গ্রিন লাইন বাসের মালিক হাজি মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ও তার কোম্পানির বাসের চাপায় পা হারানো রাসেল বুধবার হাইকোর্টে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এসময় তাদের পক্ষের আইনজীবীরা তাদের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন।
বুধবার দুপুর ৩টার পর প্রথমে ক্র্যাচে ভর করে ডায়াসের সামনে এলে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক জানতে চান তার ব্যাংক এ্যাকাউন্ট আছে কিনা। জবাবে রাসেল জানায় ডাচবাংলা ব্যাংকে এ্যাকাউন্ট আছে।
তখন গ্রিন লাইনের আইনজীবী রাসেলের হাতে ৫ লাখ টাকার চেক ধরিয়ে দেন। এরপর আদালত এই চেককে ক্যাশ করে ব্যাংক স্টেটমেন্ট আদালতে জেমা দিতে বলেন।
একপর্যায়ে গ্রিন লাইনের আইনজীবী অজিউল্লাহ বলেন: রাসেল অসুস্থ হওয়ার পর থেকে গ্রিন লাইনের লোক গিয়েছে, দেখা করেছে, কথা বলেছে। এবং একটি এনজিও তার চিকিৎসার দায়ভার নিয়েছে বলে সে জানিয়েছে। এসময় রাসেল সরকার কিছু বলতে আদালতের অনুমতি চাইলে আদালত তাকে কথা বলার অনুমতি দেয়।
তখন রাসেল বললেন: আমার সঙ্গে এখন পর্যন্ত গ্রিন লাইন পরিবহন কোনো যোগাযোগ করেনি। আমার বাবা-ভাই গিয়েছিল। গ্রিন লাইনের যিনি মালিক তিনি বলেছিলেন যে, আমি হজে যাচ্ছি। রাসেল আমার ছেলের মত। আমার ছোট ছেলে অ্যাকসিডেন্ট করেছে তার জন্য ওমরাহ করতে যাচ্ছি, রাসেলের জন্য আমি দোয়া করব। রাসেলের জন্য আমি ভাল কিছু করে দিব। ওমরাহ থাকাকালীন আমার অফিসের স্টাফরা যোগাযোগ করবে। এর পরের দিন হসপিটালে দুইজন লোক গিয়েছিল। তারা নাম্বার নিল যে আমার খোঁজ-খবর রাখবে। কিন্তু চিকিৎসা বা টাকার বিষয়ে কোনো কিছু করা হয়নি।
এরপর আদালত ডায়াসে কথা বলতে ডাকেন গ্রিন লাইন পরিবহনের মালিক মো. আলাউদ্দিনকে। তিনি ডায়াসের সামনে এগিয়ে আসলে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বলেন, আপনি এত বড় একজন পরিবহন ব্যবসায়ী। একটি পরিবহন চালান। এই পরিবহনের বেশ সুনাম আছে। আমরাও চড়েছি আপনার বাসে।
‘‘এই যে আপনার এত বড় কোম্পানি কিন্তু রাসেলের ঘটনাটার পর এতদিন হল ছেলেটার কোনো খোঁজ-খবর নিলেন না। আপনারা তো কত যাকাত দেন। মানুষকে সাহায্য করেন বিভিন্নভাবে। আপনার কি কোনো দায়িত্ব ছিল না?’’
একপর্যায়ে মালিক আলাউদ্দিন বলেন: আপনি অনুমতি দিলে আমি কিছু কথা বলতে চাই। বেয়াদবি হলে মাফ করে দিয়েন।
‘‘আপনারা যেখানে বসে আছেন সেই জায়গাটাকে আমি শ্রদ্ধা করি। এই ছেলেটার যখন অ্যাকসিডেন্ট হইল তার পর পর আমার পরিবারে তিনটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। আমার ওয়াইফের পা ভেঙে গেছে ও কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে একটা। আমার বড় ছেলে চির অন্ধ হয়ে গেছে। এবং আমি অসুস্থ হয়ে প্রায় এক মাস দেশের বাইরে ছিলাম। আর আমার ব্যবসাতে লস হচ্ছে। পৈত্রিক সম্পদ বিক্রি করে এখন ব্যবসা করছি। প্রায় একশ কোটি টাকা দেনা হয়ে গেছি।’’
এরপর গ্রিন লাইনের মালিক বলেন: রাস্তায় গাড়ি চললে দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। গত সপ্তাহে খুলনাতে একটি দুর্ঘটনা হয়েছে। আজকে আপনাদের সম্মান জানিয়ে ৫ লাখ টাকা দিয়ে গেলাম।
তখন আদালত বলেন: দেখেন আপনারা ব্যবসা-বাণিজ্য করবেন। মানুষের যাতে কোন অসুবিধা না হয় সেটাও তো দেখতে হবে। মনেরও একটা প্রশান্তি আসবে, শান্তি পাবেন।
গ্রিন লাইন পরিবহনের মালিক তখন বলেন: আমি উনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে যতটুকু আমার সাধ্যে কুলায় আমি করব।
এরপর আদালত বলেন: এই যে ঘটনাটা ঘটেছে তা কিন্তু দুর্ঘটনার পর্যায় পড়ে না। সে গাড়ি থামাতে গেল, অথচ আপনার চালক তার উপর দিয়ে চালিয়ে দিল। তবে যেহেতু মামলাটি পেন্ডিং আছে সেহেতু আমরা আর মন্তব্য করলাম না। কিন্তু এই যে বিষয়গুলা এটি বিবেচনা করে দেখা উচিত। আর আপনারা, আমরা সবাই কিন্তু এদেশের মানুষ। এদেশেরই সন্তান। একটি ছেলে মারা গেলে শুধুমাত্র তার বাপ-মারই ছেলে যায় না। দেশের সম্পদ চলে যায়। আর আমরা এ জায়গায় বসেছি শুধু আমার বাপের টাকায় না। এখানে জনগণের ট্যাক্সের টাকা আছে।
