গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত কখনোই মেনে নেওয়া হবে না বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। তিনি বলেছেন: সরকার বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। তবে আমরা সেই বাক স্বাধীনতাকে কখনই সমর্থন করি না, যেটা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করে। বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি প্রতিটি কথা হবে যুক্তিসঙ্গত তথ্যনির্ভর এবং সত্যের উপর ভিত্তি করে।
মঙ্গলবার রাজধানীর বারিধারার কূটনীতিকপাড়ায় একটি হোটেলে মুভ ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদ ও ভুয়া কনটেন্ট: চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
হানিফ বলেন: সামাজিক দায়বদ্ধতা সকলকে নিশ্চিত করতে হবে। ফ্রিডম অব স্পিচ-বাক স্বাধীনতার নাম করে যা খুশি তাই বলে যাবে, এটা কোন দায়িত্বশীল মানুষের আচরণ হতে পারে না। প্রখ্যাত আলোকচিত্রশিল্পী শহিদুল ইসলাম কারাগারে আছেন। এটা নিয়ে অনেক কথাবার্তা হচ্ছে। কিন্তু আপনারা যদি খেয়াল করেন, আল-জাজিরায় উনি যে সাক্ষাৎকারটি দিয়েছিলেন, সেখানে সাংবাদিকের করা প্রশ্ন বাদ দিয়ে; উস্কানিমূলক বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা কথা বলে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন। পাশাপাশি বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছিলেন। উস্কানিমূলক কথাবার্তা জন্য তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করার পরেও যদি তার বিরুদ্ধে মামলা না হয় কোন পদক্ষেপ না নেয়া হয় তাহলে তো দেশে আইন-শৃঙ্খলা বলতে কিছু থাকবে না।
সরকার বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী মন্তব্য করে আওয়ামী লীগের এ নেতা বলেন: আমরা বাক স্বাধীনতার ব্যাপারে সব সময় একমত। বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। আমরা চাই প্রত্যেকটা কথা হবে কথা হবে যুক্তি এবং সত্যের উপর নির্ভর করে এখানে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই। কারণ আমরা বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। প্রতিটি কথা হবে যুক্তিসঙ্গত তথ্যনির্ভর এবং সত্যের উপর ভিত্তি করে। এটাই আমরা দেখতে চাই। এমন বাকস্বাধীনতা আমরা চাই না যেটা দিয়ে দেশের মধ্যে হানাহানি সৃষ্টি করে দেশকে অস্থিতিশীল করা হবে। আবার গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে এ ধরনের কর্মকাণ্ড কখনো সমর্থন করা যায় না। তাই যারা এর সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই ঢালাওভাবে সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করাটা বাস্তবসম্মত এবং যৌক্তিক নয়। আমরা বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। আমরা সকলকে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা আছে দাবি করে হানিফ বলেন: নিরাপদ সড়কের দাবিতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছিল। তাদের দাবির প্রতি আমাদের সমর্থনও ছিল। আমাদের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিন দিন পরে আমরা হঠাৎ খেয়াল করলাম ছাত্র-ছাত্রীরা আমাদের পার্টি অফিসের সামনে চলে আসলো পাথর দিয়ে হামলা করা হলো। এ পাথরগুলো ওখানে পাওয়ার কথা নয়। এগুলো শিলা পাথর, ব্যাগে করে এখানে ওখানে আনা হয়েছিল। আমরা যখন তাদের থামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম তোমরা এমন করছ কেন? তারা বলল, এখানে ৪ জন মেয়েকে আটকে রেখে ধর্ষণ করা হচ্ছে, ৪ জন ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে, একজনের চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে! এসব শুনে তো আমরা অবাক হয়ে গেলাম। পার্টি অফিস আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জন্য পবিত্র স্থান। এখানে তো এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে না। কিন্তু ওরা বলল, না আমরা শুনেছি! এবং সেটা শুনেই তারা এসেছে। তারপর আমরা সাধারন শিক্ষার্থীদের আওয়ামী লীগ অফিসের ভেতরে কয়েক দফায় নিয়ে যে দেখায়। তারপর তারা বুঝতে পারে এমন কোন ঘটনা ঘটেনি।
তিনি আরও যোগ করেন: এরপর আমরা দেখেছি কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাড়িতে হামলা করে গানপাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনা। মেয়েদের হোস্টেলে হামলা করে সাধারণ মেয়েদেরকে লাঞ্চিত করার মতো ঘটনা। এগুলোর একটাই উদ্দেশ্য ছিল দেশকে অস্থিতিশীল করে সরকারকে বিপদে ফেলা। আপনারা দেখেছেন লন্ডন থেকে মদদ দেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশে বসে বিএনপির নেতাও বিভিন্ন ভাবে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। প্রত্যেকটা ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক সুনির্দিষ্ট একটা কারন ছিলো বলে দাবি করেন হানিফ।
