছরের বেদনাকে স্মরণ করতে চায় কি না! না করলে বুঝতে হবে, মানুষ শুধু রোমান্টিকতার দাসে অবতীর্ণ হওয়া প্রাণীতে পরিণত হয়েছে।
এর পর, ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪২তম শাহাদাৎবার্ষিকী। ১৯৭৫ সালের এই দিনেই সপরিবারে নিহত হয়েছিলেন পৃথিবীর অন্যতম শক্তিমান এই ‘জাতীয়তাবাদী নেতা’।

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজিডির নাম তাই ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫! বাংলাদেশের জাতীয় শোক দিবস। এই দিবসটি নিয়েও তো আমাদের দেশে রাজনৈতিক নোংরামি ও মতভেদ কম নয়! কখনও কখনও ১৫ আগস্টের গায়ে তো ‘জাতীয় শোক দিবসে’র তকমাও থাকে না! আজও আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ ও স্বাধীনতার স্থপতির হত্যাকাণ্ডটির ব্যাপারে একটা ‘গ্র্যান্ড ন্যারেশেনে’ পৌঁছুতে পারিনি। এমন একটি দেশ যে সাংস্কৃতিকভাবে বয়সে বড় হয়নি, এতো বলাই বাহুল্য!
দেখা যাক, সামনে তিনটি বেদনাময় দিবস। মানুষ ট্র্যাজিক নাকি রোমান্টিক, কোন পথে জীবনের মূল্য বুঝে নেয়!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