‘‘যেমন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একেকজন রিকশাওয়ালার টাকা আছে। কারণ আমাদের সবাইকে ভ্যাট ট্যাক্স দিতে হয়। সুতরাং সমস্ত পাবলিক প্রতিষ্ঠানে এদেশের জনগণের টাকা আছে। এইগুলা একটু মাথায় নিয়েন। একজন মানুষ মারা গেলে সে কিন্তু আর ফিরে আসে না।’’
এরপর আদালত বলেন: এই রিটে কিন্তু এক কোটি চাওয়া হয়েছিল আমরা কিন্তু তা দেইনি। আমরা সেটি কমিয়ে ৫০ লাখ টাকা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি।
তখন গ্রিন লাইনের মালিক বলেন: এটি আপনাদের বিবেচনার মধ্যে রইল। আমার সাধ্যে যা কুলায় রাসেলকে সবই করব।
তখন আদালত বলেন: এই মামলায় এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা তা দিইনি। আমারা ৫০ লাখের নির্দেশ দিয়েছি।
তখন মো. আলাউদ্দিন বলেন: তাহলে আদেশ দিয়ে আমার ব্যবসা বন্ধ করে দিন। আমার আর কিছু করার নেই।
এরপর এ বিষয়ে আদালতে আজকের কার্যক্রম শেষ হয়।
২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল যাত্রাবাড়ীতে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে গ্রিন লাইন পরিবহনের বাসের চাপায় রাসেলের বাম পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পর গ্রিন লাইন পরিবহনের বাসটি এবং তার চালককে পুলিশ আটক করে।
এ বিষয়ে পুলিশ জানায়, মো. রাসেল (২৫) নামের ওই যুবক একটি প্রাইভেটকার চালাচ্ছিলেন। বাসটি তার গাড়িকে ধাক্কা দিলে প্রতিবাদ জানাতে বাস থামাতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বাস চালক তার ওপর দিয়েই বাস চালিয়ে দেন। এতে রাসেলের বাঁ পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ির বাসিন্দা রাসেল রাজধানীর আদাবর এলাকার সুনিবিড় হাউজিংয়ে বসবাস করতেন এবং স্থানীয় একটি ‘রেন্ট-এ-কার’ প্রতিষ্ঠানের প্রাইভেটকার চালাতেন। রাসেলের এই পা হারানোর ঘটনার পর ২০১৮ সালের ১৪ মে ক্ষতিপূরণ চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উম্মে কুলসুম। সেই রিটের শুনানি নিয়ে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ রাসেলকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে গ্রিন লাইন বাস কর্তৃপক্ষের প্রতি নির্দেশ দেন। সেই সাথে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাসেলের বিচ্ছিন্ন পায়ে কৃত্রিম পা লাগাতে এবং যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থার নির্দেশ দেন।
পরবর্তীতে হাইকোর্টের এই আদেশ বহাল রাখেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ। এরপর হাইকোর্ট ১০ এপ্রিলের মধ্যে ৫০ লাখ টাকা দিতে গ্রিন লাইনকে সময় বেধে দেন। কিন্তু ১০ এপ্রিল সকালে গ্রিন লাইন বাসের আইনজীবী অজিউল্লাহ রাসেলকে ৫০ লাখ টাকা দিতে এক মাস সময় চান।
এরপর আদালত বেলা ৩টার মধ্যে কিছু টাকা দিয়ে আদালতে আসতে বলেন। অন্যথায় আমরা আমাদের মতো অর্ডার দিব বলে হাইকোর্ট হুশিয়ার করেন। অবশেষে বুধবার বেলা ৩ টায় হাইকোর্ট কক্ষে বিচারকের সামনে গ্রিন লাইনের আইনজীবী মো. অজিউল্লাহ রাসেলের হাতে ৫ লাখ টাকার চেক তুলে দেন।
এসময় আদালত ৫ লাখের এই চেক ক্যাশ হলে ব্যাংক স্টেটমেন্ট আদালতে দাখিল করতে রাসেলকে নির্দেশ দেন। সেই সাথে এক মাসের মধ্যে বাকি ৪৫ লাখ টাকা দেওয়ার বিষয়ে গ্রিন লাইনের আবেদন মঞ্জুর করেন। এছাড়া রাসেলকে যথাযথ চিকিৎসা দিতে গ্রিন লাইন বাসের মালিককে নির্দেশ দেওয়া হয়।
এসময় আদালত কক্ষে রাসেলের স্ত্রী-সন্তান উপস্থিত ছিলেন। আরও ছিলেন গ্রিন লাইনের মালিক হাজি মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ও তার পক্ষের আইনজীবী মো. অজিউল্লাহ। আর রাসেলের বিষয় নিয়ে রিটকারী আইনজীবী উম্মে কুলসুম স্মৃতি ও রিটের পক্ষের আইনজীবী খন্দকার শামসুল হক রেজা।