এ ধরনের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সচেতনতা আবশ্যক মন্তব্য করে তিনি বলেন:এ ধরনের মিথ্যা কবরের বিরুদ্ধে আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের যেমন পরিবারের প্রতি দায় আছে, সন্তানের প্রতি দায় আছে, তেমনই রাষ্ট্রের প্রতিও আমাদের দায় থাকতে হবে।এ ধরনের অপপ্রচারে সন্তানরা জড়িয়ে না পড়ে, সন্তানদেরকে নিবৃত্ত করার জন্য প্রত্যেকটি পরিবারের অভিভাবকদের এগিয়ে আসতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার এবং অপব্যবহার সম্পর্কে সকলের সচেতন হওয়ার প্রয়োজন সকলকে উপলব্ধি করতে হবে।
এ সময় জামায়াতে ইসলামির সমালোচনা করে তিনি বলেন: ইসলামিক টেররিস্ট গ্রুপ এর উত্থান কোনো মাদ্রাসা ছাত্রদের থেকে গড়ে ওঠেনি, এটা যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াত ইসলামী থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এদের ইতিহাস দেখলে আপনারা দেখতে পাবেন, এই দলটি পাকিস্তান সৃষ্টির শুরুতে পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছিল। দলটির প্রতিষ্ঠাতা মওদুদী পাকিস্তান জুড়ে দাঙ্গা সৃষ্টি করেছিল। যার ফলশ্রুতিতে পাকিস্তান সরকার তাকে বিচারের মুখোমুখি করে একটা সময়। সর্বশেষ শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। একাত্তরে এই জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। তাদের পাকিস্তানি দোসরদের সঙ্গে মিলে গণহত্যা চালানোর পাশাপাশি মা-বোনদের উপর পাশবিক নির্যাতন করেছিল। যখনই জামাত রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়েছে, তারা তাদের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা হরকতুল জিহাদ, হিজবুল তাহরিদের মতো সংগঠনদের দিয়ে গুপ্তহত্যা থেকে শুরু করে দেশব্যাপী অস্থিতিশীলতা ছড়িয়েছে।
সব সময় জামায়াত মিথ্যাচারকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে দাবি করে হানিফ বলেন: মিথ্যা খবর প্রচার করা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চালানো জামায়াতে ইসলামী তাদের ক্ষমতায় আসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। সব সময় তারা মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে। ফেইক নিউজ ছড়িয়ে তারা রামুর বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা, নাসিরনগরে মন্দিরে হামলার মতো ঘটনোয় মদদ দিয়েছে। সবগুলোই ছিল মিথ্যা খবর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যেহেতু কারো কাছে দায়বদ্ধতা সেভাবে নেই, তাই এটাকে ব্যবহার করে দেশের মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার একটা চেষ্টা জামায়াতের আছে।
মাদ্রাসা ছাত্ররা উগ্রবাদে বিশ্বাসী নয় দাবি করে তিনি বলেন: বাংলাদেশের যারা মাদ্রাসা ছাত্র-ছাত্রী, তারা কেউ এই উগ্র মৌলবাদী আদর্শে বিশ্বাসী নয়। এই জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো তৈরি করে ধর্মভিত্তিক দল জামায়াত ইসলামীর। বিভিন্ন নাম দিয়ে তারা বিভিন্ন সময় সারাদেশে সন্ত্রাসী জঙ্গি কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে তারা এ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। তাদের লক্ষ্য একটাই, দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দেশকে অস্থিতিশীল করা এবং সরকারের পতন ঘটানো।
ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরীর সঞ্চালনায় এতে মূল প্রবন্ধ পেশ করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়াউল আহসান। আলোচনায় অংশ নেন কানাডিয়ান হাইকমিশনার বিনয় প্রিপনটেইন, সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক গোলাম রহমান, ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা মাওলানা আলতাফ হোসাইন, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ ইবরাহীম বীর প্রতীক, বিএনপির নেতা ব্যরিষ্টার সারোয়ার, আওয়ামী লীগের উপ প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন, সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, হুমায়ূন কবির, অজয় দাস গুপ্ত, কওমী মাদরাসা ছাত্রদের পেইজের এডমিন সালাহ উদ্দিন জাহাঙ্গীর প্রমুখ।






