চলমান সময়কে গণতন্ত্রহীন দাবি করে বক্তারা বলেছেন, কঠিন এই সময়ে সাংবাদিক, কলামিস্ট ও লেখক মাহফুজ উল্লাহর মতো উদার, সহিঞ্চু ও অনুপ্রেরণাদায়ক সাহসী ব্যক্তির বড় প্রয়োজন ছিলো। তার অকাল প্রয়াণে দেশের গণতান্ত্রিক মুক্তি আন্দোলনের জন্য বড় ক্ষতি।
সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিক মাহফুজ আল্লাহ’র প্রয়াণে নাগরিক শোক সভায় তারা এসব কথা বলেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ডা. আকবর আলী খানের সভাপতিত্বে শোক সভায় দেয়া বক্তব্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড.কামাল হোসেন বলেন, মাহফুজ উল্লাহ ছাত্রজীবন থেকে রাজনৈতিকভাবে বর্ণিল। আজকের উপস্থিতি ও বক্তব্য থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, মাহফুজ উল্লাহ কত বড় মাপের মানুষ। ষাটের দশকে মুক্তি আন্দোলনে ঐক্য অসম্ভব মনে করা হতো। সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলাম আমরা। তার পেছনে মাহফুজ উল্লাহ অবদান রেখেছিল। ঐক্য ও মুক্তি আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিলো। মাহফুজ উল্লাহ ঝুঁকি নিতেন। উনাকে শ্রদ্ধা জানাতে হলে সত্য ও ন্যায়ের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ঝুঁকি নিতে হবে।
ড. কামাল আরও বলেন, আমার সৌভাগ্য যে আজকে এখানে আমরা সবাই মিলিত হয়েছি। আমাদের নিরাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আজ এখানকার উপস্থিতি মনেকরি ঐক্যের পক্ষে সকলের যে আকর্ষণ, তা এখনো আছে। মুক্তিযুদ্ধের কথা চিন্তা করে আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। ষাটের দশকের মতো আমরা এক হয়ে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। আমি কঠিন গলায় বলতে পারি, বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের কোনো জায়গা নেই। যারা স্বৈরতন্ত্রের কথা চিন্তা করে তারা আহম্মক। গণতন্ত্রের জন্য, স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আজকে আমরা ঐক্যের পক্ষে আছি।
শোক সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, মাহফুজ উল্লাহর সঙ্গে আমার এতো ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিলো যে, তিনি আমার পাশে থাকবেন না, তা কখনো ভাবিনি। তিনি সত্যকে সত্য বলতেন। ছাত্রজীবন থেকে তিনি রাজনীতি সচেতন ছিলেন। পরবর্তী জীবনে সাংবাদিক হিসেবে অবদান রেখেছেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য, স্বাধীনতাকে শক্ত ভিত্তি দিতে, গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে যথেষ্ট অবদান রেখেছেন তিনি। গণতন্ত্রবীহিন, অধিকারবিহীন রাষ্ট্রে মাহফুজ উল্লাহ সত্য কথা বলার মধ্যদিয়ে আমাদেরকে জাগিয়ে তুলেছেন। আমাদেরকে জেগে উঠতে হবে।
ফখরুল আরও বলেন, তার মধ্যে অনুপ্রেরণা দেওয়া, কাজ করা, সাহস যোগানোর ক্ষমতা ছিলো বিশাল। তার অভাব পূরণ হবে না। আসুন আমরা তার চিন্তা বাস্তবায়নে অবদান রাখি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. এমাজউদ্দীন আহমেদ বলেন, এতো অল্প সময়ে মাহফুজ উল্লাহ যে আমাদেরকে ছেড়ে চলে যাবে তা ভাবতে পারছি না। এমন একটি সময় তাকে আমরা হারিয়েছি যখন তার প্রয়োজন ছিলো। তার সততা, স্বচ্ছতা, সাহসিকতা আমাদের তরুণরা অনুসরণ করুক সেই আশা করছি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতা আর নেই। যেখানে ভোটাধিকার থাকে না সেখানে কথা বলার স্বাধীনতা থাকে নাা। এই স্বাধীন ও মুক্ত বাকের জন্য সংগ্রাম করেছেন মাহফুজ উল্লাহ। আমরা তার বিদেহি আত্মার শান্তি কামনা করছি।
জেএসডি সভাপতি আ স ম আব্দুর রব বলেন, দেশে পাথর সময় চলছে। এই সময় মাহফুজ উল্লাহকে সবচেয়ে দরকার ছিলো। যে দেশে জাতের অস্তিত্বই নাই, সেখানে জাতীয়তাবাদী শক্তি থাকে কি করে? দেশে কোনো রাজনীতি নেই। সত্য কথা বলে বেঁচে থাকা যায় না। যারা সত্য, যাদের, সততা আছে তাদের আর বাঁচা যাবে না। প্রতিদিন শিশু ধর্ষিত হচ্ছে। কোনো বিচার হচ্ছে না। সাংবাদিক মরে যাচ্ছে। বিচার হচ্ছে না। কঠিন সময়। কিন্তু এই কঠিন সময়েও সাহসী, অনুপ্রেরণামূলক ছিলেন মাহফুজ উল্লাহ। কোনো হুমকি, ভয় ভীতি মাহফুজ উল্লাহর কাছে পৌঁছাতে পারেনি।
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, মাহফুজ উল্লাহর অবদান ভোলার নয়।। সাংবাদিক হিসেবে পরিবেশ সাংবাদিকতায় প্রভাব তিনি সৃষ্টি করেছিলেন তা অনবদ্য। তিনি পরিবেশ সাংবাদিকতার পথিকৃত ছিলেন।
সভাপতির বক্তব্যে ড. আকবর আলি খান বলেন, মাহফুজ উল্লাহর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। তিনি যে বয়সে মারা গেছেন, তা দেশের গড়ে আয়ুর থেকে কম। তিনি থাকলে আমাদেরকে সাহস, প্রেরণা দিতে পারতেন। গণতান্ত্রিক যাত্রার পথে যেতে শক্তি হতে পারতেন। তবে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। মাহফুজ উল্লাহ যা করে গিয়েছেন তা অনেকদিন থাকবে।
আকবর আলি খান বলেন, তিনি রাজনীতিবিদ হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেননি। তিনি পদার্থবিদ হতে চেয়েছিলেন। পদার্থবিদ্যায় তাত্ত্বিক পড়ালেখা করলেও তা তিনি হতে পারেননি। তিনি সাংবাদিক হতে চেয়েও পেশাদার সাংবাদিক সেভাবে হতে পারেননি। তবে পরিবেশ সাংবাদিকতায় তিনি অনবদ্য অবদান রেখেছেন। লেখক হিসেবে তিনি বেঁচে থাকবেন।
মাহফুজ উল্লাহর স্মরণ সভায় বিভিন্ন দল মত ও পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অংশগ্রহণ গ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাবেক কূটনীতিক শমসের মুবিন চৌধুরী, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি জাফরউল্লাহ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ নজরুল, পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. সাদাত হোসেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, তত্বাবধায়ক সরকারের নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি সাইফুল আলম, নিউএজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবির প্রমুখ। শোক সভাটি পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুবায়াইত ফেরদৌস।







