বিচারিক আদালতের রায়ের প্রায় ৪ বছর পর পিলখানায় তৎকালীন বিডিআরের সদর দপ্তরে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যা মামলায় হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করেছেন। এ রায়ে বিচারিক আদালতে সাজা পাওয়া ব্যক্তি যেমন খালাস পেয়েছে; তেমনি সেখান থেকে খালাস পাওয়া আসামিদের কাউকে কাউকে সাজার আওতায় আনা হয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ১৫২ জনের মধ্যে বেশির ভাগ আসামির (১৩৯ জনের) দণ্ডাদেশ বহাল থেকেছে হাইকোর্টের রায়ে। বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত হোসেনের নেতৃত্বে তিন বিচারপতির বিশেষ হাইকোর্ট বেঞ্চের দুইদিন ধরে দেওয়া এ রায় ছাপিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছে তাদের কিছু পর্যবেক্ষণ। প্রায় এক হাজার পৃষ্ঠার ওই পর্যবেক্ষণে যৌক্তিকভাবেই কিছু বিষয়ে নতুন করে ভাবনা-চিন্তার দ্বার খুলে দিয়েছে। বিশেষ করে সুশৃঙ্খল বাহিনীর ক্ষেত্রে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডকে নৃশংস ও বর্বরোচিত উল্লেখ করে একজন বিচারপতি বলেছেন, কথিত সেই বিদ্রোহের পূর্বাপর আলোচনা ও পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়েছে, এ ঘটনা ছিল রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক-সামাজিক নিরাপত্তায় বিঘ্ন সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র। ‘পিলখানার ঘটনায় আমরা আমাদের (গোল্ডেন সান) সূর্য সন্তানদের হারিয়েছি।’ এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে আরেকজন বিচারপতি বলেছেন, সেই বিদ্রোহের উদ্দেশ্য ছিলো সেনা কর্মকর্তাদের জিম্মি করে দাবি আদায়ের পাশাপাশি সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে সেনা কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগ নিরুৎসাহিত করা। বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে বহুল আলোচিত ‘ডাল ভাত’ কর্মসূচির কথাও। ওই কর্মসূচি নেওয়া উচিত হয়নি মন্তব্য করে একজন বিচারপতি তার পর্যবেক্ষণে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘ভবিষ্যতে শৃংখলা বাহিনীতে এ ধরনের কোন কর্মসূচি নেয়া উচিৎ হবে না।’ আরেকটি স্পর্শকাতর বিষয় উঠে এসেছে বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণে; তা হলো বিদ্রোহের ঘটনায় গোয়েন্দা ব্যর্থতা। আদালত এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, সেই ঘটনার আগে কেন গোয়েন্দারা নীরব ছিলো? কোন রকম ষড়যন্ত্র ছাড়া এতো বড় হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে না। আমরা জানি, শুধু এই ঘটনাতেই নয়; এমন আরো কিছু বড় ঘটনায় একইভাবে গোয়েন্দা ব্যর্থতার কথা সবার আগে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে সপরিবার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডেও এমন চিত্র আমরা দেখেছি। আদালত তার পর্যবেক্ষণে আরেকটি বিষয় পরিস্কার করে দিয়েছেন, তাহলো তখনকার সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেওয়া পদক্ষেপ প্রসঙ্গে। আদালত বলেছেন, ‘অসীম ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও সাহসিকতার সঙ্গে দৃঢ় মনোবল নিয়ে শক্ত হাতে বিদ্রোহ দমনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত পদক্ষেপ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে।’ অথচ নির্মম ওই ঘটনার পর আমরা অনেককেই বলতে শুনেছি, ‘সরকার সঠিক সময়ে পদক্ষেপ নিলে অনেকের প্রাণ বাঁচতো।’ আমরা মনে করি, আদালতের পর্যবেক্ষণে সেই বিতর্কেরও অবসান হবে। আমরা চাই অাদালতের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে এমন ঘটনা যাতে আর কখনো না ঘটে, তার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।







